বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক
শেখ আব্বাস উদ্দিন
বাংলা সাহিত্যের কথা যদি বলি, সমকালে সবচেয়ে উপেক্ষিত চরিত্রের নাম জীবনানন্দ দাশ। এবং বাংলার চালচ্চিত্রের রচয়িতা আব্দুল জব্বার এর কথা বলতেই হয়। আর রাজনীতিতে সবচেয়ে উপেক্ষিত এবং অনালোচিত চরিত্র হলেন এ.কে ফজলুল হক। তিনি এক ব্যতিক্রমী সত্তার অধিকারী ছিলেন। প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত এই বাঙালি নেতা ও রাজনীতিবিদ আজীবন মাটির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কযুক্ত ছিলেন। তার জীবন এবং কার্যক্রম সবকিছু মাটিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত ছিল। তিনি ছিলেন মাটির সন্তান ও মাটির মানুষ। এই ছিল তার ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনের রোজনামচা।
তিনি শুধুমাত্র একজন বাঙালি আইনজীবী এবং রাজনীতিবিদ নন, ছিলেন ব্রিটিশ আমলে বাংলার প্রথম এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী। তার বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব, অনুভূতিপ্রবণ মন, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সময় ও সমাজ সচেতন পদক্ষেপের জন্য তিনি রাজনীতির জটিলাবর্ত থেকে নিজেকে ভিন্ন পরিমাপে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
একজন অসাধারণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে প্রায় অর্ধশতক জুড়ে বিশেষ ভূমিকা ছিল তাঁর। অসাধারণ বাগ্মী এই মানুষটি মাতৃভাষা বাংলার মতোই ইংরেজি এবং উর্দুতেও সমান পারদর্শী ছিলেন। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী।

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সত্য যে, আবুল কাশেম ফজলুল হক ও তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে বিশেষ কোন গবেষণা এবং লেখালিখি খুব একটা হয়নি। এবং সবচেয়ে উপেক্ষিত সত্য হল, ফজলুল হকই প্রথমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত আলগা করে দেন এবং পূর্ব বাংলা তথা সমগ্র বাংলার বাঙালিদের মনে অখণ্ড বাঙালি জাতিসত্তার ধারণা অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণা ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হন। এ বিষয়ে প্রথম সচেতন প্রচেষ্টা তার মাধ্যমেই শুরু হয়। দুর্ভাগ্যের হলেও সত্য, সমকালীন সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের অধিকাংশই তখনও ইংরেজদের প্রভাব ও লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত হতে পারেননি। স্বভাবতই তারা ফজলুল হকের সমর্থন ও সহযোগিতায় সেভাবে এগিয়ে আসেননি। তবে যতই উপেক্ষিত হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে তিনি যে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, সেকথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। একাধারে তিনি ছিলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক, অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সভাপতি, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক, বাংলার শিক্ষামন্ত্রী, কলকাতার মেয়র, পূর্ববঙ্গের অ্যাডভোকেট জেনারেল, সর্বোপরি প্রখ্যাত আইন বিশারদ।
“কৃষক আন্দোলন শুধু কৃষকদেরই আন্দোলন, কৃষকরা কোন ধর্ম মতাবলম্বী, তা আমাদের জানার কোনও প্রয়োজন নেই”
— এ.কে ফজলুল হক
ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মাওলানা আজাদ কলেজ), লেডি ব্রাবোর্ণ কলেজ, বেকার হস্টেল, কারমাইকেল হস্টেল স্থাপনে তাঁর উদ্যোগ চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। জমিদারি প্রভাব খর্ব করতে ও ভূমি সংস্কারে তাঁর অবদান বাঙলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। “কৃষক আন্দোলন শুধু কৃষকদেরই আন্দোলন, কৃষকরা কোন ধর্ম মতাবলম্বী, তা আমাদের জানার কোনও প্রয়োজন নেই” — একথা বলেছিলেন এ.কে ফজলুল হক। তাঁর চিন্তাধারা ছিল ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে। তিনি বলেছিলেন, “ধানের উৎপাদকরূপে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান একটি মাত্র কৃষক শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। আমরা এই কৃষক শ্রেণির সর্বস্ব অধিকার লাভের জন্য আন্দোলন চালাব এবং সংগ্রাম পরিকল্পনা করব।” অন্ত্যজ সমাজের মানুষের ও পশ্চাৎপদ মুসলমান সম্প্রদায়ের উন্নতিকল্পে ফজলুল হকের ভূমিকা চিরস্মরণীয়।
“ধানের উৎপাদকরূপে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান একটি মাত্র কৃষক শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। আমরা এই কৃষক শ্রেণির সর্বস্ব অধিকার লাভের জন্য আন্দোলন চালাব এবং সংগ্রাম পরিকল্পনা করব।”
— এ.কে ফজলুল হক
১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রবক্তা ফজলুল হকের নেতৃত্বে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। মুসলিম লীগের সংকীর্ণ রাজনীতিকে পরাভূত করে তাঁর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। মুখ্যমন্ত্রী হন ফজলুল হক। এই সময় তিনি কয়েক দিনের জন্য কলকাতায় আসেন নেতাজী ভবনে। ৩রা মে এক সংবর্ধনা সভায় তিনি দাবি করেন, “বাঙালি এক অখণ্ড অভিভক্ত জাতি।” তাঁর এই উক্তি প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন বিভেদ ও বিদ্বেষ-মুক্ত মনন ও জাতীয়তাবাদী বাঙালি হৃদয়ের অধিকারী। তিনি ছিলেন পাকিস্তান-বিরোধী জননায়ক। তার কাছে পাকিস্তান ছিল একটি বিভ্রান্তমূলক পন্থা ও শব্দ।
তাঁর নেতাজী ভবনের বক্তব্যে পাকিস্তানের শাসকবর্গ শঙ্কিত হলেন। ৪৫ দিনের যুক্তফ্রন্ট সরকারকে তারা বাতিল ঘোষণা করল। তাঁকে গৃহবন্দি করা হল এবং তাঁকে ‘ভারতের চর’ ঘোষণা করা হল। এবং পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ)-কে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রকারী বলে অভিহিত করা হল। তবুও প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় বাংলা তথা বাঙালিদের জন্য আজীবন লড়াই চালিয়ে গেলেন। তিনি প্রকাশ্যেই বলতেন, পাকিস্তান শব্দটির কোন অর্থ হয় না, আদতে এটি একটি নাপাক শব্দ, যা বাঙালি তথা ভারতীয়দের বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত করেছে, যে কুকর্মে কংগ্রেসের একাংশও শামিল এবং সমানভাবে দায়ী। কিন্তু তৎকালীন বাঙালি শিক্ষিত সমাজ, বিশেষ করে শিক্ষিত মুসলিম সমাজ ফজলুল হকের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেননি । বাঙালিদের নিয়ে ফজলুল হক যে স্বপ্ন দেখতেন, তার বিপরীত মনোভাব পোষণ করতেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

তিনিই শেষ পর্যন্ত বাঙালি জাতিসত্তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে বাংলা ভাগে সফল হন। দুই বাংলা, অসম, ত্রিপুরার বাঙালিদের নিয়ে এক বৃহত্তর বাঙালি জাতিসত্তা গড়ে তোলার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বাঙালির জাতীয়তাবাদী ঐক্য গঠনে ব্যর্থতার ফলশ্রুতিতে আজ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলার শিকার হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালির জাতিসত্তা ও জাতীয়তাবাদ। অপরদিকে রাজনৈতিক বিভাজনের শিকার হয়ে বাঙালির জাতিসত্তা সংকীর্ণ ধর্মীয় কট্টরবাদী অশুভ শক্তির দ্বারা রক্তাক্ত হচ্ছে। সংকীর্ণ ধর্মীয় বিভেদ ও ভাষা সন্ত্রাস ইত্যাদির শিকার হচ্ছে অখণ্ড বাঙালি জাতিসত্তা। আহত জাতিসত্তার রক্ত ঝরছে এবং অদৃশ্য অপশক্তির চক্রান্তে অসহায়ত্ব বাড়ছে উভয় বাংলার হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের।








