কুড়িয়ে পাওয়া ডায়েরি
আবু রাইহান
কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। বাড়ি থেকে প্রায় বিশ কিমি দূরে বুরহানপুর কলেজ। প্রতিদিনের মত শুভ একদিন বাসে চেপে কলেজ যাচ্ছে। হ্যাঁ, তাকে প্রায় প্রতিদিনই কলেজ যেতে হত, লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়ার জন্য। ইংলিশ অনার্স এর প্রয়োজনীয় বই কেনার এবং টিউশন পড়ার সামর্থ্য ছিলনা শুভ রহমানের। দুই গণ্ডা ভাইবোন নিয়ে এক অতি সাধারণ কৃষক পরিবারে তার জন্ম।
বাস থেকে নামার সময় শুভ একটি বাদামি রঙের লেদার কভার ডায়েরি পড়ে থাকতে দেখে। আশপাশের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেও সে ডায়েরির মালিককে খুঁজে পেলনা। ডায়েরির উপরে কিম্বা প্রথম পৃষ্ঠায় কারো নাম বা টেলিফোন নাম্বারও দেখতে পায়না। ইচ্ছে করেই ভেতরের পৃষ্ঠাগুলো সে দেখেনি। কয়েকদিন সেই ‘তারামা’ বাসে নিয়মিত খোঁজ নিত ডায়েরির মালিক বাসে ডায়েরি খুঁজতে এসেছে কিনা। সে চেষ্টা বৃথা যায়।
মাস দুয়েক পর শুভর ইচ্ছে হয় সে ডায়েরির ভেতরে কী লেখা আছে দেখবে। প্রথমে যে পাতায় লেখা আছে সেখানে তারিখ ছিল ০১.১১.১৯৯৮ লেখা আছে ” জীবনের যত কষ্ট, ব্যথা বেদনা, পাওয়া না পাওয়া, সুখ দুঃখ সব কিছুতেই যাঁকে আমি কাছে পাই, আমার জীবনের সব থেকে কাছের বন্ধু তাঁর কথা দিয়েই আমার ডায়েরি লেখার জার্নি শুরু। তিনি অন্য কেউ নন, আমার বাবা। এই তো কয়েক মাস আগে আমার প্রথম পিরিয়ড হওয়ার পর আমার অস্বস্তি ও ব্যথার কথা বাবাকেই প্রথম জানাই। উনি খুব যত্ন করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এটা স্বাভাবিক। প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে মায়ের হাতে দিয়ে আমার অতিরিক্ত যত্ন নিতে বলেছিলেন। আমার সব আনন্দ ও দুঃখের সঙ্গী হিসেবে আমি বাবাকেই কাছে পেতে চাই। আই লাভ ইউ, বাবা।”
বাবা মেয়ের সম্পর্ক যে এত গভীর হতে পারে শুভর জানা ছিলনা। কৌতূহল বশত শুভ পরের পৃষ্ঠা দেখে। একটি রবীন্দ্র সঙ্গীত ‘ওরে গৃহবাসী ….’ । শুভ রবীন্দ্র সঙ্গীত পছন্দ করে। সে নিজে নিজেই গাইতে শুরু করে। তেমনভাবে তার গান শেখা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু স্কুলে অনেক অনুষ্ঠানে সে রবীন্দ্র সংগীত ও আধুনিক বাংলা গান গেয়েছে। কলেজের ক্লাসের মাঝে ফাঁকা সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে গানের আড্ডায় কয়েকদিন গেয়েছে। সবাই তার গান ভালবাসে।
ডায়েরির পরের পাতায় একটি গ্রাম্য মেলার বর্ণনা ছিল। “মুকুন্দপুর ঘাটে শারদীয়ার মেলা। শরতের পরিষ্কার নীল আকাশ, সাদা সাদা মেঘের টুকরো আর নদীর পাড়ে শুভ্র কাশফুল। ভৈরব নদীর উভয় তীরে অনেক মানুষের গিজগিজে ভিড়, একটু উপরের দিকে অসংখ্য খাবার ও খেলনার স্টল। নদীর স্বল্প জলে কিছু মানুষ নৌকোবিহার করে এবং বিভিন্ন ধরনের নাচের মধ্য দিয়ে আনন্দ করতে থাকে। দু’পাড়ের মানুষ সেসব দেখে আনন্দ উল্লাসে মেতে থাকে। নন্দ জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও সে মেলায় লোক আসে। আমার পাড়ার ও ক্লাসের বান্ধবীদের সঙ্গে আমিও প্রতিবছর যাই, আমরা অনেক মজা করি।
এ বছর মেলায় ঘুরতে গিয়ে আমার ডান পায়ে মোচড় লাগে। বান্ধবীদের সঙ্গে গিয়েছিলাম। একটা ছোট গর্তে আমার পা ঢুকে আটকে গেছিল। আমার মাধ্যমিকের টেষ্ট পরীক্ষার আগে এরকম দূর্ঘটনা কাম্য ছিলনা। বাবা আমার উপর অসন্তুষ্ট হয় আমি অসাবধান বলে। কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু বিছানায় শুয়ে পড়াশোনা করেছি। একমাস টিউশন যেতে পারিনি। আজকে পরীক্ষা শেষ করে লিখতে বসেছি। পরীক্ষা ভালো হয়েছে।”
কোনো ক্লু না পাওয়ায় শুভ ডায়েরির পাতা উল্টাতে থাকে। কয়েকটা উল্টানোর পর দেখে শেষ লেখা পাতা। তারিখ ২৭.৮.২০২৩ অর্থাৎ যেদিন সে বাসে ডায়েরিটা খুঁজে পায়।
“আজ আমি সাবালিকা, আঠেরো বছর পূর্ণ করলাম। বাবা থাকলে সব থেকে বেশি খুশি হতেন। বাবা নেই বলে এবছর সেলিব্রেইশনও নেই। যেখানেই থাকো, ভালো থেকো বাবা।”
শুভর মনে কোথাও একটু সমবেদনা জন্ম নেয়।
আগের পাতা দেখল। ০৫.০৮.২০২৩ তারিখ।
“আজ আমার কলেজে প্রথম পদার্পণ। বুরহানপুর কলেজ। ইংলিশ অনার্স। আমি যেন গ্র্যাজুয়েশন করে বাবার নাম উজ্জ্বল করতে পারি, তাঁকে উৎসর্গ করতে পারি। কলেজে ভর্তি হয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম কেউ পরিচিত নেই। স্কুলের মত চেনা পরিসর নেই। অনেকটা একাকী বোধ করি। মনে হচ্ছে স্কুলের মত আকর্ষণ এখানে নেই। আমি প্রতিদিন এতদূর এই নিষ্প্রাণ টাউনে একাকী কলেজে আসতে পারবনা।”
শুভ খুব খুশি হয়, এবার সে হয়ত ডায়েরির মালিককে খুঁজে পাবে। তারই ডিপার্টমেন্ট। সে পরদিন কলেজে গিয়ে বন্ধুদের বিষয়টি জানায়। সেই মত তার বন্ধু অম্লান ঘোষণাও দেয়। কিন্তু কেউ কোনো উত্তর দেয় না, ডায়েরির মালিকানা দাবি করে না। ডিপার্টমেন্টের 60 জন স্টুডেন্ট এর মধ্যে প্রায় 50 জনই সেদিন উপস্থিত ছিল।
বাড়ি ফিরে আবারও সে আর কোনো ক্লু খুঁজে পায় কিনা দেখে। একটা পাতায় দেখে খুব সুন্দর করে হার্ট এর আকৃতিতে একটি বাংলা গান লেখা ” তুমি আমার আশা, আমি তোমার ভালবাসা …..”
গানটি শুভর একটি পছন্দের গান। বেশ কয়েকটা মঞ্চে সে গেয়েছে। সে একা একা সেই রাতে গানটি গায় আর একটা আলাদা অনুভূতি হয় তার।
পরের সোমবার কলেজে রিসেস এ কয়েক জন মেয়ে বন্ধু শুভকে কিশোর কুমার এর গাওয়া কোনো গান গাইতে বলে। তারা আদর করে তাকে কিশোর কুমার বলেও ডাকত। শুভ ডায়েরিটা খুলে গাইতে শুরু করে ” তুমি আমার আশা ……” দু’একজন বন্ধু প্রতিদিনের মত বেঞ্চ বাজায়। হঠাৎ সে লক্ষ্য করে পিছনের দিকের বেঞ্চ থেকে একটি মেয়ে এগিয়ে আসে।
‘ডায়েরিটা দেখি, এটা তো আমার।’
সবাই একটু হেসেই বলল ‘তোর তো নিয়ে নে, আমরা এর মালিককে হন্যে হয়ে খুঁজছি।’ শুভ নিশ্চিন্ত হয় ডায়েরির মালিকের হাতে সেটি তুলে দিতে পেরে।
কলেজ ছুটি হওয়ার পর দেখে মেয়েটি তার পিছন পিছন হেঁটে আসছে। সে জিজ্ঞেস করল ‘রিকশায় যাবেনা?’
ও বলল ‘না, আজ তোমার সঙ্গে হেঁটে বাস স্ট্যান্ড যাবো। আমার নাম সারা। গত বছর ঈদের পর আমাদের পাশের পাড়ার অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। তোমার গান শুনেছি। ——-তুমি আছো এত কাছে তাই — এই গানটা খুব ভালো লেগেছিল। ওখানে কে আছে তোমার?’
-‘এক বন্ধুর বাড়ি।’
-তারপর আচমকা জিজ্ঞেস করে ——
-‘কাউকে ভালবাসো?’
-‘হ্যাঁ, মা বাবা, ভাইবোন।’
এরপর যেটা জিজ্ঞেস করে শুনে শুভ থ হয়ে যায়।
-‘না, মানে প্রেম করো কারো সাথে?’
-‘না।’
-‘আমাকে তোমার পছন্দ?’
তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর না পেয়ে সে বলল
-‘কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কয়েকদিন ভেবে উত্তর দিও। ওই যে আমার বাড়ি ফেরার বাস। বাই, আজকে আসি তাহলে। ভালো থেকো।’
শুভ নিয়মিত কলেজ যায়। লাইব্রেরীতে যায়। কিন্ত সারা কলেজে আসে না। শুভ তাকে তার উত্তর দিতে পারে না। কিছুদিন পর কলেজের সোশ্যাল ফাংশন। কলেজে মুম্বাই থেকে শিল্পী আসবে গান গাইতে। শুভ বন্ধুদের সঙ্গে অনুষ্ঠান দেখছে। হঠাৎ পিছন থেকে তাকে কেউ যেন ডাকে। হালকা বাদামি রঙের শাড়ি পরে গৌরবর্ণ সারাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। তার লম্বা সোজা কালো চুল ও কপালের ছোট্ট একটা কালো টিপ, বড় কাঁচের স্বচ্ছ চশমার ভিতর থেকে গভীর চোখের মিষ্টি, মায়াবী চাহনি শুভর হৃদয়ে সাময়িক যে ঝড় তুলেছিল তাকে সামলানো খুব সহজ ছিলনা।
সারা তাকে জিজ্ঞেস করে- ‘তুমি গাইবে না?’
-‘না, ওই তো বোম্বে থেকে শিল্পী এসেছে।’
সারা মনে মনে হয়ত ভাবে—- ‘তুমি গাইবে বলেই তো এত সেজে এসেছি’।
– ‘গাইবে না কেন?’
-‘কলেজের পলিটিক্স।’
-‘ছাড়ো, চলো ঐ করিডোর এর দিকে যাই।’
-‘কেন? আর কে যাবে?’
-‘কেউ না, তুমি আর আমি। লজ্জা পাও, মিস্টার লজ্জাবতী?’
-‘ঠিক আছে, চলো।’
-‘আমাকে কেমন লাগছে?’
-‘ভালো, বেশ সুন্দর।’
-‘আমি কি তাহলে আমার প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ ধরে নিতে পারি?’
-‘সরি, আমি ওটা করতে পারব না এখন।’
-‘কেন, তোমার কী সমস্যা?’
-‘তেমন কিছু না, আবার অনেক বড়। রেসপনসিবিলিটি।’
ছল ছল চোখে সারা শুভর দিকে তাকিয়ে বলল- ‘তোমার সিন্ধান্ত কোনোদিন পরিবর্তন হলে আমাকে জানিও, কোনদিন রেসপনসিবিলিটি ছেড়ে যেও না আর অনেক অনেক ভালো থেকো।’
তারপর আর কোনোদিন সারাকে কলেজে সে দেখেনি। প্রথম দুবছর পড়ার পর সে ‘প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ’ নিতে যায়। পরে ক্যাজুয়াল হয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে কিন্তু আর কখনও সারাকে দেখতে পায়নি।








