পাহাড় রক্ষা মানে ভবিষ্যৎ রক্ষা
সামিমা খাতুন
পাহাড়ের গায়ে আঁকিবুঁকি কেটে আছে সবুজের সমারোহ। আর সেই সবুজের বুক চিরে নেমে এসেছে অবিরাম পাহাড়ের সৌন্দর্য। এই পাহাড়ের বুকে আমার হারিয়ে যেতে নেই কোনো মানা। মহান প্রভুর সৃষ্টি পাহাড়, আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে অনুপম মনোরম সৌন্দর্য। প্রকৃতিকে আরো বেশি অপরূপ করে তোলে পাহাড়ের সৌন্দর্য, কোথাও যেন মিশে যেতে ইচ্ছে করে। পাহাড় মানেই শান্তি, প্রকৃতি আর সৌন্দর্যের মিলনক্ষেত্র। উঁচু-নিচু টিলা, সবুজে ঘেরা বন-জঙ্গল, পাখির ডাক আর পাহাড়ি ঝর্নার কলকল শব্দ – সব মিলিয়ে পাহাড়ের বুকজুড়ে যেন প্রকৃতি নিজেই আপন সৃষ্টির রঙে রাঙিয়ে তুলেছে। তাই ভ্রমণ-পিপাসু মন বলে:
“বদ্ধ ঘরে বার বার না মরে / একবার পাহাড় থেকে ঘুরে যেও।”
কিন্তু আজকের দিনে সেই রঙ যেন ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। মানুষ নিজের স্বার্থে, ভোগের আশায় পাহাড়কে ধ্বংস করছে অজান্তেই, বা হয়ত জেনে-বুঝেই। পাহাড় আসলে প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি। এটি শুধু সৌন্দর্যের আধার নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এক অপরিহার্য উপাদান। পর্বতগুলো ভূমির ওপরে ও ভূমির গভীরে বিস্তৃত হয়ে পেরেকের মতো ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন প্লেটকে দৃঢ়ভাবে আটকে ধরে রাখে। পর্বতগুলো দৃঢ়ভাবে ধরে রাখার বৈশিষ্ট্যই ভূপৃষ্ঠের ওপরের স্তরের ভূকম্পন প্রতিরোধ করে অনেকাংশেই। সুতরাং বলা যায়, পর্বতমালা হচ্ছে পৃথিবীর জন্য বিশাল এক রক্ষাকবচ। অথচ ওই রক্ষাকবচকেই মানুষ নানাভাবে তছরুপ করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়গুলোর রক্ষণাবেক্ষণ না করে বরং পাহাড় কেটে সমতল বানাচ্ছে। পাহাড়ের জীব-বৈচিত্র্য ধ্বংস করছে মানুষ। বিভিন্নভাবে মানুষ পাহাড়ের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। পাহাড় থেকে নদীর উৎপত্তি, পাহাড়ের গাছপালা থেকে অক্সিজেন, আবার পাহাড় অনেক জীব-জন্তু ও পশু-পাখির আশ্রয়স্থল। পাহাড়ের সবুজে ঘেরা প্রকৃতি পছন্দ করেন না – এমন মানুষ খুব রেয়ার। আমাদের এই দূরপাল্লার শহরের ভারি জীবন থেকে কিছুটা স্বস্থি আনতে অবসর পেলে আমরা বেড়িয়ে পড়ি পাহাড়-বিলাসে। আর পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যেন এক অন্যরকম ভাললাগা কাজ করে আমাদের প্রত্যকের। কিন্তু মানুষ যখন সেখানে গিয়ে পাথর কাটে, মাটি খোঁড়ে, গাছ কেটে ফেলে, তখন সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

পাহাড়ি এলাকায় ক্রমে বেড়ে চলেছে ‘ট্যুরিস্ট স্পট’ তৈরি করার ধুম। মানুষ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসে ঠিকই, কিন্তু সেই সৌন্দর্যকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব তারা নেয় না। বরং, পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো, বিলাসবহুল বাড়ি বা আবাসন নির্মাণ, বাজার ও হোটেল গড়ে তোলা – সব কিছুতেই প্রকৃতি হারাচ্ছে তার অস্মিতা ও নিজস্বতা। পাহাড়ের বুক চিরে গড়ে উঠছে কংক্রিটের জঙ্গল। ফলে ধীরে ধীরে সেই পাহাড় দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গাছগাছালি কেটে ফেলা হচ্ছে নির্বিচারে। বনভূমি দ্রুত কমে যাচ্ছে। ফলে প্রাণীজগৎ হারাচ্ছে তাদের আশ্রয়। যার কারণে প্রাণীরা লোকালয়ে প্রবেশ করছে। গাছ না থাকায় মাটির ওপরের স্তর ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষার মরশুমে দেখা দিচ্ছে পাহাড়ে ধস। পাহাড় ভাঙছে, রাস্তায় তৈরি হচ্ছে ফাটল, নদীগুলি কাদা ও পাথরে ভরে যাচ্ছে। এটি শুধু প্রকৃতির ক্ষতি নয়, মানুষের জীবনেও নিয়ে আসছে ভয়াবহ বিপদ।
দার্জিলিং, সিকিম বা মেঘালয়ের মতো পাহাড়ি অঞ্চল এক সময় ছিল সবুজে ঘেরা মনমুগ্ধকর স্বর্গরাজ্য। কিন্তু আজ সেখানে দেখা যায় পাহাড়ের গায়ে দালান-কোটা, গাড়ির ধোঁয়া, প্লাস্টিকের স্তূপ আর দেদার শব্দ দূষণ। মানুষের অসচেতনতা প্রকৃতিকে যেন নিঃশব্দে হত্যা করছে।
প্রকৃতি কিন্তু প্রতিশোধ নেয় নিজের মতো করে। পাহাড় কেটে বসতি গড়ার ফলেই আমরা দেখছি বারবার ভূমিধসের ঘটনা, হঠাৎ বৃষ্টিপাত, রাস্তা ভেঙে যাওয়া কিংবা পাহাড়ি ঝর্নার বন্যা। অতি বর্ষণে পাহাড়ে ধস নেমে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। পাহাড়ে ধস নামে মূলত বর্ষাকালে। এর নেপথ্য কারণ প্রকৃতির সঙ্গে অবহেলা। প্রকৃতি তার ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে যখন মানুষকে আঘাত করে, তখন আমরা তাকে ‘দুর্যোগ’ বলি। কিন্তু আসলে এটি আমাদেরই তৈরি ম্যানমেড বিপর্যয়।

এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় হল- দেশের সব ন্যাড়া পাহাড়কে সবুজে মুড়ে দেওয়া। পাহাড়ের জন্য পরিবেশ-বান্ধব বনায়ন গড়ে পাহাড়গুলোকে পুনরায় সতেজ করে তোলা। এর সঙ্গে অবশ্যই পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। উন্নয়নমূলক কাজের জন্য পাহাড় কাটতে হলে অর্থাৎ রাস্তাঘাট নির্মাণ করতে হলে, অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে তা করতে হবে। পাশাপাশি ঝিরি-ঝরনাগুলোর গতিপথও ঠিক রাখতে হবে, তবেই পাহাড়-ধস রোধ করা সম্ভব। নচেৎ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাকারী পাহাড় নামক এই পেরেকগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে অচিরেই। আর তাতে পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে যাবে। এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই হতে পারে বড় পরিবর্তনের সূচনা। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরো বেশি সচেতন হবে, তার জন্য বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও পরিবেশ সচেতনতার পাঠ দিতে হবে শিশুদের। যাতে আগামী প্রজন্ম জানতে পারে যে, প্রকৃতি ধ্বংস মানে নিজেদেরই ধ্বংস ডেকে আনা। গণমাধ্যম, সমাজ মাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ – সবাই মিলে যদি এই বার্তা ছড়িয়ে দেয় যে, পাহাড় আমাদের মূল্যবান সম্পদ। তবে একদিন আমরা আবার দেখতে পাব সবুজের দ্বীপের দেশ, সেই নির্মল বাতাস, সেই পাখির কূজন।পাহাড় আমাদের শেখায় শান্ত থাকতে এবং দৃঢ় হতে। অথচ আমরা নিজেদের উন্নয়নের নামে সেই শান্তিকে নষ্ট করছি। উন্নয়ন দরকার, কিন্তু সেটি যেন প্রকৃতিকে ধ্বংস না করে; বরং তার সঙ্গে সহাবস্থানে থাকে। সব মিলিয়ে বলতে হয়, পাহাড়-পর্বত আমাদের জন্য মহান প্রভুর দেওয়া বিশেষ প্রাকৃতিক আশীর্বাদ, যা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব সবার ওপরেই কমবেশি বর্তায়।
কারণ, পাহাড় শুধু প্রকৃতিরই নয়, মানুষের আত্মার শান্তির প্রতীক। এখনই আমরা সচেতন না হলে অনতি বিলম্বে প্রকৃতি তার সব সহনশক্তি হারাবে। তখন আমরা শুধু হারানো পাহাড়ের গল্পই শুনব, কিন্তু দেখতে পাব না আর কোনো সবুজের ছোঁয়া।
পাহাড়ি এলাকায় ক্রমে বেড়ে চলেছে ‘ট্যুরিস্ট স্পট’ তৈরি করার ধুম। মানুষ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসে ঠিকই, কিন্তু সেই সৌন্দর্যকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব তারা নেয় না। বরং, পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো, বিলাসবহুল বাড়ি বা আবাসন নির্মাণ, বাজার ও হোটেল গড়ে তোলা – সব কিছুতেই প্রকৃতি হারাচ্ছে তার অস্মিতা ও নিজস্বতা। পাহাড়ের বুক চিরে গড়ে উঠছে কংক্রিটের জঙ্গল। ফলে ধীরে ধীরে সেই পাহাড় দুর্বল হয়ে পড়ছে।








