পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ সব হোক বরবাদ
গত ১ সেপ্টেম্বর আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদকে রুখে দেওয়ার শপথ নিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি ও সংহতি দিবসে মহামিছিল হল কলকাতায়। প্রতি বছর এই দিনে বামপন্থী, প্রগতিশীল, গণতন্ত্রপ্রিয়, সুশীল সমাজ ও শান্তিকামী মানুষের উদ্যোগে কলকাতায়-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় নানাবিধ কর্মসূচি পালিত হয়। ১ সেপ্টেম্বর দিনটির নেপথ্যে বিশেষ এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত নিহিত রয়েছে। ১৯৩৯ সালের এই দিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল জার্মানির নাৎসী রাষ্ট্রনায়ক অ্যাডলফ হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে। তাই এই দিনটি নিছক শান্তি কামনার দিন নয়; বরং বিস্মৃতিহীন ধিক্কার এবং দানবীয় সাম্রাজ্যবাদী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামে রত থাকার শপথ গ্রহণের দিন। বিশ্বজুড়ে নাৎসীবাদী ও ফ্যাসিবাদী নৃশংসতার শিকার অগণিত মানুষ। একইসঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী সংঘাত ও আগ্রাসন এবং পুঁজিবাদের সীমাহীন লালসা ও ভোগবাদ সর্বস্ব পৃথিবী গড়ার নারকীয় ফর্মূলার শিকার জনমানসের প্রতি সংহতি প্রকাশের দিন।
তাই সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন নীতি এবং পুঁজিবাদের আধিপত্যবাদী চিন্তা-চেতনার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবী এক ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। দেশ-বিদেশের কোথাও শান্তির লেশমাত্র নেই। ক্ষমতার লড়াই, সর্বগ্রাসী রাজনীতি, লাগামছাড়া দুর্নীতি, শাসনের নামে শোষণ, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার জনগণকেই বে-নাগরিক করতে ডার্টি পলিটিক্স, ব্রিটিশের থেকে ধার করা ডিভাইড অ্যান্ত রুল পলিসি কার্যকর করতে জাতপাতের রাজনীতি, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ, জনগণের বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, বেছে বেছে বহুলডোজার অভিযান …. আরো কত কী! এই তালিকা কোথায় গিয়ে শেষ হবে, কেউ জানে না।
সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছে দেশ তথা বিশ্ব। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় প্রায় দু-বছর ধরে লাগাতার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে প্রায় ৬৫ হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে ইসরাইল। সমগ্র উপত্যকা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। মাটি ভিজে আছে মানুষের রক্তে। প্রতিদিন ইসরাইলি বিমান হানায় প্রাণ হারাচ্ছে নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষ। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কেবল হাহাকার, আর্তনাদ আর আহাজারি। কান্নার আওয়াজে ভারাক্রান্ত গাজা উপত্যকা। পাশাপাশি যুদ্ধ চলছে রাশিয়া বনাম ইউক্রেনে। সুদানকে কার্যত শেষ করে দিল পশ্চিমারা। যেভাবে লিবিয়া, লেবানন, ইরাক, সিরিয়ার মতো দেশগুলোকে তারা করেছে। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গৃহযুদ্ধ, সামরিক সংঘাত লেগেই আছে। এসবের পিছনে কলকাঠি নাড়ছে পশ্চিমারাই। সাম্রাজ্যবাদীদের লক্ষ্য যুদ্ধকেন্দ্রিক অর্থনীতি। ফলে সব দেশের বাজেটেই সামরিক খাতে বরাদ্দ আকাশচুম্বী। ফ্যাসিবাদ, বর্ণবাদ, পুঁজিবাদ, যায়নবাদ সব বহুরূপী সেজে বিশ্বকে কব্জা করার খেলায় মেতেছে। এই মারণ-খেলার দর্শক ৮২০ কোটি মানুষ।
যেসব তাত্ত্বিকরা একদা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজন্ত্রের বিপর্যয়ের পর একমেরু বিশ্বের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, আজ তাঁরা মুখ লুকিয়েছেন। অতি সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেস সে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অংকের এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি সামরিক বাজেট পাশ করেছে। এতে অস্ত্র ব্যবসায়ী তথা মৃত্যুর কারবারিদের পোয়া বারো। তাই তারা বলছে, মারো, আরো মারো। তাদের কথায়, বিশ্বজুড়ে কীট-পতঙ্গের মতো পিলপিল করছে মানুষ। এত লোকের ভার পৃথিবী বইতে পারছে না। তাই ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা ও গবেষণা করে মানুষমারা কল করছে খুড়োরা। ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে ছড়ানো হচ্ছে মারণরোগের ভাইরাস। আর মানুষকে কেবল মস্তি-মউজে মশগুল করে রাখা হচ্ছে। ভোগবাদের সর্বগ্রাসী থাবায় মানুষ আজ দিশেহারা। নৈতিকতা, মূল্যবোধের বালাই নেই। গরীব মানুষ আরো গরীব হচ্ছে, ধনীরা দিন কে দিন ধনকুবের হচ্ছে। উচ্ছন্নে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম। রসাতলে যাচ্ছে পৃথিবী। এই সংকট ও অবক্ষয় থেকে উত্তরণের উপায় হল জবাবদিহীর চেতনা। নাহলে পৃথিবী নামক গ্রহ আর বেশিদিন আমাদের বাসযোগ্য থাকবে না।








