ট্রাম্পের এক বছর বাজি ও ডিগবাজি
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন ২০ জানুয়ারি ২০২৫। তারপর গত এক বছরে বিশ্বব্যবস্থাকে ওলটপালট বা তছনছ করে দিয়েছেন তিনি।
শপথ নিয়ে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে ট্রাম্প ঊনিশ শতকের ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’ মতবাদের কথা উল্লেখ করেন। এটি এমন এক ধারণা, যাতে মনে করা হয়, পুরো মহাদেশে নিজেদের এলাকা সম্প্রসারণ করা এবং আমেরিকার নীতিমালা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমেরিকাকে বেছে নিয়েছেন খোদ গড। তাই ‘ঈশ্বরের বরপুত্র’ হিসেবে শুরু থেকেই তিনি কেশর ফুলিয়ে তর্জন গর্জন করে চলেছেন। এক বছর ধরেই নাগাড়ে বলে চলেছেন, পানামা খাল দখল করে নেবে, গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেবো, কানাডাকে আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানাব এবং সর্বোপরি ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা কেড়ে নেব।
আমেরিকার ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত আগ্রাসন, দখলদারিত্ব এবং শাসক ও সরকার পতনের জন্য চালানো গোপন অভিযানের নজির রয়েছে। কিন্তু গত এক শতাব্দীতে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট মিত্রদেশকে দখল করে সেখানকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শাসন করার হুমকি দেননি।
কোনো মার্কিন রাষ্ট্রনেতা এতটা নির্দয়ভাবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রথা ভাঙেননি বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা দীর্ঘস্থায়ী জোটগুলোকে এতটা হুমকির মুখে ফেলেননি। দেশে-বিদেশে তাঁর কট্টরপন্থী সমর্থকেরা উচ্ছ্বসিত; কিন্তু বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা লাফিয়ে বাড়ছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দাভোস ইকোনমিক ফোরামে ট্রাম্পের নাম উহ্য রেখে কঠোর বার্তা দিয়ে বলেন, ‘এটি এমন এক বিশ্বের দিকে মোড় নিচ্ছে, যেখানে কোনো নিয়ম নেই, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন পদদলিত হয় এবং যেখানে সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কেবল শক্তিমানের আইনই কার্যকর থাকে।’
শুল্ক আরোপ নিয়ে তীব্র বাণিজ্য-যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা হলে ৭৬ বছরের পুরনো ন্যাটো সামরিক জোটও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাতে ট্রাম্পের আমেরিকা বনাম ইউরোপ যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। ট্রাম্প বলেছেন, আটটা দেশে যুদ্ধ থামিয়েও আমি যখন নোবেল পুরস্কার পাইনি, তখন শান্তি নিয়ে আর অত মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। এমনকী নোবেলদাতা নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে হুমকিও টেন ট্রাম্প। এর আগে তিনি আমেরিকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের নাম বদলে করেন ‘মিনিস্ট্রি অফ ওয়ার’ অর্থাৎ যুদ্ধ মন্ত্রক। এও বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন আমার প্রয়োজন নেই। তাঁর কথায়, আমার আইন হল আমেরিকা ফার্স্ট। তার জন্য আন্তর্জাতিক আইন লাগবে না, আমেরিকার আইনই যথেষ্ট। পাশাপাশি একসঙ্গে ৬৬টা আন্তর্জাতিক সংস্থা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা করেছেন গত সপ্তাহে। গত সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেসে ‘গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ আইন’ বিল উত্থাপন করেছেন। ট্রাম্প এও বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে এখন আর পিছু হটার জায়গা নেই। এ ব্যাপারে যেসব ইউরোপীয় দেশ বাধা দেবে, তাদের ওপর চড়া হারে শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়ে দেখে নেবেন বলেছেন।
সবকিছু দেখে শুনে মনে হচ্ছে, ট্রাম্প হয়ত আমেরিকার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। অথবা আমেরিকাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে এসব হঠকারী কাজকর্ম করে চলেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা যে বিশ্বের শীর্ষাসনে উঠে এসেছে, তাকে টেনে নীচে নামাতে আত্মঘাতী গোল দিতে পারেন ট্রাম্প। হয়ত-বা ট্রাম্পের হাত ধরেই আমেরিকার পতন হবে। হয়ত-বা আমেরিকার কফিনে শেষ পেরেক হতে পারেন ট্রাম্প।
গত এক বছরে তিনি একের পর এক বাজি ধরেছেন, আবার পদে পদে ডিগবাজিও খেয়েছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যা অবাক করে দেওয়ার মতো। সেই তালিকা এই পরিসরে সংযুক্ত না করলেও চলে। কিন্তু ট্রাম্পের সেসব বাজি ও ডিগবাজির পক্ষে সাফাই দিতে গিয়ে তাঁর উপদেষ্টাদের কালঘাম ঝরে গেছে। তারা দিনরাত পরিশ্রম করে সকাল বিকাল ট্রাম্পের ভোল বদলানোকে যৌক্তিক প্রমাণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর ট্রাম্প নিজেকে ডন ও মাফিয়া হিসেবে তুলে ধরতে সর্বদা যেন খাপখোলা তলোয়ারের মতো আচরণ করছেন। কানাডা থেকে গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক সবাই ট্রাম্পের দখলদার নীতিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, তাদের দেশ নট ফর সেল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, তারা ট্রাম্পের আমেরিকার কাছে জিম্মি থাকতে রাজি নয়। ভারত সরকারও ট্রাম্পের শুল্ক-যুদ্ধের পরোয়া না করে ক্রমেই রাশিয়া-চীন বলয়ে সদর্পে এগিয়ে চলেছে। তাই ট্রাম্পের মনে হচ্ছে যেন, তার পায়ের নীচের মাটি আলগা হচ্ছে। কিন্তু তিনি কখন যে কী বলেন, আর কখন কী করে বসেন, তা আগাম টের পাওয়া চাড্ডি-খানি কথা নয়। কখনও তিনি রামধনু, কখনো বহুরূপী।







