বাংলা ভাষায় আরবি শব্দের সংমিশ্রণ: ইতিহাস ও গুরুত্ব
জামাল উদ্দিন তরফদার
বাংলা একটি সমৃদ্ধ ও জীবন্ত ভাষা। এর গঠনে নানা ভাষার অবদান রয়েছে। সংস্কৃত, পালি ও প্রাকৃত যেমন এর আদি শিকড়ে গভীরভাবে প্রোথিত, তেমনি ফার্সি, আরবি, তুর্কি ও ইংরেজি থেকেও বিপুল সংখ্যক শব্দ বাংলায় প্রবেশ করেছে। এই বহুভাষিক সংমিশ্রণ বাংলাকে করেছে বহুমাত্রিক ও বিশ্বজনীন। এর মধ্যে আরবি শব্দের প্রভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, এটি শুধু শব্দ ধার নয়, বরং ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজ জীবনের গভীর সংযোগের প্রতিফলন।
বাংলায় আরবি শব্দ আগমনের ইতিহাস বহুমুখী। অষ্টম শতাব্দী থেকেই আরব বণিকেরা বাংলার সমুদ্র বন্দরগুলোতে আসতে শুরু করেন। বাণিজ্যের পাশাপাশি তাঁরা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটান, ফলে অনেক আরবি শব্দ বাংলায় প্রবেশ করে। এরপর সুফি সাধকরা ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলার গ্রামাঞ্চলে মসজিদ ও খানকাহ গড়ে তোলেন। তাঁদের ধর্মীয় জীবনযাপন ও প্রচার কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ অসংখ্য আরবি শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কি ও আফগান মুসলিম শাসকদের আগমনে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁদের প্রশাসনিক ভাষা ছিল ফার্সি, কিন্তু ফার্সির ভেতর দিয়ে বহু আরবি শব্দ বাংলায় প্রবেশ করে। যেমন আদালত, কাজি, হুকুম, দাওয়াত ইত্যাদি। পাশাপাশি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য, বিশেষত মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের রচনায় আরবি শব্দের প্রাচুর্য লক্ষ্য করা যায়। ধর্মীয় কাহিনি, মঙ্গলকাব্য, পুঁথি সাহিত্য এবং সুফি কাব্যে এই প্রভাব গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলায় আরবি শব্দগুলো মূলত কয়েকটি ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। ধর্মীয় জীবনে যেমন আল্লাহ, ইমান, আযান, সালাহ, সিয়াম, হালাল, হারাম, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি শব্দ বহুল প্রচলিত; সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে ব্যবহৃত হয়েছে দাওয়াত, সালাম, বারাকাহ, আমানত, ফয়সালা প্রভৃতি শব্দ। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রচলিত হয়েছে আদালত, কাজি, হুকুম, আমিন, মেহের, ফরমান প্রভৃতি শব্দ। আর সাহিত্য ও শিক্ষাজীবনে কিতাব, হিকমত, ইলম, দাওয়াহ, কোরআন, হাদিস ইত্যাদি শব্দ বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। তবে এসব শব্দের ধ্বনি ও উচ্চারণে বাংলার নিজস্ব ধাঁচ এসেছে। যেমন ‘সালাত’ শব্দটি বাংলায় প্রচলিত হয়েছে ফার্সি প্রভাবিত রূপে ‘নামায’, আর ‘সিয়াম’ শব্দটি প্রচলিত হয়েছে ‘রোযা’ হিসেবে।
মধ্যযুগীয় কাব্যে আরবি শব্দের প্রভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ-জুলেখা, সৈয়দ সুলতানের নবী-বংশ, দৌলত উজির বাহরাম খাঁর লাইলি-মজনু প্রভৃতি কাব্যে আরবি শব্দের বিপুল ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। পুঁথি সাহিত্যেও গ্রামীণ পাঠকদের জন্য রচিত ইসলামী কাহিনিতে আরবি শব্দ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। বাউল ও লালনগীতিতেও আরবি শব্দের উপস্থিতি প্রকট। লালন ফকির-সহ সুফি-প্রভাবিত গানে ‘আল্লাহ’, ‘ফকির’, ‘আমানত’ ইত্যাদি শব্দ বারবার ব্যবহৃত হয়েছে।
আজকের আধুনিক বাংলা বাক্য এবং ভাষাতেও আরবি শব্দ সমানভাবে জীবন্ত। ধর্মীয় জীবন তো বটেই, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, কথ্যভাষা, এমনকি রাজনৈতিক ভাষণেও আরবি শব্দ বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘ইনশাআল্লাহ’, ‘মাশাআল্লাহ’, ‘আমীন’ ইত্যাদি শব্দ আজ মানুষের মুখে মুখে বহুল প্রচলিত।
বাংলা ভাষায় আরবি শব্দের সংমিশ্রণ কেবল ভাষাগত পরিবর্তন নয়, এটি সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ইতিহাস। আরবি শব্দের মাধ্যমে বাংলার মানুষ ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয় এবং বহুজাতিক বা মিশ্র সমাজের এক নতুন রূপ গড়ে ওঠে। ফলে বাংলা একদিকে স্থানীয় শিকড়ে দৃঢ় থেকেছে, অন্যদিকে বিশ্বজনীন ভাষার বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলা ভাষায় আরবি শব্দের সংমিশ্রণ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি আমাদের ভাষাকে করেছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। ধর্ম, সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে আরবি শব্দের অবদান আজও অম্লান। তাই বাংলা ভাষার বিকাশের ধারাবাহিকতা উপলব্ধির জন্য আরবির প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না। বরং বলা যায়, আরবি শব্দের সংমিশ্রণ বাংলা ভাষা ও তার শব্দভাণ্ডারকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি, এটি আমাদের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রমাণ বহন করে।
(লেখক গবেষক, আরবি বিভাগ, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়)।








