সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভণ্ডামির মুখোশ নয়, চাই আপসহীন মুখ
ড. আজিজুল বিশ্বাস
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো রাজ্য-নির্দিষ্ট ঘটনা নয়; এটি আসলে উত্তর ভারত থেকে পূর্ব ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত এক বৃহত্তর সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পরীক্ষাগারের অংশ। বিজেপি-আরএসএস যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মাধ্যমে সংখ্যালঘু ভোট ভাঙা, বিভাজিত করা এবং মূলস্রোতের রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে, তার ছাপ স্পষ্ট বিহার, আসাম, তেলেঙ্গানার হায়দরাবাদ এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদা-মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে যারা নিজেদের সংখ্যালঘু মুসলমানের একমাত্র প্রহরী বলে দাবি করছে, তারা হয় রাজনৈতিকভাবে অন্ধ, নয়ত ইচ্ছাকৃতভাবে এই বৃহত্তর খেলায় অংশীদার।
বিহার তার সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও স্পষ্ট উদাহরণ। মুসলিম জনসংখ্যা যেখানে বহু আসনে নির্ণায়ক, সেখানে আসাদউদ্দীন ওয়েইসির ‘মিম’-এর উপস্থিতি বিজেপি-বিরোধী ভোটকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। ‘মিম’ সেখানে সরকার গঠন করেনি, এমনকি বিরোধী শক্তির কেন্দ্রীয় স্তম্ভও হতে পারেনি; কিন্তু বিজেপির পক্ষে জয়ের অঙ্ক সহজ করে দিয়েছে। বিহারের নির্বাচনী ফলাফলে এটা আর অনুমানের বিষয় নয়, পরিসংখ্যানগত সত্য। মুসলিম ভোট বিভাজনের ফলে যে আসনগুলোতে বিজেপি হারতে পারত, সেখানেই তারা জয় নিশ্চিত করেছে। এই ‘বিহার মডেল’ আজ পশ্চিমবঙ্গেও পরীক্ষিত হতে চাইছে — মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলিতে।
আসামে এই প্রক্রিয়া আরও নগ্ন ও রাষ্ট্রীয় শক্তির মদতে ঘটেছে। এনআরসি, ডিটেনশন ক্যাম্প, নাগরিকত্ব প্রশ্ন — সবকিছুর মধ্য দিয়ে মুসলমানদের প্রথমে সন্দেহভাজন, পরে রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা হয়েছে। সেখানে কোনো শক্তিশালী মুসলিমপন্থী দল ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে পারেনি। বরং বিচ্ছিন্ন পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি মুসলমানদের আরও কোণঠাসা করেছে। আসাম আমাদের শেখায়, আলাদা মুসলিম রাজনীতি বিজেপিকে আটকায় না; বরং তাদের দমননীতিকে বৈধতা দেয়।
হায়দরাবাদে মিম-এর শক্ত ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও বাস্তবতা হল, সেই রাজনীতি তেলেঙ্গানার বাইরে ছড়িয়ে পড়লেই তার চরিত্র বদলে যায়। হায়দরাবাদে মিম একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে কিছু সামাজিক সুরক্ষা দিতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু সর্বভারতীয় পরিসরে তারা বারবার বিজেপির জন্য ভোটকাটা ফ্যাক্টরে পরিণত হয়েছে। দিল্লি, মহারাষ্ট্র, বিহার — সব জায়গাতেই ফল এক। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে একই পথ হাঁটা মানে ইতিহাস থেকে কিছুই না শেখা।
পশ্চিমবঙ্গের মালদা-মুর্শিদাবাদ এই মুহূর্তে বিজেপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষাক্ষেত্র। এখানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রশাসনিক ক্ষমতা ও ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতি, অন্যদিকে কংগ্রেসের ক্ষয়িষ্ণু উপস্থিতি, তার উপর মিম, আইএসএফ বা সম্ভাব্য নতুন মুসলিমপন্থী দলের আগমন — এই বিভাজনের সুযোগেই বিজেপি ‘হিন্দু সংহতি’র রাজনীতি খেলতে চাইছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সামশেরগঞ্জ, ধুলিয়ান, ফরাক্কা, মোথাবাড়ির ঘটনা দেখিয়েছে, কীভাবে সামান্য উত্তেজনাকে বড় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে পরিণত করা যায়। এই প্রেক্ষিতে মুসলিম ভোটের সামান্য বিভাজনও বিজেপির জন্য আশীর্বাদ।
এই জায়গাতেই হুমায়ূন কবীরের প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হুমায়ূন ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছেন, তিনি মুসলিম আবেগকে তীব্র ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন এবং মিডিয়ার নজর কাড়তে জানেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ভাষা ও সম্ভাব্য নতুন রাজনৈতিক দল মুসলিম সমাজকে কী দেবে? প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে, নাকি ভোট ভাগ করবে? যদি তাঁর রাজনৈতিক প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু হয় আলাদা মুসলিম মঞ্চ তৈরি করা, তবে তা বিজেপির বিরুদ্ধে নয়, বিজেপির কৌশলের মধ্যেই পড়ে যাবে। ইতিহাস সাক্ষী — এই পথের শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
এই পুরো সংকটের আরেকটি দিক হল তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ মূলধারার দলগুলির ভণ্ডামি। তারা মুসলিম ভোট চায়, কিন্তু মুসলিম নেতৃত্ব চায় না। বিজেপির ভয়ে তারা ক্রমশ ডানদিকে সরে যাচ্ছে, সংখ্যালঘু প্রশ্নে নীরবতা পালন করছে, এমনকি মুসলিম অধ্যুষিত আসনেও ‘জেতার সম্ভাবনা’ দেখিয়ে সংখ্যাগুরু প্রার্থী দাঁড় করাচ্ছে। ফলে মুসলিম সমাজ দ্বিগুণ ক্ষতিগ্রস্ত — একদিকে বিজেপির প্রকাশ্য বিদ্বেষ, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে রাজনৈতিক বর্জন।
এই অবস্থায় মুসলিম সমাজ যদি প্রতিক্রিয়াশীল পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির দিকে ঝোঁকে, তবে তা হবে বিজেপির জন্য সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি। বিজেপি চায় মুসলমানরা আলাদা থাকুক, বিচ্ছিন্ন থাকুক, নিজেদের মধ্যে লড়াই করুক। মিম, আইএসএফ বা সম্ভাব্য নতুন দল যদি এই বিচ্ছিন্নতাকে রাজনৈতিক কৌশল বানায়, তবে তারা চাক বা না-চাক, বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশে পরিণত হবে।
বাস্তবসম্মত দিশা একটাই। বিজেপিকে হারাতে হলে ভোটের ঐক্য অপরিহার্য। মুসলিমপন্থী দলগুলির কাজ নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ভোট কাটা নয়, বরং সাংবিধানিক প্রশ্নে চাপ তৈরি করা, মূলধারার দলগুলিকে আনুপাতিক হারে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব দিতে বাধ্য করা। মূলস্রোতের দলগুলিকে বুঝতে হবে, মুসলিম ভোট আর মুসলিম নেতৃত্বকে আলাদা করা যাবে না। আর মুসলিম সমাজকে বুঝতে হবে — আবেগী স্লোগান নয়, ফলাফলই শেষ কথা।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে হারানোর লড়াই কোনো ধর্মীয় সংঘর্ষ নয়; এটি গণতন্ত্র বনাম সাম্প্রদায়িক রাজনীতির লড়াই। সেখানে মুসলিম ইস্যু কেন্দ্রীয়, কিন্তু একমাত্র নয়। যে রাজনীতি বিজেপির পথ প্রশস্ত করে, সে রাজনীতি যতই ধর্মের নাম নিক, ততটাই বিপজ্জনক। আজ যদি এই সত্য বলা না যায়, তবে আগামীকাল বিজেপির উত্থানের জন্য আর কাউকে দোষ দেওয়ার নৈতিক অধিকার থাকবে না। (মতামত লেখকের নিজস্ব)।
(লেখক: অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর- সরোজিনী নাইডু কলেজ ফর উইমেন এবং অল ইন্ডিয়া মাইনরিটি অর্গানাইজেশনের কার্যকরী সভাপতি: পশ্চিমবঙ্গ)








