নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র ও চৌবেড়িয়া
এম.এ নাসের
উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমার গোপালনগর থানার চৌবেড়িয়া মৌজা। বনগাঁ মহকুমার গোপালনগর বাজার থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে উত্তর চব্বিশ পরগনা ও নদিয়া জেলা সীমান্তে দীনবন্ধু মিত্রের জন্মস্থান এই চৌবেড়িয়া গ্ৰাম। ত্রিবেণীর সন্নিকটে হুগলি নদী থেকে প্রবাহিত যমুনা এই গ্রামের চারদিকে বেষ্টন করে রেখেছে বলে গ্রামের নাম চৌবেড়িয়া।
সম্রাট আকবরের প্রধান সেনাপতি মানসিংহ বাংলায় মুঘল আধিপত্য বিস্তারে যখন আসেন, সেই সময় চৌবেড়িয়া দুর্গের রাজা কাশীনাথ রায় তাকে সাহায্য করেন। সম্রাট আকবর কাশীনাথের সাহায্যের পুরস্কার স্বরূপ তাঁকে ‘সমরসিংহ’ উপাধিতে শোভিত করেন।
দীনবন্ধু মিত্রের জন্মস্থান চৌবেড়িয়া গ্রাম। স্বীয় জন্মভূমির পরিচয় জ্ঞাপন করেছেন তিনি ‘সুরধুনী কাব্যে’র অষ্টম সর্গে। দীনবন্ধুও লিখেছেন: ”যমুনা বিমনা বড় ত্রিবেণীর তলে, স্নেহভরে ধীরে ধীরে জাহ্নবীরে বলে-বহু দূর নাহি আর সাগর ভীষণ, একা তুমি অনায়াসে করিবে গমন, যাব না তোমার সনে আমি লো ভগিনী, ছাড়িয়ে তোমায় আজ হব বিরাগিনী; তব স্বামী কাছে যেতে হলে অনুরাগী, কত কথা রটাইবে যত ভালখাগী, তাই বন নিবেদন শুন লো আমার, বামদিকে যাব আমি করিছি বিচার, দেখে যাব বিরুয়ের মদনগোপাল, হরিণঘাটায় খাব সোনামুগ দাল, পাক দিয়ে বেড়ে যাব চৌবেড়িয়া গ্রাম, বিনত দীনের যথা অতি দীনধাম”।
চৌবেড়িয়ায় দীনবন্ধু ডাকঘর, দীনবন্ধু পাঠাগার, বনগাঁ দীনবন্ধু কলেজ আজো স্মৃতি বহন করে চলেছে। উল্লেখ্য, মিত্তিরদের পৈতৃক নিবাস গোবরডাঙার অদূরে ইছাপুর গ্রাম। দীনবন্ধু মিত্রের পিতামহ জয়রাম মিত্র শ্বশুরালয়ে বসবাস করতে থাকেন। জয়রামের পুত্র কালাচাঁদ মিত্র দীনবন্ধুর পিতা। পিতামহীর স্বীয় ভিটায় দীনবন্ধুর জন্ম হয়।
দীনবন্ধু মিত্রের বাসভবনে কাঁঠালপাড়া থেকে ঘোড়ায় চেপে আসতেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কল্যাণীর কাঞ্চনপল্লী থেকে আসতেন কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত।পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ও এসেছেন। দীনবন্ধুর বাসভবনটি ধ্বংসের কিনারায় হলেও দৃশ্যমান বড় দালান, বাসঘর, রান্নাঘর, বৈঠকখানা, প্রসূতিস্থান, ফাঁকা জায়গা, বিশাল বাবলাগাছ রয়েছে কালের সাক্ষী রূপে। কিন্তু সেটা যে দীনবন্ধু মিত্রের আমলের, একথা জোর দিয়ে বলা যাবে না।
২৩ শতক জমির অভ্যন্তরে দালানটি উন্মুক্ত। বামদিকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত ব্রোঞ্জে তৈরি দীনবন্ধুর আবক্ষ মূর্তি। চৌবেড়িয়া ও তার পার্শ্ববর্তী গ্রামে নীলদর্পণ-এর অস্তিত্ব বিরাজমান। নদিয়া ও যশোহরকে বলা হত নীলপ্রদেশ। চৌবেড়িয়া থেকে ছয় মাইল অদূরে ছিল মোল্লাহাটি। নীলকর সাহেব লালমুর ছিলেন অত্যাচারী, ফলে চাষীরা সর্বদা আতঙ্কে থাকতেন। এছাড়া শ্রীমন্তপুর, পাল্লা, নহাটা, নিশ্চিন্দিপুরে ছিল নীলকুঠি। চৌবেড়িয়াতেও নীলকুঠি ছিল।

চৌবেড়িয়ার পাশের গ্রাম নিমতলায় ছিল নীলের আড়ত। ১৯৪৯ সালে তৎসময়ের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কিশোরীমোহন রায়, গোষ্ঠবিহারী চট্টোপাধ্যায়, ডা. নূর আলী, হৃদয়রতন মিত্র, শশীভূষণ সর্বাধিক আলী, মোঃ ওয়াহেদ বক্স মণ্ডল প্রমুখের প্রচেষ্টায় চৌবেড়িয়ায় ‘দীনবন্ধু বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয়। জমি দাতা পাঁচুগোপাল মুখোপাধ্যায়, রণজিৎ বিশ্বাস ও মোহাম্মদ মোবারক মণ্ডল। প্রথম প্রধান শিক্ষক ক্ষিতীশচন্দ্র মৈত্র। পর্যায়ক্রমে পঞ্চম শ্রেণি, অষ্টম শ্রেণি, মাধ্যমিক স্তর, তারপরে উচ্চমাধ্যমিকে উন্নীত হয়।
দীনবন্ধু মিত্রের বাসভবনের পূর্বদিকে কয়েকশো মিটারের মধ্যে দীনবন্ধু মিত্রের পত্নী অন্নদাসুন্দরীর নামাঙ্কিত বালিকা বিদ্যালয় রয়েছে। এটি প্রতিষ্ঠার পিছনে অবদান মূলত তিনজন ব্যক্তির। তারা হলেন রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী কান্তি বিশ্বাস, দীনবন্ধু মিত্রের বংশধর সুশীল মিত্র এবং অশ্বিনী সরকার। ২০০১ সালের ১৩ জানুয়ারি সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অন্নদাসুন্দরী মিত্র বালিকা বিদ্যালয়’। এক বিঘা জমি বিদ্যালয়ের নামে দলিল করে দেন সুশীল মিত্র।
চৌবেড়িস্থিত দীনবন্ধু মিত্রের বাসভবন ‘দীনধাম’ পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের তালিকাভুক্ত হয়েছে ২০১০ সালে। হেরিটেজ তালিকার ২১৫ নম্বরে উল্লেখ রয়েছে দীনবন্ধু মিত্রের বাসভবনটি। কমিশনের ওয়েবসাইটে জ্বলজ্বল করছে House of Dinabandhu Mitra, Rural area, Village: Chauberia, P.S.- Gopalnagar, Dist. – North 24 Parganas (26.04.2004)।
২০১৭-১৮ সালে হেরিটেজ কমিশন থেকে এই ঐতিহ্যবাহী বাসভবনটি সংস্কারের কাজ তদারকির জন্য ইঞ্জিনিয়াররা আসেন, জমির জন্য বরাদ্দ ছিল ১৬ লক্ষ টাকা। এখনও আরম্ভ হয়নি দীনবন্ধুর ‘দীনধাম’ সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজ। এই চৌবেড়িয়া গ্রামে দীনবন্ধু মিত্রের জন্ম হয় ১৮৩০ সালের ১০ এপ্রিল। পারিবারিক নাম গন্ধনারায়ণ মিত্র।
স্থানীয় পাঠশালায় পড়াশোনা শুরু হয়। ১৮৪০ সালে স্থানীয় জমিদারের সেরেস্তায় মাসিক আট টাকা বেতনে চাকরি জীবনের শুরু হয়। কলিকাতায় পিতৃব্য নীলমণি মিত্রের আশ্রয়ে ছিলেন। পাঠচর্চা ব্যয় নির্বাহের জন্য দীনবন্ধুকে গৃহভৃত্যের কাজ করতে হয়। রেভারেন্ড জেমস লং-এর অবৈতনিক স্কুলে ভর্তি হন। এহেন সময় ‘দীনবন্ধু’ নামে পরিচিত হলেন।

১৮৫০ সালে কলুটোলা ব্রাঞ্চ স্কুল থেকে বৃত্তি-সহ হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। কলেজের অধ্যয়ন অসমাপ্ত অবস্থায় ১৮৫৫ সালে ১৫০ টাকা বেতনে পাটনার পোস্ট মাস্টারের চাকরি গ্রহণ করেন, পরে পোস্টাল ইন্সপেক্টর পদে উন্নীত হন। লুসাই যুদ্ধের সময় ডাক বিভাগের কাজে দক্ষতার জন্য ‘রায়বাহাদুর’ উপাধিতে শোভিত হন।
১৮৬০ সালে বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ আলোড়নযুক্ত নাটক ‘নীলদর্পন’ তিনি সংকলন করেন। ১৮৬১ সালে মাইকেল মধুসূধন দত্ত নীলদর্পণ-এর ইংরেজি ভাষান্তর করেন “Nil Darpan or the Indigo Planting Mirror”। নীলদর্পণের প্রচারের জন্য লং সাহেব কারারুদ্ধ হন।
সাধু রঞ্জন, সংবাদ প্রভাকর প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর কবিতা মুদ্রিত হয়। ১৮৬৩ সালে ‘নবীন তপস্বিনী’ নাটক, ১৮৬৬ সালে ‘সধবার একাদশী’ ও ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’, ১৮৬৭ সালে লীলাবতী নাটক রচনা করেন। ১৮৭২ সালে ইণ্ডিয়ান রেলওয়ের ইন্সপেক্টর পদ হস্তগত হয়। ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ রঙ্গালয়ে অভিনয়ের সূত্রপাত হয়। ১৮৭২ সালে ‘জামাই বারিক’, ১৮৭৩ সালে ‘কমলে কামিনী’ তাঁর শেষ রচনা। তিনি ‘কস্যচিৎ পথিকস্য’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। দ্বাদশ কবিতা (১৮৭২), ‘নানা কবিতা’, ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ‘সুরধুনী কাব্য’ (১৮৭৬), ‘পোড়া মহেশ্বর’ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অবশেষে মহান নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের প্রয়াণ হয় ১৮৭৩ সালের ১ নভেম্বর।








