জীবনের সৌন্দর্য আবিষ্কারের শিল্পী বিভূতিভূষণ
পাভেল আখতার
নতুন পয়গাম, ১৪ সেপ্টেম্বর
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এমন একজন কথাশিল্পী, যিনি জীবন ও সাহিত্যকে মরমী সুতোয় গেঁথেছিলেন। সাহিত্যের জন্য তাঁকে জীবনের কাছে কৃত্রিমভাবে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে হয়নি। অনিকেত কল্পনার গজদন্তমিনারে তাঁর অবস্থান ছিল না। দেখা জীবন, অভিজ্ঞতালব্ধ জীবন, অনুভূত জীবন অবলীলায় তাঁর সাহিত্যে প্রতিবিম্বিত হয়েছে। ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে বাংলার প্রান্তিক এক গ্রামের দারিদ্র-লাঞ্ছিত এক পরিবারের জীবন সংগ্রামের মধ্যে কোন ‘অপার্থিব আলো’ ছিল, যা আজও আমাদের চোখ অশ্রুসজল করে তোলে? একদিকে দুর্গার অকালমৃত্যু কিংবা দিদিকে হারিয়ে অপুর একা হয়ে যাওয়ার বেদনা, অপরদিকে সর্বজয়ার মধ্যে চিরন্তন সুষমায়, লাবণ্যে, পবিত্রতায় উজ্জ্বল ‘মাতৃমূর্তিখানি’ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠা। ‘সর্বজয়া’ যেন আমাদের সবারই মায়ের প্রতিমূর্তি। আমাদের মায়েরা সত্যিই সবকিছু ‘জয়’ করেন, ‘জয়’ করার ক্ষমতা রাখেন।
বস্তুত, বিভূতিভূষণের সাহিত্য অমলিন সৌন্দর্যে ভাস্বর শাশ্বত জীবনের নিছক উপস্থাপনা নয়, ‘আবিষ্কার’ও বটে; বরং ‘আবিষ্কার’ই প্রধান। আটপৌরে ও অকৃত্রিম জীবন কোথায়, কোন্ গোপন কুঠুরিতে তার নিজস্ব বিমল আনন্দ ও রোমাঞ্চটিকে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে, তাকে ‘আবিষ্কার’ করার কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ। শুধু কি গল্প ও উপন্যাস? তাঁর ডায়েরি বা দিনলিপিগুলিও অনুপম সাহিত্যসম্পদ। ডায়েরি বা দিনলিপি ব্যক্তিগত গদ্য। কিন্তু ‘ব্যক্তিগত গদ্য’ যে নিছক ‘ব্যক্তিগত’ নয়, কিংবা ‘ব্যক্তিগত’ হয়েও তা বড় ‘সামাজিক’, বৃহৎ জনারণ্যের সঙ্গে যার গভীর অন্বয় রচিত হওয়ার ফলে সেসব শুধু ‘পাঠযোগ্য’ই নয়; বরং সমৃদ্ধ ও আলোকিত হওয়ার উপাদান। বিভূতিভূষণের ডায়েরি পড়লে কথাগুলির যথার্থতা বোঝা যায়। মানবিক গুণসম্পন্ন, নরম, সাদা হৃদয়ের এই মানুষটি সংসারের অগণিত পাঁক ও জটিল হিসেব-নিকেশ বুঝতেন না। ‘অল্প লইয়া থাকি তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়’ — রবীন্দ্রনাথের গানের বাণীতে স্থিত ছিলেন বলেই কি তিনি অনেক দুঃখ-যাতনার মধ্যেও সরল ও আনন্দময় জীবনযাপন করতে পেরেছিলেন? ষড়রিপুর উন্মত্ত উল্লাসে দীর্ণ পৃথিবীতে তাঁর যাপিত জীবন ছিল তাঁর সৃষ্টির মতোই আটপৌরে ও সুন্দর।
বিভূতিভূষণের ‘প্রকৃতিপ্রেম’ বলতে নিছক গাছপালাকে ভালবাসা ছিল না। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের আত্মিকতা ও নির্ভরতার সৌন্দর্যকে গাঁথাই বরং ছিল মুখ্য। উপন্যাসে তাঁর নাম না জানা অগণিত গাছের উল্লেখ যেমন আমাদের বিস্মিত করে, তেমনই দোকানের মিষ্টান্ন কপালে না-জুটলেও বনবাদাড় থেকে সংগৃহীত অপাংক্তেয় বুনো ফলের মিষ্টতায় অপু ও দুর্গার রসনা পরিতৃপ্ত হওয়া আমাদের অভিভূত ও ভাবিত করে। প্রকৃতি যেন ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের অপূর্ণতাকে পূর্ণ করার দায় পালন করার জন্য বসে আছে। বিভূতিভূষণ যেন আমাদের কানে কানে বলছেন, অতএব দুঃখের কী আছে? প্রকৃতি, অরণ্য ও অরণ্যের সন্তানদের ‘মুক্ত জীবনের উল্লাস’ তিনি নিপুণভাবে এঁকেছিলেন, তাঁর ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে যা ধরা আছে।
বাংলা ছোটগল্পে অনেক উল্লেখযোগ্য নারী চরিত্র আছে। বনফুলের ‘নিমগাছ’ গল্পের ছোট বউ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘বামা’ ও আশাপূর্ণা দেবীর ‘অনাচার’ গল্পের সুভাষ-কাকিমা। বামা বুদ্ধিমতী, সাহসী। বুদ্ধি আর সাহস দিয়ে সে ফাঁসুড়ে ডাকাতের পরিবারে আগন্তুক ঠাকুরমশাই-এর ‘প্রাণরক্ষা’ করে। সে উদ্বিগ্ন তার শিশুপুত্রটিকে নিয়েও। কারণ, ‘প্রাণহন্তারক’ পূর্বসূরীদের হিংস্র চর্যা থেকে পুত্রকে সে রক্ষা করতে চায়। সুভাষ-কাকিমা স্বামীর মৃত্যুসংবাদ জেনেও মুখ বন্ধ করে রাখে কেবল এই নিষ্ঠুর সংবাদের তুমুল অসহনীয়তা থেকে অসুস্থ, বৃদ্ধ শ্বশুরকে রক্ষা করতে। এজন্য তাকে বাধ্য হয়ে ‘সধবা’ হয়ে থাকতে হয়, যা সমাজের চোখে ‘অনাচার’। কিন্তু, স্বামীকে হারিয়ে কষ্টের পাথর বুকে চেপেও যে ‘মানবিক দায়’ সে পালন করে তার কাছে সমাজ-চক্ষুতে উদ্ভাসিত আপাত অনাচার তুচ্ছ। বনফুলের ‘নিমগাছ’ গল্পটির শেষে লেখক যা বলেছেন, তার সারকথা, একদিকে নারীর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, আর অন্যদিকে সংসারের মাটিতে তার শিকড় গভীরে চারিয়ে যাওয়া। খেয়াল করলে দেখা যাবে, তিনটি নারী চরিত্রেই সাংসারিকতার মধ্যেই নারীর পূর্ণ শোভা বিধৃত হয়ে আছে। এই তিনটি নারী-চরিত্রের মধ্যে বিভূতিভূষণ-এর ‘বামা’ আশ্চর্য ব্যতিক্রম। সে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও রুখে দাঁড়াচ্ছে তাঁর শিশুপুত্রকে একটি ‘আলোকিত জীবন’ উপহার দেওয়ার জন্য, যা একজন মায়ের আদর্শ ভূমিকা। এবং, নারী যে অবলা কিংবা বুদ্ধিহীন মোটেই নয়; বরং ঠিক তার উল্টো, পঞ্চাশের দশকেই বিভূতিভূষণ বামা চরিত্র-সৃজনের মাধ্যমে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
তারপর বিভূতিভূষণের প্রিয় ‘ইছামতি’ দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। অর্বাচীন প্রাচীনপন্থীদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে মেধা, বুদ্ধি, শ্রম ও শক্তিতে নারী তার ‘আপন ভাগ্য জয় করা’র অধিকার আজ ছিনিয়ে নিয়েছে। ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর আলো দেখার পর ছাপ্পান্ন বছরের আয়ুষ্কাল (মৃত্যু: ১ নভেম্বর, ১৯৫০) না পেলে স্বর্ণহৃদয়ের বিভূতিভূষণ আরও অনেক অপরূপ সৃজনবিভায় আমাদের নিশ্চয় ‘আলোকিত’ করতে পারতেন। আজকের বাংলা সাহিত্যের শ্রীহীন, দীন ও জীর্ণ দশা দেখে তাঁর মতো কথাশিল্পীদের অভাব বড় পীড়িত করে।








