দেশপ্রেম, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মুসলিম সমাজ
জিয়াউর রহমান মজুমদার
ভারত একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র — এটি কেবল সংবিধানের প্রস্তাবনায় লেখা গুটিকয় শব্দ নয়, বরং এই দেশের রাষ্ট্রচিন্তা ও নাগরিক জীবনের ভিত্তি। এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই ভারতের প্রত্যেক নাগরিক, যে ধর্মেই বিশ্বাসী হন না কেন, সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে দেশকে নিজের বলে ভাবার সুযোগ পান। এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় মুসলিমদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা সন্দেহ প্রকাশ করা শুধু অযৌক্তিক নয়; বরং সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী।
এদেশের মুসলিমরা জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় প্রতীকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করেন — এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়। কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিধি-নিষেধের কারণে জাতীয় সঙ্গীতের কিছু নির্দিষ্ট স্তবক গাওয়া থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্তকে অনেক সময় ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। এই সিদ্ধান্ত কোনভাবেই দেশপ্রেমের অভাব নির্দেশ করে না। এটি একটি ধর্মীয় অবস্থান, যা ব্যক্তির বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত এবং যা ভারতীয় সংবিধান স্বীকৃত ও সুরক্ষিত করেছে।
সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে প্রত্যেক নাগরিককে তার ধর্ম পালন, অনুশীলন ও প্রচার ও বিশ্বাস প্রকাশের স্বাধীনতা প্রদান করেছে। এই স্বাধীনতা শর্তসাপেক্ষ নয় এবং তা কোনো নাগরিকের দেশপ্রেম যাচাইয়ের মানদণ্ড হতে পারে না। একজন নাগরিক যদি সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার ব্যবহার করেন, তবে সেটিকে রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস বা অনুগত্যহীনতা হিসেবে দেখার কোনো সাংবিধানিক বা নৈতিক ভিত্তি নেই।
এ কথা স্মরণ রাখা জরুরি যে, দেশপ্রেম কোনো একরৈখিক ধারণা নয়। দেশপ্রেম কেবল গান গাওয়া, স্লোগান দেওয়া বা আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন কৃষক যখন নিষ্ঠার সঙ্গে চাষাবাদ করেন, একজন শিক্ষক যখন সৎভাবে ছাত্র পড়ান, একজন বিচারক যখন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেন, কিংবা একজন সৈনিক যখন সীমান্তে দাঁড়িয়ে দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করেন — তাঁদের প্রত্যেকের কাজই দেশপ্রেমের বাস্তব প্রকাশ। এই দেশপ্রেমের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের কোনো দ্বন্দ্ব থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মুসলিম সমাজের অবদান গভীর ও গৌরবোজ্জ্বল। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ দেশের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। খান আবদুল গফফার খান অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামকে শক্তিশালী করেছেন। আশফাকউল্লা খান নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন দেশের মুক্তির জন্য। এই ইতিহাস অস্বীকার করার সুযোগ নেই, এবং এই ইতিহাসই প্রমাণ করে ভারতীয় মুসলিমদের দেশপ্রেম প্রশ্নাতীত।
স্বাধীনত্তোর ভারতেও মুসলিমরা রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভে সমানভাবে যুক্ত রয়েছেন — সেনাবাহিনী, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প ও শ্রমক্ষেত্রে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁরা কর দেন, আইন মানেন, ভোট দেন, রাষ্ট্র গঠনে অংশ নেন। একজন নাগরিক হিসেবে এর বেশি দেশপ্রেমের প্রমাণ আর কী হতে পারে?
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের মূল শক্তি হল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থান। কোনো বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিশ্বাসকে সন্দেহের চোখে দেখা বা তাকে দেশপ্রেমের পাল্লায় মাপার প্রবণতা সমাজকে বিভক্ত করে, রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। ভারতের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশে এই মানসিকতা বিপজ্জনক। এখানে সংবিধানই শেষ কথা — কোনো আবেগ, চাপ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মত নয়।
ভারতীয় মুসলিমরা এদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন, রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন এবং আজও সেই স্বাধীনতা রক্ষা ও সংবিধানসম্মত ভারত গড়ার জন্য সমানভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। তাঁদের দেশপ্রেম নীরব হতে পারে, সংযত হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই কম নয়।
দেশপ্রেম কোনো একরঙা পোশাক নয়, যা সবাইকে একইভাবে পরতে হবে। দেশপ্রেম হল সেই মূল্যবোধ, যেখানে ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন আচরণ ও ভিন্ন সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও আমরা সবাই একই সংবিধানের অধীনে, একই তিরঙ্গার নিচে, সমান মর্যাদায় দাঁড়াতে পারি। এই সহাবস্থানই ভারতের প্রকৃত শক্তি; আর এটাই ভারতীয় মুসলিম সমাজের অবস্থানের মূল কথা।
(লেখক: বিশিষ্ট আইনজীবী ও সচেতন নাগরিক, পূর্ব বর্ধমান)








