আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্ট

বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে। কাল কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ হবে। রাজ্য বাজেট পেশ হবে ৫ ফেব্রুয়ারি। তার আগে প্রতি বছরের মতো এবছরও কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশিত হল। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্ট সংসদে পেশ করেছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি শাসনামলে দেশে শিক্ষার করুণ দুর্দশা। দেশের ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিশু-কিশোরদের স্কুলছুটের হার শতকরা ৪৪ ভাগ। এই স্কুল ছুটের কারণ হিসেবে আর্থিক সমীক্ষায় যা ধরা পড়েছে, তা রীতিমতো উদ্বেগের বিষয়। পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এমন পরিবারগুলোর পড়ুয়ারা বাড়তি আয়ের সংস্থান করতে গিয়ে স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে। স্কুল ছুট হচ্ছে ব্যাপক হারে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। বেকারত্ব বাড়ছে। আর্থিক চাপের শিকার হয়ে শিশু-কিশোরদের একটা বড় অংশ বিদ্যালয় ছেড়ে দিচ্ছে। গৃহকর্মে
সহায়তা করতে দেশের ২৮ শতাংশ শিশু-কিশোর স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। আবার এক অবাক করা সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, ৮ শতাংশ শিশু-কিশোর বলছে যে, পড়াশোনা করার প্রয়োজন নেই। শিক্ষাকেই অপ্রয়োজন বলে তারা মনে করছে। তাই তারা বেমালুম পড়া ছেড়ে দিচ্ছে।
প্রশ্ন হল যে, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদি সরকার শিক্ষার বেহাল দশা করে ছাড়ল কেন? আফ্রিকার দেশগুলোর অবস্থা তো এমন নয়। যে দেশে ৪৪ শতাংশ স্কুল ছুটের হার, সেই দেশে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গতি আসা সম্ভবপর নয়। অথচ সরকারের দাবি হল, কর্ম সংস্থান বেড়েছে, জিনিসপত্রের দাম কমেছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা তা নয়। শুধু জুমলার দ্বারা মানুষদের বুঝতে দেওয়া হচ্ছে না। আসলেই কর্মসংস্থানের অবস্থা আদৌ ভাল নয়। দারিদ্র এবং মূল্যবৃদ্ধির
রেকর্ড আগের থেকে ভেঙেছে।
দেশের আর্থিক সমীক্ষার যে রিপোর্ট বেরিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে, চলতি অর্থবর্ষে অর্থাৎ ২০২৬-২৭ সালে আর্থিক বৃদ্ধির হার কমবে। টাকার দরের পতন হওয়ার জন্য ভারতের আর্থিক ভিত্তির অবস্থা যে ভাল নয়, তার প্রতিফলন ঘটেছে। দেশের আর্থিক পরিস্থিতি এই বছরে কম নিরাপদ, বেশি ভঙ্গুর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দেশের অর্থ ব্যবস্থার দুর্দশা থেকে উত্তরণের পথ কিন্তু বিজেপি সরকার দেখাতে পারছে না। পুঁজিপতিদের স্বার্থানুকূল্যে এই সরকারের পলিসি তৈরি হয়। পলিসিতেই বড় রকমের খামতি ও দুর্বলতা রয়েছে। যতক্ষণ না আর্থিক পলিসি বা নীতির পরিবর্তন ঘটছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আশার আলো দেখার কোনো সম্ভাবনা নেই। পুঁজিপতির স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব হল আমজনতার স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেওয়া। বিজেপি সেই পথে হাঁটতে চাইছে না। কেননা, পুঁজিপতিদের সঙ্গে বিজেপির দহরম বেজায় বেশি। আদানি ও আম্বানিরা তাদের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন। বৈষম্যই আর্থিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রেখেছে। ন্যায়বিচার তথা ইনসাফের প্রতি বিজেপির কোনো দায়বদ্ধতা নেই বলেই প্রতীয়মান হয়। যেদেশে আর্থিক বৈষম্য থাকবে, ইনসাফ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে থাকবে না, সেই দেশের আমজনতার ভাগ্যের পরিবর্তন হওয়া একেবারেই অসম্ভব। মনে রাখতে হবে, ব্রাহ্মণ্যবাদী নীতি নির্ধারকগণই সেই প্রাচীন কাল থেকে এদেশের সাধারণ জনতাকে বৈষম্যের জাঁতাকলে পিষ্ট করে এসেছে। বৈষম্য ছিল সমাজ জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বর্ণব্যবস্থা হল তার মূলে। এই বর্ণব্যবস্থার জন্যই হাজারো বছর ধরে শুধু সামাজিক বৈষম্য অস্তিত্বশীল থাকেনি; রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বাধিকারের ক্ষেত্রেও তার মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ে এসেছে, যা আজো চোখে পড়ছে। তা থেকে দেশ মুক্ত হতে পারেনি। গণতান্ত্রিক চেতনার যুগে কিছু পরিবর্তন হলেও মূল কাঠামো এখনও বহাল রয়েছে। সমাজ কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন না হওয়ার জন্য ভারত প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বে সম্মানজনক আসন করে নিতে পারল না। জাতব্যবস্থা, বর্ণব্যবস্থার অবসান না হলে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও তার ফল সব মানুষের দুয়ারে পৌঁছাতে পারবে না। সেজন্য এক নয়া সমাজ-বিপ্লব দরকার। যেখানে বৈষম্য ও ন্যায়বিচারের আওয়াজই হবে মূলমন্ত্র। এখানে দেশের সব মানুষকে এক ছাতার তলায় আনতে হবে। ধর্মের নামে বিভাজন, ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো, বুলডোজার দুর্নীতি, গণপিটুনি, নাগরিকত্বের প্রতি রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতা ও হয়রানি এবং গরিব মানুষদের ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ অভিযান — এসবের মাধ্যমে ভয় ও সন্ত্রাসের যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য সমাজ পরিবর্তনের একটি জোরালো আওয়াজ সর্বত্র ওঠানো দরকার। দুর্নীতির বিরুদ্ধেও বলিষ্ঠ আওয়াজ ওঠাতে হবে। অত্যাচার ও নিপীড়ন বন্ধের জন্য জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসার মহান ব্রতে মানুষদের উজ্জীবিত করতে হবে। সাতে পাঁচে না থাকা, বারান্দা থেকে না নামা লোকদের কাছেও এই বার্তা নিয়ে পৌঁছতে হবে। দেশ ও দশের হীতে কিছু করতে হবে।





















































































































