লেখনী, বক্তৃতা ও নেতৃত্বে অবিস্মরণীয় বাঙালি শেরে বাংলা ফজলুল হক
মনিরুল ইসলাম তপন
“আমি কংগ্রেসীদের ভারতীয় জাতীয়তা বুঝি না, আমি বুঝি বাঙালির জাতীয়তা। এ জাতীয়তা প্রতিষ্ঠা করতে পারে একমাত্র ফজলুল হক। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাঙালি এবং একই সঙ্গে আপাদমস্তক খাঁটি মুসলমান ছিলেন ফজলুল হক। খাঁটি বাঙালি আর খাঁটি মুসলমানের এমন অপূর্ব সমন্বয় আমি আর দেখি নাই। খাঁটি বাঙালিত্ব আর খাঁটি মুসলমানত্বের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাঙালির জাতীয়তা। ফজলুল হক ওই সমন্বয়ের প্রতীক। ওই প্রতীক তোমরা ভেঙো না। ফজলুল হকের অমর্যাদা তোমরা করো না। আমি বলছি, বাঙালি যদি ফজলুল হকের মর্যাদা না দেয়, তবে বাঙালির বরাতে দুঃখ আছে” — ফজলুল হককে বুঝতে গেলে তাঁর শিক্ষক আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের এই বক্তব্যের গভীরতা অনুভব করতে হবে।
বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক শিকড় ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় যাঁরা জীবন ব্যয় করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। বাঙালি জাতির ভিতর যে ক্ষত আর বিভাজন তৈরি হচ্ছিল, সেটা তিনি গভীরভাবে অনুভব করতেন। মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসা, সাহস আর নিষ্ঠা এমনই ছিল যে, ভবিষ্যত বাঙালির জাতীয় পরিচয় গড়ে উঠেছিল অনেকটা তাঁরই নেতৃত্বের পথ ধরে।
শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক কেবল ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেননি। তিনি মানুষের কল্যাণে রাজনীতিকে ব্যবহার করেছেন। ১৯৩৭ সালে তিনি অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন। তাঁর গৃহীত ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ কৃষক শ্রেণির জন্য ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ। জমিদারদের শোষণ রোধ করে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন প্রথম সফল রাজনীতিক। তাঁর রাজনীতি ছিল সাধারণ মানুষের জন্য জনকল্যাণকর রাজনীতি। কৃষক, শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তাঁর প্রশাসন স্বচ্ছতা, সামাজিক ন্যায় ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের ওপর অটুট ছিল, যা আজও দৃষ্টান্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন — ‘রাজনীতি তখনই সার্থক, যখন তা মানুষের জীবনে সুখ আনে।’
“আমি কংগ্রেসীদের ভারতীয় জাতীয়তা বুঝি না, আমি বুঝি বাঙালির জাতীয়তা। এ জাতীয়তা প্রতিষ্ঠা করতে পারে একমাত্র ফজলুল হক। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাঙালি এবং একই সঙ্গে আপাদমস্তক খাঁটি মুসলমান ছিলেন ফজলুল হক। খাঁটি বাঙালি আর খাঁটি মুসলমানের এমন অপূর্ব সমন্বয় আমি আর দেখি নাই। খাঁটি বাঙালিত্ব আর খাঁটি মুসলমানত্বের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাঙালির জাতীয়তা। ফজলুল হক ওই সমন্বয়ের প্রতীক। ওই প্রতীক তোমরা ভেঙো না। ফজলুল হকের অমর্যাদা তোমরা করো না। আমি বলছি, বাঙালি যদি ফজলুল হকের মর্যাদা না দেয়, তবে বাঙালির বরাতে দুঃখ আছে”
–আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

শিক্ষা ও সমাজসেবায় তিনি ছিলেন অগ্রদূত। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষাই জাতির মুক্তির একমাত্র পথ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামিক কলেজের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতির বহুমুখী প্রসার ঘটিয়েছেন। গ্রামীণ বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার সরকারি সহায়তা তাঁর উদ্যোগে কার্যকর হয়।
তিনি যেমন ছিলেন খাঁটি বাঙালি, তেমনই খাঁটি মুসলমান। সমাজের সব শ্রেণির শিক্ষা, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য তিনি লড়েছেন। মুসলিম জাতিকে আধুনিক শিক্ষায় দীক্ষিত করে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন। ধর্মকে বিভাজনের হাতিয়ার নয়, বরং নৈতিক ও সামাজিক নির্দেশনার উৎস হিসেবে দেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি বাঙালি সংস্কৃতি, বাংলা ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। তিনি একাধারে ছিলেন মুসলিম চেতনার প্রতিভূ এবং অন্যদিকে ছিলেন বাঙালি হৃদয়ের অধিপতি। মানবিকতা ও উদারতার প্রতিমূর্তি।
ফজলুল হক ছিলেন অসামান্য লেখকও। ইংরেজি, বাংলা ও উর্দু — তিনটি ভাষাতেই তাঁর সমান দক্ষতা ছিল। তাঁর প্রবন্ধ “দি বেঙ্গল টেনেন্সি প্রবলেম” আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছিলেন, “The soil of Bengal belongs to those who till it, not to those who exploit it from a distance.” এই একটি বাক্যেই প্রকাশ পায় তাঁর সামাজিক ন্যায়বোধ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর লেখনী ছিল মানব জীবনের মুক্তি সংগ্রামের ভাষা।
শেরে বাংলা ছিলেন একজন অসাধারণ বাগ্মি। দুর্দান্ত ও ঈর্ষণীয় বক্তা। তীক্ষ্ণ মেধা ও তেজস্বিতা দিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। যুক্তিবাদ ও আবেগময় তথ্য ও তত্ত্ব উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি শ্রোতাদের মন জয় করতেন। তিনি জনগণের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে আপসহীন ছিলেন। বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি জাতিকে একতাবদ্ধ করতে সাহায্য করেছেন। তাঁর বক্তৃতার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল জন-মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে আপসহীনতা এবং স্বাধীন সাহসী চিন্তার উন্মোচন। তিনি বলতেন, “বাঙালি মুসলমানের আত্মবিশ্বাস জাগাতে হবে। অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে জাতি মরবে।”
রাজনৈতিক সভা, শিক্ষা সম্মেলন কিংবা সংসদ — সবখানেই তাঁর কণ্ঠ ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির অগ্নিশিখা। তিনি তাঁর লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে নারী শিক্ষা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে প্রাঞ্জলভাবে সকলের বোধগম্য করে তুলে ধরেছেন।
বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বিল, মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বৃত্তি ও আর্থিক সাহায্য, মুসলিম এডুকেশন ফান্ড গঠন এবং মাধ্যমিক শিক্ষা বিল — সবই তাঁরই প্রশাসনের কৃতিত্ব। বরিশালের চাখার কলেজ, আদিনা কলেজ, মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ এবং কলকাতায় লেডি ব্রাবোন কলেজ, কারমাইকেল হস্টেল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠায় তাঁর অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে।

একজন খাঁটি বাঙালি মুসলমান হিসেবে তিনি ইসলামের মানবীয় মৌলিক নীতিমালার শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। মুসলিম সমাজকে আধুনিক শিক্ষায় দক্ষ-যোগ্য ও আত্মনির্ভর করে তুলতে চেয়েছেন। খাঁটি বাঙালি হিসেবে তিনি বাঙালি সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের ধারক ছিলেন। তিনি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিকে জাতিকে এক ভাষা, এক সমাজ ও একই মর্যাদার ভিত্তিতে দেখতে চেয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, “আমার জাতি বাঙালি, ধর্ম ইসলাম — এই দুটি আমার পরিচয়।” বাঙালি আর মুসলমান — এই দুই পরিচয়ের সংমিশ্রণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃত অর্থে ‘শেরে বাংলা’। তিনি একাধারে বাঙালির গৌরব ও মুসলমানের আত্মমর্যাদার প্রতীক।
ফজলুল হক ছিলেন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী চিন্তার এক অনন্য প্রতীক। মুসলমানের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় তিনি যেমন সংগ্রাম করেছেন, তেমনই হিন্দু সমাজের দুরবস্থার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছেন। অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি কখনোই ধর্ম বা জাত-পাতের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করেননি। আজ যখন ধর্ম ও জাতীয়তাকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হচ্ছে, তখন শেরে বাংলার আদর্শ আমাদের কাছে অনেক বেশি জরুরি। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, ধর্ম ও জাতীয়তার সংঘাত নয়, বরং একতার সমন্বয়ই বাঙালির প্রকৃত শক্তি। আজ যখান ধর্মের নামে বিভাজন, ভাষা ও সংস্কৃতির নামে ঘৃণা-বিদ্বেষ আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, সমাজকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করছে, সেখানে ফজলুল হকের আদর্শ ও চেতনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও ন্যায়বোধই সত্যিকার রাজনীতি।
তাঁর অসামান্য পাণ্ডিত্য, ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও অতুলনীয় নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা ও মেধা, দেশপ্রেম এবং মানবিকতা বাংলার সীমা ছাড়িয়ে ভারতবর্ষের রাজনীতিতেও গভীর ছাপ ফেলেছিল। তিনি একইসঙ্গে ছিলেন সুবক্তা, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, লেখক, সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ। তাঁর বহুমাত্রিক কর্মজীবন আজও বাঙালি জাতির গর্বের প্রতীক। তাঁর আদর্শ, সাহস, মানবপ্রেম, ইনসাফ ও নৈতিকতা আজও বাঙালি জাতির কাছে অনুপ্রেরণা।








