একলা পথিকের বাগান
সুরাজ পাল
জার্মানির থুরিনজিয়া। ঘন জঙ্গল। ছায়ায় ঢাকা, স্যাঁতস্যাঁতে গ্রাম। সেখানেই ১৭৮২ সালে জন্ম ফ্রেডরিখ ফ্রয়েবেলের। জন্মের মাত্র নয় মাসের মাথায় মা মারা গেলেন। ছোট্ট ফ্রেডরিখ জানল না মায়ের আদর কাকে বলে। বাবা জোহান জ্যাকব ফ্রয়েবেল ছিলেন গির্জার যাজক। ভীষণ রাশভারী, কড়া মেজাজের মানুষ। তাঁর কাছে ধর্ম মানে কঠোর অনুশাসন, আবেগের কোনো জায়গা নেই। অনাদরে, অবহেলায় বড় হতে লাগল ছেলেটি। সৎ-মা এলেন সংসারে। প্রথম প্রথম একটু স্নেহ জুটল, কিন্তু নিজের সন্তান আসতেই ফ্রেডরিখ হয়ে গেল ‘পর’। ঘরের কোণে, সিঁড়ির তলায় একা বসে থাকত সে। কেউ তার খোঁজ নিত না। তাকে বল হত ‘দুষ্টু’, ‘অপদার্থ’। বাড়িতে টেকা দায়। বাবার চোখরাঙানি। ফ্রেডরিখ পালাল জঙ্গলে। গাছগুলো বকে না। পাখিরা মুখ ফিরিয়ে নেয় না। ঝরনাটা কেমন কুলকুল করে কথা কয়। ছেলেটা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকে গাছের পাতার দিকে। ফুলের পাপড়ির দিকে। কী অদ্ভুত সাজানো! তিনটে পাপড়ি, পাঁচটা পাপড়ি। কী সুন্দর জ্যামিতি! স্কুল তো আরেক জেলখানা। তোতাপাখির মতো বুলি আওড়াও। তাঁর মাথায় কিচ্ছুটি ঢোকে না। শিক্ষকরা বলেন, ‘গাধা। কিচ্ছু হবে না একে দিয়ে।’ সবাই যখন ‘বোকা’ বলছে, তখন প্রকৃতির পাঠশালায় সে তৈরি হচ্ছে। সে শিখছে, সব কিছুর মধ্যে একটা মিল আছে। একটা সুর আছে।

কৈশোর পেরোল। কিন্তু কী করবেন জীবনে? কিছুই যে ভালো লাগে না। শুরুতে বনবিভাগের কাজ নিলেন। জঙ্গল মাপার কাজ। ভালোই লাগত। তাতে তো পেট চলে না। তারপর গেলেন খনিতে। পাথর দেখার কাজ। হাতে তুলে নিলেন স্ফটিক। অবাক হয়ে দেখলেন, বাইরেটা এবড়োখেবড়ো, অথচ ভিতরটা কী নিখুঁত! আলো পড়লে ঠিকরে বেরোয়। ভাবলেন, মানুষের মনটাও তো স্ফটিকের মতো। বাইরে যতই ধুলোবালি থাক, ভিতরে আলো লুকোনো আছে। সেই আলোটা বের করতে হবে। এরপর আর্কিটেকচার পড়লেন কিছুদিন। এভাবেই কাটছিল। ছন্নছাড়া জীবন। উদ্দেশ্যহীন।
হঠাৎ একদিন দেখা এক বন্ধুর সঙ্গে। বন্ধু বললেন, ‘তুমি তো পড়াতে ভালোবাসো। চলো ফ্রাঙ্কফুর্ট। ওখানে একটা নতুন ধরনের স্কুল হয়েছে।‘ স্কুলের প্রধান গ্রুনার সাহেব। পেস্তালৎসির ছাত্র। সেখানে গিয়ে ফ্রেডরিখের চোখ ছানাবড়া। আরে! এখানে তো মারধোর নেই। বাচ্চারা হাসছে। ক্লাসঘরে ঢুকে পড়লেন তিনি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বুঝলেন, এটাই তো আমি চেয়েছিলাম! শিশুদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি যেন নিজেকে আবিষ্কার করলেন। ছুটলেন পেস্তালৎসির কাছে। সুইজারল্যান্ডে। ইভারদঁ-এ গিয়ে দেখলেন এলাহি কাণ্ড। ভালোবাসা দিয়ে শেখানো হচ্ছে। কিন্তু ফ্রেডরিখের জ্যামিতিক মন খুতখুত করে উঠল। ভালোবাসা আছে, অথচ কোনো ‘পদ্ধতি’ নেই। সব কেমন যেন ছড়ানো-ছিটোনো। ভাবলেন, ভালোবাসার সঙ্গে বিজ্ঞানকে মেশাতে হবে। আবেগের সঙ্গে নিয়মকে মেশাতে হবে। তবেই তো পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা।

যুদ্ধ এল। নেপোলিয়নের যুদ্ধ। ফ্রেডরিখও যোগ দিলেন। বন্দুকের নলে মন টেকে না। যুদ্ধশেষে ঘরে ফিরলেন। এবার আর একা নন। সঙ্গে কিছু স্বপ্ন। ইতিমধ্যেই দাদা মারা গেছেন। রেখে গেছেন বিধবা স্ত্রী ও তিন সন্তান। ফ্রেডরিখ ভাইপোদের দায়িত্ব নিলেন। তিনটে বাচ্চাকে মানুষ করতে গিয়েই তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু হল। দেখলেন, শিশুরা আসলে কী চায়? তারা কি কেবল জ্ঞান চায়? না। তারা চায় ‘কাজ করতে’। হাত-পা নাড়তে। তারা গড়তে চায়। ভাঙতে চায়। বড়রা ভাবে খেলা মানে সময় নষ্ট। অথচ, শিশুর কাছে খেলাটাই কাজ। ওটাই তার তপস্যা। একটা সাত বছরের বাচ্চার কাছে মাটির ঘর বানানো আর একজন ইঞ্জিনিয়ারের কাছে ব্রিজ বানানো দুটোই সমান সিরিয়াস কাজ।
১৮৩৭ সাল। পাহাড়ের কোলের ব্ল্যাঙ্কেনবার্গ গ্রাম। ফ্রেডরিখ একটা প্রতিষ্ঠান খুললেন। কিন্তু নাম কী দেবেন? স্কুল? না, ওটা বড্ড ভারী শব্দ। ইনস্টিটিউট? সেটাও বড্ড যান্ত্রিক। পাহাড়ি পথ ধরে তিনি হাঁটছেন। নিচে সবুজে মোড়া উপত্যকা। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা বাগান। সেখানে ছোট ছোট চারাগাছ। মালী খুব যত্ন করে জল দিচ্ছে। আগাছা সরিয়ে দিচ্ছে। যাতে গাছটা নিজের মতো করে বাড়তে পারে। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ইউরেকা!’ পেয়ে গেছি নাম! কিন্ডারগার্টেন। চিলড্রেনস গার্ডেন। শিশুদের বাগান। শিশু হল চারাগাছ। স্কুল বাগান। আর শিক্ষক? শিক্ষক হলেন মালী। মালী যেমন গাছকে টেনে লম্বা করে না, শুধু পরিবেশটা দেয়, শিক্ষকও তাই করবেন। পৃথিবী অবাক হয়ে শুনল নামটা। স্কুল আবার বাগান হয় নাকি?
স্কুল তো হল। কিন্তু বাচ্চারা করবেটা কী? বই নেই। শ্লেট নেই। ফ্রেডরিখ ঝুলি থেকে বের করলেন জাদু-খেলনা। নাম দিলেন ‘গিফট’ বা উপহার। জার্মান ভাষায় ‘গাবে’। প্রথম উপহার নরম উলের বল। রঙিন। কেন বল? কারণ বলের কোনো কোণা নেই। আঘাত লাগে না। বল চঞ্চল। ঠিক শিশুর মতো। গড়িয়ে চলে। বল দিয়েই শিশু শিখবে গতি। শিখবে রং। দ্বিতীয় উপহার কাঠের গোলক, ঘনক ও চোঙ। বাচ্চা খেলতে গিয়ে দেখল গোলকটা গড়িয়ে যায়। কিন্তু চৌকোনা ঘনকটা ধপ করে বসে থাকে। নড়ে না। খেলার ছলে শিশু শিখে গেল, জগতে দু’রকম জিনিস আছে। একদল চলে, একদল থামে। গতি আর স্থিতি। বই পড়ে এটা শেখাতে গেলে ছ’মাস লাগত। বল দিয়ে খেলতে গিয়ে ছ’মিনিটে শেখা হয়ে গেল।
শুধু দেখলে হবে না। করতেও হবে। ফ্রেডরিখ নিয়ে এলেন হাতের কাজ। নাম দিলেন ‘অকুপেশন’। কাগজ ভাঁজ করা। আজ যাকে আমরা ওরিগামি বলি। কাঠি দিয়ে নকশা বানানো। কাদামাটি দিয়ে পুতুল গড়া। বালির ওপর আঁকিবুঁকি। তখনকার দিনের পণ্ডিতরা নাক সিটকোলেন। ‘ছি ছি! ভদ্রলোকের বাচ্চারা কাদা ঘাঁটবে? কাগজ কাটবে?’ তিনি হাসলেন। বললেন, ‘শুনুন মশাই, আঙুলের ডগা যার তৈরি হল না, তার মগজ কোনোদিন তৈরি হবে না।’ সৃজনশীলতা তো আর আকাশ থেকে পড়ে না। এই যে ভাঙা আর গড়া, এর মাধ্যমেই তো শিশু স্রষ্টা হয়ে ওঠে।
সকালবেলা। কিন্ডারগার্টেনে ফ্রেডরিখ সবাইকে নিয়ে গোল হয়ে দাঁড়ালেন। মাটিতে দাগ কাটা বড় বৃত্ত। সবাই সবার হাত ধরল। কেন গোল হয়ে দাঁড়ানো? বেঞ্চে বসলে কেউ আগে বসে, কেউ পিছে। যে পিছে বসে, সে নিজেকে ছোট ভাবে। কিন্তু বৃত্তে? বৃত্তের কোনো শুরুও নেই, শেষও নেই। সবাই সমান। সবাই সবার মুখ দেখতে পাচ্ছে। গলা ছেড়ে গান ধরলেন তিনি। ‘এসো খেলি, এসো গড়ি…’ গানের সঙ্গে নাচ। অভিনয়ের ভঙ্গিতে শরীরচর্চা। খরগোশ কেমন করে লাফাচ্ছে? পাখি কেমন করে উড়ছে? শিশুরা নকল করছে আর হাসছে। একঘেয়ে ক্লাসরুমের বদলে প্রাণচঞ্চল হাসিটুকুই তো চেয়েছিলেন তিনি।
সেকালে মাস্টারমশাই মানেই হাতে বেত, চোখে চশমা, রাশভারী পুরুষ। ফ্রেডরিখ বললেন, ‘ও চলবে না।‘ শিশুর প্রথম শিক্ষক কে? মা। মায়ের চেয়ে ভালো কেউ শিশুকে বোঝে না। তাহলে স্কুলের শিক্ষক কেন পুরুষ হবে? ডাক দিলেন মেয়েদের। বললেন, ‘এসো, তোমরা ভার নাও বাগানের।‘ সমাজ তো রেগে আগুন! মেয়েরা ঘরের বাইরে কাজ করবে? তাও আবার শিক্ষকতা? তিনি পাত্তা দিলেন না। মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করলেন। শেখালেন গান, খেলা, শিশু-মনস্তত্ত্ব। আজ যে আমরা নার্সারি স্কুলে বা প্রাইমারিতে এত দিদিমণি বা ম্যাম দেখি তার রাস্তাটা কিন্তু এই মানুষটাই তৈরি করে দিয়েছিলেন। তিনি নারীকে দিলেন সম্মান, শিশুকে দিলেন মাতৃস্নেহ।
বাগানে যখন ফুল ফুটছে, ঠিক তখনই নামল ঝড়। ১৮৫১ সাল। প্রুশিয়ার রাজা আর তাঁর মন্ত্রীরা ভয় পেলেন। ভয়টা কিসের? এই যে বাচ্চারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করছে। গোল হয়ে হাত ধরাধরি করে সাম্যের গান গাইছে। এসব তো রাজতন্ত্রের জন্য বিপদ! এরা বড় হয়ে যদি প্রশ্ন করে? যদি মাথা নোয়াতে না চায়? রাজা হুকুম দিলেন ‘কিন্ডারগার্টেন নিষিদ্ধ।‘ অপবাদ দেওয়া হল, স্কুলগুলো নাকি সমাজতন্ত্র আর নাস্তিকতা ছড়াচ্ছে। এগুলো ধর্মের শত্রু। পুলিশ এল। তালা ঝোলাল বাগানের ফটকে। বইপত্র বাজেয়াপ্ত হল।
খবরটা যখন এল, ফ্রেডরিখের বয়স তখন সত্তর ছুঁইছুঁই। শরীর ভেঙে পড়েছে। যে স্বপ্ন তিনি তিল তিল করে গড়েছিলেন, রাজার এক কলমের খোঁচায় তা চুরমার হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা দুমড়ে গেল তাঁর। বলেছিলেন, ‘ওরা আমার স্কুল বন্ধ করতে পারে। কিন্তু সত্যকে? তাকে তো আর তালাবন্ধ করে রাখা যায় না। আমি যে বীজ বুনে দিয়ে গেলাম, তা একদিন মহীরুহ হবেই।‘ ১৮৫২ সাল। গ্রীষ্মের এক দুপুরে ফ্রেডরিখ ফ্রয়েবেল চলে গেলেন। দেখে মনে হল সব শেষ। তাঁর বাগান তখন আগাছায় ভরা, ফটকে মরচে ধরা তালা।
গল্প এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু হল না। আগুন ছাইচাপা থাকে না। জার্মানিতে নিষিদ্ধ কিন্ডারগার্টেন। তাতে কী? ফ্রয়েবেলের ছাত্রীরা ছড়িয়ে পড়ল সারা পৃথিবীতে। কেউ গেল আমেরিকায়, কেউ ইংল্যান্ডে, কেউ ফ্রান্সে। সঙ্গে করে নিয়ে গেল সেই রঙিন বল, সেই কাগজ ভাঁজ করার খেলা, আর সেই গান। এদেরই একজন ব্যারনেস ফন মারেনহোলজ। অভিজাত মহিলা। তিনি পণ করলেন, গুরুর অপমান ঘুচিয়ে ছাড়বেন। তিনি দেশে দেশে ঘুরে প্রচার করলেন, ‘ওটা নাস্তিকতা নয়, ওটাই মুক্তির পথ।‘ ধীরে ধীরে মানুষের ভুল ভাঙল। জার্মানিও একদিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হল।
আজ আপনি পৃথিবীর যে প্রান্তেই যান, টোকিও থেকে নিউইয়র্ক, কলকাতা থেকে কায়রো। ছোটদের স্কুল মানেই কিন্ডারগার্টেন বা ‘কেজি’। আজও বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে ছবি আঁকে। মাটির পুতুল গড়ে। গোল হয়ে হাতে হাত রেখে গান গায়। ব্লক দিয়ে বাড়ি বানায়। ওরা জানে না, এই আনন্দের খেলাটা কে আবিষ্কার করেছিল। জানার দরকারও নেই। কিন্তু আমরা জানি। আমরা জানি, থুরিনজিয়ার সেই একলা ছেলেটা, যে একদিন জঙ্গলে বন্ধু খুঁজেছিল, সে-ই আমাদের শিশুদের একলা হতে দেয়নি। প্রতিটি প্লে-স্কুলের রঙিন দেওয়াল, প্রতিটি খেলার সরঞ্জাম, সবকিছুর মধ্যে ফ্রেডরিখ ফ্রয়েবেল বেঁচে আছেন। তিনি আছেন সেই মালীর মতো, যে আড়াল থেকে দেখে আর হাসে। কারণ, বাগান মরেনি। ফুলগুলো রোজ নতুন করে ফোটে।








