ইসরাইল ও যায়নবাদ
ইসরাইল হচ্ছে আধুনিক বিশ্বের সর্বশেষ সেটলার কলোনিয়াল রাষ্ট্র। কলোনিয়ালিজম মূলত দুই প্রকার। ক্লাসিকাল কলোনিয়ালিজম এবং সেটলার কলোনিয়ালিজম। ক্লাসিকাল কলোনিয়ালিজমে বিদেশীরা আসে, দেশ দখল করে, কয়েক দশক পর্যন্ত লুটপাট করে, এরপর পরিস্থিতি বেগতিক দেখলে পালিয়ে যায়। এটা ঘটেছিল ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষে, কিংবা ফরাসিদের ক্ষেত্রে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে।
কিন্তু সেটলার কলোনিয়ালিজমের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে বিদেশীরা লুটপাট করে চলে যাওয়ার জন্য আসে না। তারা আসে দেশ দখল করে, স্থানীয়দেরকে জাতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করে সেখানেই চিরস্থায়ী হওয়ার জন্য। এটা আমেরিকানরা ঘটিয়েছিল মূলনিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে। একই ঘটনা অস্ট্রেলিয়ানরা ঘটিয়েছিল সেখানকার আদিবাসীদের সাথে, ফরাসিরাও চেষ্টা করেছিল আলজেরিয়ানদের সাথে। ইসরাইল হচ্ছে এরকমই একটা সেটলার কলোনিয়াল রাষ্ট্র, যেখানে ইউরোপ থেকে আগত ইহুদিরা স্থানীয় আরব মুসলমান এবং খ্রিস্টানদেরকে নিশ্চিহ্ন করে বা স্থায়ীভাবে বিতাড়িত করে দেশটাকে পাকাপাকিভাবে দখল করে নিতে চায়।
কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে টিকে থাকার শান্তিপূর্ণ কোনো উপায় নেই। সেটলার কলোনিয়ালিজমের ক্ষেত্রে তো আরও নেই। এখানে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম না করলে, রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে না গেলে নিজেদেরকেই বিলুপ্ত হয়ে যেতে হয়। ফিলিস্তিনিরা এটা বিগত সাড়ে সাত দশক ধরে হাড়ে হাড়ে বুঝেছে। এবং তাই রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধের জন্য তাদেরকে চরম মূল্য দিতে হলেও তারা সেটা মেনে নেয়।
প্রতিটা দেশেই স্থানীয় অধিবাসীদেরকে কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে, রক্ত ও জীবন দিতে হয়েছে অকাতরে। আলজেরিয়ায় ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন ১৩২ বছর ছিল। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে গিয়ে ৫০ লক্ষাধিক আলজেরিয়ানকে জীবন দিতে হয়েছিল।
১৯৪৫ সালে আলজেরিয়ানরা যখন স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করেছিল, বিপরীতে ফরাসিরা ৪৫ হাজার আলজেরিয়ানকে হত্যা করেছিল, তখন অনেকের মনে হয়েছিল, আলজেরিয়ানদের স্বাধীনতা আন্দোলন এখানেই বুঝি শেষ হয়ে গেল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কখনও নির্মূল করা যায় না। আপাতত কিছুদিন থেমে থাকলেও পরবর্তীতে আলজেরিয়া আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে, স্বাধীনতার চেতনার অগ্নুৎপাত হয়েছে এবং শেষমেষ জীবন বাজি রেখে ফরাসিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছে তারা।
প্রায় প্রতিটা দেশেই একই ইতিহাস ভিন্ন ভিন্ন রূপে বা আঙ্গিকে দেখা দিয়েছে। লিবিয়ায় ওমর আল-মুখতার যখন ইতালিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তখন তার অনুগামী বেদুইন যোদ্ধাদের হাতে রাইফেল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বিপরীতে সে সময়ের অন্যতম পরাশক্তি ইতালিয়ানদের কাছে ছিল ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান-সহ অত্যাধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্র। ওমর আল-মুখতার জানতেন, তার পক্ষে ইতালিয়ানদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব নয়। কিন্তু দখলদার বাহিনীর হাতে বিনাযুদ্ধে নিজের দেশের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে তিনি রাজি ছিলেন না।
ওমর আল-মুখতারের বিদ্রোহ দমন করতে ইতালিয়ানরা লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের প্রায় সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে স্থানান্তর করেছিল। সেই ক্যাম্পে বন্দীদের অর্ধেকই মৃত্যুবরণ করেছিল। কিন্তু ওমর আল-মুখতার যুদ্ধ থামাননি। পরাজয় নিশ্চিত জেনেও তিনি বলেছিলেন, আমরা বিজয়ের কথা চিন্তা করে যুদ্ধ করি না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। আর বিজয় আসবে আল্লাহর কাছ থেকে।
ওমর আল-মুখতার কিন্তু জীবদ্দশায় লিবিয়ার স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি। তাকে ফাঁসি দেওয়ার মধ্য দিয়ে ইতালিয়ানরা লিবিয়ান বিদ্রোহ দমন করেছিল। কিন্তু তাই বলে তার লড়াই অর্থহীন বা ব্যর্থ হয়ে যায়নি। তিনি যদি লড়াই না করতেন, প্রতিরোধ গড়ে না তুলতেন, তাহলে লিবিয়া স্বাধীন হতে হয়ত আরও অনেক বছর লেগে যেত। তাদেরকে আরও অনেক প্রাণ দিতে হত। আরও অনেক বছর ইতালির দাসত্ব করতে হত।
হামাসের জন্মেরও বহু বছর আগে ১৯৭০ সালে, যখন ফিলিস্তিনিদের অবস্থা এখনকার তুলনায় অনেকখানি ভাল ছিল, সে সময়ই ফিলিস্তিনি বিপ্লবী, সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক, পিএফএলপি সদস্য ঘাসসান কানাফানি তাদের এই অনন্ত সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যে দখলদার বাহিনী ফিলিস্তিনিদেরকে বাস্তুচ্যুত করেছে, শরণার্থী শিবিরে নিক্ষেপ করেছে, দুর্ভিক্ষের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে, দশকের পর দশক ধরে হত্যা করে চলেছে, এমনকি ফিলিস্তিন নামটা পর্যন্ত ব্যবহার করার অধিকার কেড়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াই একমাত্র সমাধান। এর বিকল্প নেই। কারণ, তরবারির সাথে গর্দানের কখনও সংলাপ হয় না। পানির অভাবে গাছ শুকিয়ে মরে গেলেও নদীর কাছে মাথা ঝুঁকিয়ে দেয় না।








