ব্রিটিশ আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও প্রতিক্রিয়ার ইতিহাস: সতর্কবার্তা
মোহাম্মদ হাদীউজ্জামান
ব্রিটিশ শাসনামলে যখন ঢাকা শহরে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসে, তখন তা ছিল পূর্ববঙ্গের শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্য এক ঐতিহাসিক আশার আলো। মুসলমান-সহ পিছিয়ে থাকা বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার ছিল। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সেই বৈষম্য দূর করার প্রথম বড় পদক্ষেপ হতে পার; কিন্তু এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা গেল, তা ছিল একেবারে উল্টো ভূমিকার।
বিশেষত কলকাতাকেন্দ্রিক একাংশ বর্ণহিন্দু শিক্ষিত সমাজ, জমিদার ও ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী, যাদের হাতে ছিল তৎকালীন শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক প্রভাব বলয় — তারা এই সিদ্ধান্তকে নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে মনে করল। তাদের আশঙ্কা ছিল, ঢাকা ও পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা যদি উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যায়, তবে তাদের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া আধিপত্য বা মৌরসীপাট্টা ভেঙে যাবে। শিক্ষা ছিল ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি; তাই তারা চেয়েছিল শিক্ষা যেন সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যেই আবদ্ধ থাকে।
ফলে যে দৃশ্যটি কলকাতায় দেখা গেল, তা ছিল বিস্ময়কর ও ইতিহাসের জন্য লজ্জাজনক। মানুষ শিক্ষার জন্য আন্দোলন করে, আর তারা করেছিল অন্যদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখার জন্য আন্দোলন।
কলকাতার গড়ের মাঠে সমাবেশ, বিবৃতি, প্রতিবাদ — সবই এক উদ্দেশ্যে: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা রোধ করা। তাদের যুক্তি ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘অপ্রয়োজনীয়’, ‘ব্যয়বহুল’, কিংবা ‘অকাজের’। কিন্তু আসল কারণ ছিল ক্ষমতা ও প্রভাব হারানোর ভয়। পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা আধুনিক শিক্ষায় এগোলে সমাজের ভারসাম্য বদলে যাবে — এটাই তারা মেনে নিতে পারেনি।

ইতিহাসের এই দিকটি প্রায়শই আড়ালে থাকে। কিন্তু সত্য হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম ছিল কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়; এটি ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার, অধিকারের বিস্তার এবং দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ। ব্রিটিশ সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে হলেও শিক্ষার সুযোগ বিস্তারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল; কিন্তু উপমহাদেশের একাংশ প্রভাবশালী বর্ণহিন্দু ও অভিজাত শ্রেণি তাতে খুশি ছিল না।
আজকের দিনে এসে আমরা সেই একই প্রবণতার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি। ইতিহাসের ওই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্তরসূরিরা আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক — যে রূপেই থাকুক না কেন, আজও মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন অজুহাতে টার্গেট করছে, প্রশ্নবিদ্ধ করছে, ন্যারেটিভ রচনা করছে, সন্দেহ সংশয়ের বাতাবরণ তৈরি করছে। কখনও প্রশাসনিক অভিযোগ, কখনও আর্থিক অনিয়ম, কখনও মতাদর্শের অজুহাত — কিন্তু বাস্তবতা হল, পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়া তাদের কাছে এখনও অস্বস্তিকর।

যে শক্তি ১৯২০ সালে শিক্ষার প্রসারে বাধা দিয়েছিল, সেই মানসিকতা আজও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করে, যারা পরিবর্তন চায় না, তারা সবসময় অজুহাত খুঁজে নেয়। শিক্ষা এগোলে সমাজ এগোয়, আর সমাজ এগোলেই পুরনো ক্ষমতার কাঠামো নড়ে ওঠে। তাই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী চাইবেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে।
এখানে জরুরি হল, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সতর্কতা। যে সমাজ নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানচর্চাকে রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ দীর্ঘস্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারে না। অযৌক্তিক অভিযোগ, ভিত্তিহীন প্রচার, রাজনৈতিক অভিসন্ধি বা উদ্দেশ্যপূর্ণ আক্রমণ — এসবের বিরুদ্ধে তথ্য, যুক্তি এবং স্বচ্ছতা নিয়ে দাঁড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের প্রশাসন, শিক্ষাগত মান এবং উৎকর্ষতা ও নৈতিকতা শক্তিশালী রাখতে হবে, যাতে কোনও সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের বিরুদ্ধে অপব্যবহার করতে না পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস আমাদের শেখায়। শিক্ষার বিরুদ্ধে যারা দাঁড়ায়, তাদের উদ্দেশ্য কখনও মহৎ হয় না। আর যারা পিছিয়েপড়া মানুষের উন্নতি চান, তাঁরা সবসময় চান জ্ঞানের বিস্তার, স্বাধীন চিন্তা ও সমান সুযোগ। সুতরাং আজকের বাস্তবতায় আমাদের দায়িত্ব হল, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সতর্ক থাকা, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চাওয়া যেকোনো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর অবস্থান নেওয়া। শিক্ষা শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ। আর ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে অতীতকে ভুলে গেলে চলবে না।








