ঐতিহাসিক জাবালে নূর ও হেরা গুহা
খান বাহাদুর সেখ
নতুন পয়গাম: হেরা বা গারে হেরা বা হেরা গুহা, সৌদি আরবের মক্কায় জাবালে নূর পর্বতে অবস্থিত একটি গুহা। আল্লাহ তাআলার নাযিল করা পবিত্র কুরআনের প্রথম আলোয় আলোকিত এই পাহাড় ও গুহা। যেখানে সর্বপ্রথম পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল বা অবতীর্ণ হয়েছিল। যা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত এসেছিল ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.)-এর কাছ থেকে। তাই এই পবিত্র গুহা মক্কার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ। এই গুহা ইসলামী ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী একটি স্থান। কারণ, এখানেই শেষনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর ইবাদতে ধ্যানমগ্ন থাকতেন এবং জিবরাইল (আ.) ফেরেশতার মাধ্যমে তাঁর ওপর প্রথম ওহী নাযিল হয়েছিল।
প্রথম ওহী নাযিল: গারে হেরা হল সেই ঐতিহাসিক স্থান, যেখানে সর্বপ্রথম পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল হয় এবং নবী মুহাম্মদ (সা.) নবুয়ত লাভ করেন।
ইবাদতের স্থান: নবুয়ত লাভের পূর্বে নবী মুহাম্মদ (সা.) এই পবিত্র গুহায় আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। এটি পবিত্র মক্কা শরীফ বা মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে অবস্থিত। হেরা গুহা দৈর্ঘ্যে ১২ ফুট এবং প্রস্থে ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি। এটি জাবালে নূর বা নূর পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত। সেই সময় এই গুহায় ওঠা বা চড়া মোটেই সহজ ছিল না। কারণ, তখন ছিল না উপরে ওঠার কোনো সহজ পথ। এখন যেখানে ওঠতে শক্তিশালী ও সামর্থবান মানুষের ১ ঘণ্টারও বেশি লেগে যায়। প্রায় হাজার ফুট উচ্চতার ভয়ংকর পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠতে বেশ কয়েকবার বিশ্রাম নিতে হয়। সমতল ভূমি থেকে পাহাড়ের ওপরের দিকে প্রায় ২০০-২৫০ ফুট পথ গাড়িতে যাওয়া যায়। সেখান থেকে ৮৯০ ফুট উচ্চতায় হেরা গুহা অবস্থিত। হেরা গুহায় যেতে আরও প্রায় ১০০ ফুট রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। কেননা, পাহাড়ের চড়ূা থেকে বিপরীত দিকে একটু নিচে অবস্থিত হেরা গুহায় যাওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। হেরা গুহাটি পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় না হলেও সেখানে যেতে হলে সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠতে হয়। সেখানে ওঠা ছাড়া হেরা গুহায় যাওয়ার বিকল্প পথ নেই।
প্রিয় নবী (সা.) যে গুহায় ইবাদাত বা ধ্যান করতেন, সেটি আকারে অনেক ছোট। ফলে সেখানে একজন মানুষেরই নড়াচড়া করতে কষ্ট হয়। অনেকেই প্রিয় নবী (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত এই পাহাড় বা গুহা দেখতে যায় এবং হেরা গুহায় নামায বা সিজদাহ করেন। তবে সেখানে একজনের বেশি লোক নামায আদায় করা সম্ভব নয়। এই পাহাড়ের চূড়া সংলগ্ন হেরা গুহায় ৬১০ খ্রিস্টাব্দে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারিম নাযিল করেন। হেরা গুহা এত ছোট ও এর পরিসর এত কম যে, প্রথম দেখাতেই বিস্ময়কর মনে হবে। এ স্থানেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। অথচ এর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা এতই কম যে, ভালভাবে সোজা হয়ে দাঁড়ানোও কষ্টকর। প্রিয় নবী (সা.) বর্ণনা করেন- ‘এক রাতে তাহাজ্জুদের সময় মানুষের আকৃতিতে একজন ফেরেশতা তাঁর কাছে আসেন এবং বলেন, ‘পড়ুন’। উত্তরে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি পড়তে জানি না’। তারপরও ফেরশতা তাকে আরও দু’বার পড়ার অনুরোধ করেন এবং দু’বারই প্রিয় নবী (সা.) জানালেন ‘আমি পড়তে জানি না’।
শেষ পর্যন্ত ফেরেশতা হযরত জিবরিল (আ.) কুরআনের ৯৬ নং সুরার প্রথম ৫টি আয়াত তিলাওয়াত করলেন। যা ছিল প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রতি নাযিলকৃত প্রথম ওহি। সূরা আলাক-এর সেই আয়াতগুলো ছিল এরকম:
১) পড়ুন আপনার পালনকর্তার নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।
২) সৃষ্টি করেছেন মানুষকে, জমাট রক্ত থেকে।
৩) পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু।
৪) যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।
৫) শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না।
ইসলাম-পূর্ব যুগে হেরা গুহা তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এর নাম এসেছে হিরা বা রত্ন থেকে। পাহাড়ের ১৭৫০টি ধাপ অতিক্রম করে এই গুহায় পৌঁছানো যায়। এটি লম্বায় প্রায় ৩.৭ মিটার বা ১২ ফুট এবং প্রস্থে ১.৬০ মিটার বা ৫ ফু ৩ ইঞ্চি। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৭০ মিটার বা ৮৯০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। পবিত্র হজ্জ মুবারকের সময় আনুমানিক ৫-৬ হাজার দর্শনার্থী প্রতিদিন মহানবী (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত এই পবিত্র গুহায় আরোহণ বা পরিদর্শন করেন। এই স্থানেই পবিত্র লাইলাতুল ক্কদর-এর রাতে, ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.)-এর মাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি কুরআনের সর্বপ্রথম ওহী বা ঐশী প্রত্যাদেশ নাযিল বা অবতীর্ণ হয়েছিল। অধিকাংশ মুসলমান হজ ও উমরাহের সময় আগ্রহ এবং আধ্যাত্মিকতার টানে এখানে আসেন। কেউ কেউ এটিকে বিশেষ ইবাদাতগাহ বলেও মনে করেন।
উল্লেখ্য, মহানবী (সা.)-এর ওপর প্রথম ওহী নাযিলের আগে তিনি আধ্যাত্মিক স্বপ্ন দেখতেন। এই স্বপ্নগুলোতে এমন সব ইঙ্গিত ছিল যে, তাঁর নবুয়ত শুরু হয়েছে এবং মক্কার পাথরগুলো তাঁকে সালাম দিয়ে অভ্যর্থনা জানাবে। এই স্বপ্নগুলো টানা প্রায় ছয় মাস ধরে চলেছিল। একাকিত্বের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনের তাগিদে মহানবী (সা.) মক্কার পার্শ্ববর্তী পাথুরে পাহাড়ে নির্জনতা এবং ধ্যান (মুরাকাবা) করার জন্য নির্জন স্থান খুঁজছিলেন। তিনি প্রতি বছর এক মাসের জন্য এই গুহায় নির্জনতা (তাহান্নুস) অবলম্বন করতেন। তিনি খাদ্য নিয়ে যেতেন এবং তাঁর কাছে আগত দরিদ্রদের খাওয়াতেন। রসদের জন্য বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি পবিত্র কাবা ঘর সাতবার প্রদক্ষিণ বা তাওয়াফ করতেন।








