বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে রজনীকান্তের গান
ডাঃ শামসুল হক
বাংলা এবং সংস্কৃত উভয় ভাষাতেই কবিতা লিখতেন তিনি। পরে সেইসব কবিতাগুচ্ছকে গানে রূপান্তরিত করে সকলের কাছে পরিবেশন করাও প্রায় অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তাঁর। আর তিনি একা নন, সেই গান আবার বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠের জাদুতে মোহময় হয়ে উঠত। একটা সময় তো তাঁর গান হয়ে উঠেছিল স্বদেশী আন্দোলনের মূল অনুপ্রেরণা। তিনি এই বাংলার প্রথিতযশা কবি রজনীকান্ত সেন। ১৮৬৫ সালের ২৬ জুলাই তাঁর জন্ম পাবনা জেলার ভঙাবাড়ির সেন পরিবারে। তাঁর বাবা গুরুপ্রসাদ সেনও কবি ছিলেন। কাব্যের প্রতি প্রবল অনুরাগ ছিল তাঁর মায়েরও। তাই বাবা-মায়ের নিখাদ অনুপ্রেরণাই তাঁকে তাঁর ঈপ্সিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। তাঁর অত্যন্ত কাছেরই এক শিল্পী বন্ধু তারকেশ্বর চক্রবর্তীও এ বিষয়ে তাঁকে প্রচুর সাহায্য করেছিলেন।
গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক পর্বের লেখাপড়া শেষ করার পর তাঁকে ভর্তি করা হয় বোয়ালিয়া জেলা স্কুলে। সেখান থেকে আবার জেনকিন্স স্কুলে। সেই স্কুল থেকেই ১৮৮৩ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। ১৮৮৫ সালে বাংলাদেশের রাজশাহী কলেজ থেকে এফ.এ পাশ করেন। তারপর কলকাতা এসে ভর্তি হন সিটি কলেজে। এখান থেকেই স্নাতক হন ১৮৮৯ সালে। তাঁর পড়াশোনা পর্ব এখানেই কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। তারপর আইন কলেজেও ভর্তি হন এবং একসময় আইনের ডিগ্রি নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন রজনীকান্ত সেন।
রাজশাহী কোর্টে আইনজীবী হিসেবে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। অল্পদিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠালাভও করেন। কিন্তু যখন তাঁর নিজ পেশার প্রতি সময় দেওয়ার কথা, ঠিক তখনই তিনি পেশাগত দিকের প্রতি অনীহা দেখাতে শুরু করেন। সেইসময় চঞ্চল মন তাঁর ছুটে চলত তাঁরই সাজানো গোছানো কাব্য সংসারের দিকে। ফলে ঘটনা যা ঘটার ঘটেও ছিল তাই। আইন ব্যবসার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং একসময় সেই পেশা থেকে সরে আসতে একটুও দ্বিধা করেননি।
তবে সেইসময় কবি রজনীকান্ত সেন এমনই একটা কাজের কাজ করেছিলেন, যা মানুষ মনে রেখেছেন আজও। সাহিত্য সেবার পাশাপাশি গ্রামের নিরক্ষর এবং অসহায় মহিলাদের নিয়ে বিশেষ চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন তিনি। শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়েপড়া মেয়েদের সুশিক্ষার জন্য চালিয়ে গিয়েছিলেন আপসহীন সংগ্রাম। মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে সমাজ ও সংসারের জন্য কিছু একটা করুক, সেই ইচ্ছেটাও তখন ভীষণভাবে পেয়ে বসেছিল তাঁকে। তাই সেই সময় অসহায় মেয়েদের জন্য পথে নামতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি।
ইতিমধ্যে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের মূল স্রোতে দেশ উত্তাল হয়ে উঠলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন রজনীকান্ত সেন। ৭ আগস্ট ১৯০৫ কলকাতার টাউন হলে সেই বিষয়ের উপর ভিত্তি করে তাঁরই উদ্যোগে এক জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল। বিদেশি পণ্য বর্জন এবং সেই সঙ্গে স্বদেশে প্রস্তুত জিনিসপত্র গ্রহণের জন্য সকলকে আবেদন জানানো হয়। একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন সফলতা দেখা না গেলেও আস্তে আস্তে মিলেছিল ভালো ফলাফল। কিন্তু তবুও সেই প্রয়াসকে একশো শতাংশ সফল করার জন্য কলম ধরেছিলেন তিনি। লিখেছিলেন –
”মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় / মাথায় তুলে নে রে ভাই, / দীন দুখীনি মা যে তোদের /
তার বেশি আর সাধ্য নাই”।
এই কালজয়ী কবিতাকেই দেওয়া হয়েছিল গানের রূপ। পথে প্রান্তরে গাওয়া হয়েছিল সেই গান। অল্প দিনের মধ্যেই চতুর্দিকে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তারপরই স্বদেশী দ্রব্য সামগ্রীর প্রতি মানুষের আকর্ষণও বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ। সেই গান এবং কবিতার দৌলতে তখন কবি রজনীকান্ত সেনও পল্লিকবি থেকে রূপান্তরিত হয়েছিলেন জাতীয় কবি হিসেবে। একটা সময় তিনি আবার হয়ে উঠেছিলেন কান্ত কবিও।
১৯০৯ সালে কবি আক্রান্ত হন কণ্ঠনালীর প্রদাহ জনিত রোগে। সেই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। চলে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষাও। অবশেষে জানা যায় তিনি ল্যারিঙ্কস ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। ১৯১০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর ট্রাকিওটোমি অপারেশন করা হয়। তখন কবি সাময়িক আরোগ্য লাভ করলেও হারিয়ে যায় তাঁর বাকশক্তি। আর এইভাবে চলতে চলতে ওই বছরেরই ১৩ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে বিদায় নেন কিংবদন্তি কবি রজনীকান্ত সেন।








