রাষ্ট্রসংঘ দিবস: যুদ্ধের ছাই থেকে শান্তির স্বপ্নে বিশ্ব ঐক্য, শান্তি ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলনের এক দিন
ড. রেয়াজ আহমদ ও সাদ্দাম হোসেন
প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয় রাষ্ট্রসংঘ দিবস হিসেবে। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা মানবতার নতুন শপথের প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা থেকে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রসংঘ আজও মানব সভ্যতাকে মনে করিয়ে দেয়, শান্তির যাত্রা কখনও সম্পূর্ণ হয় না, বরং প্রতিটি প্রজন্মকেই সেই পথ আবার নতুন করে নির্মাণ করতে হয়। এ বছর রাষ্ট্রসংঘ পদার্পণ করেছে ৮০তম বর্ষে। এবারের থিম —“Promoting Peace, Unity and Global Partnership” — বিশ্বের বিভাজন ও সংঘাতের সময়ে মানবতার এক নতুন ডাক।
শান্তির ইতিহাস থেকে নৈতিক দায়বদ্ধতার পাঠ:
১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর কার্যকর হয় United Nations Charter — যে দিনটি আজ রাষ্ট্রসংঘ দিবস হিসেবে পালিত হয়। এর মূলে ছিল এক গভীর উপলব্ধি: যুদ্ধ নয়, সহযোগিতাই সভ্যতার একমাত্র পথ। “We the peoples of the United Nations, determined to save succeeding generations from the scourge of war” — এই বাক্য শুধু একটি ঘোষণাপত্র নয়, বরং মানবজাতির আত্মসমালোচনার প্রতিধ্বনি। তবু প্রশ্ন রয়ে গেছে — রাষ্ট্রসংঘ কি আজও সেই আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে পারছে? নাকি এটি আজ রাজনৈতিক স্বার্থ, কূটনৈতিক কৌশল ও ক্ষমতার ভারসাম্যের ফাঁদে আটকে পড়েছে?
অর্জনের পাশাপাশি আত্মসমালোচনার সময়: রাষ্ট্রসংঘের ভূমিকা নানা ক্ষেত্রেই প্রশংসনীয়।
৭০টিরও বেশি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তিরক্ষা মিশন পরিচালনা, ১৯৪৮ সালের Universal Declaration of Human Rights, গুটি বসন্ত নির্মূল, UNESCO-র মাধ্যমে সংস্কৃতি ও শিক্ষার প্রচার — সবই রাষ্ট্রসংঘের ঐতিহাসিক সাফল্য। ২০১৫ সালে ঘোষিত Sustainable Development Goals (SDGs) আধুনিক মানবতার উন্নয়নের নীলনকশা। কিন্তু এই উজ্জ্বলতার মধ্যেও কিছু অন্ধকার থেকে যায়। রুয়ান্ডা, বসনিয়া, ইউক্রেন কিংবা গাজার মতো সংকটে রাষ্ট্রসংঘ প্রায়ই নিষ্ক্রিয় দর্শক — যেখানে “ভেটো ক্ষমতা” মানবাধিকারের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয় — রাষ্ট্রসংঘ শুধু কাগুজে শান্তির প্রতীক নয়, বাস্তবে তা রূপ দিতে হলে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নৈতিক সাহস।

ভারত, শান্তির বার্তা থেকে গ্লোবাল নেতৃত্বে:
রাষ্ট্রসংঘের জন্মলগ্ন থেকেই ভারত তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। “বসুধৈব কুটুম্বকম” — পুরো বিশ্বই আমাদের পরিবার — এই দর্শন ভারতীয় কূটনীতির ভিত্তি। আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত রাষ্ট্রসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে ভারত অন্যতম বৃহত্তম অবদানকারী দেশ। আজ ভারতের কণ্ঠে শোনা যায় গ্লোবাল সাউথের দাবি — ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, ও প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি। “AI for All” ও “Digital Public Infrastructure”-এর মতো উদ্যোগ রাষ্ট্রসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে ভারতকে যুক্ত করছে এক নতুন নেতৃত্বের ভূমিকায়। ভারতের দর্শন — “One Earth, One Family, One Future” — আজ রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে শান্তির এক বিকল্প ভাষা তৈরি করছে, যেখানে প্রযুক্তি ও মানবতা একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, পরিপূরক।
নতুন বাস্তবতা, নতুন রাষ্ট্রসংঘ:
২১ শতকের রাষ্ট্রসংঘকে এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে — ডিজিটাল সুরক্ষা, তথ্যযুদ্ধ, জলবায়ু অভিবাসন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার ইত্যাদি। এই পরিবর্তিত বিশ্বে রাষ্ট্রসংঘকে শুধু “নীতি প্রণেতা” নয়, হতে হবে বাস্তব সমস্যার সমাধানকারী প্রতিষ্ঠান। শান্তি ও উন্নয়ন এখন কেবল সামরিক ও অর্থনৈতিক নয় — এটি মানসিক ও প্রযুক্তিনির্ভরও বটে। রাষ্ট্রসংঘের কার্যকারিতা তাই নির্ভর করছে এর সংস্কার, স্বচ্ছতা, এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নৈতিক ঐক্যের ওপর। একটি স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্রসংঘই হতে পারে আগামী পৃথিবীর আশা।
শেষকথা: শান্তির শপথ নতুন করে
রাষ্ট্রসংঘ দিবস কেবল একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা নয় — এটি আত্মবিশ্লেষণের দিন। আমরা কি সত্যিই শান্তির পথে এগোচ্ছি, নাকি কেবল বক্তব্যে শান্তি খুঁজে নিচ্ছি? শান্তি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানব অস্তিত্বের মৌলিক শর্ত। এই উপলক্ষে আমাদের শপথ হোক — সেতু গড়ি, দেয়াল নয়; সংলাপ খুঁজি, সংঘাত নয়; মানবতাকে বেছে নিই অহংকারের আগে। কারণ, রাষ্ট্রসংঘ কেবল নিউ ইয়র্কের ভবন নয়, এটি আমাদের অন্তরে — আমাদের মূল্যবোধ, সহমর্মিতা ও মানবিক দায়বোধের প্রতীক। যুদ্ধের ছাই থেকে শান্তির ফুল ফোটানোর এই প্রতিজ্ঞাই হোক রাষ্ট্রসংঘ দিবসের আসল বার্তা।
(লেখকদ্বয় ড. রেয়াজ আহমদ, অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, এইচইউসি, আজমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
এবং সাদ্দাম হোসেন, সহকারী অধ্যাপক, গণমাধ্যম বিভাগ, নেতাজি নগর কলেজ, কলকাতা)।








