ইকবালের দৃষ্টিতে ইনসানে কামিল
মফিজুল তরফদার
নতুন পয়গাম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫:
মানুষকে আমরা কতই না ছোট করে দেখি! কোথাও তাকে ভাগ্যের দাস বলা হয়, কোথাও প্রকৃতির হাতের খেলনা, কোথাও সমাজের রীতিনীতিতে বন্দী, কোথাও আবার কেবল ভোগ আর যন্ত্রের মাঝে বন্দী দেহমাত্র। এই সংকীর্ণ ধারণার বিরুদ্ধে মুহাম্মদ ইকবাল উচ্চারণ করেছিলেন এক অগ্নিঝরা সত্য — মানুষ ক্ষুদ্র নয়, মানুষ দুর্বল নয়, মানুষ আসলে মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়ানো এক অনিঃশেষ শক্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের ভেতরে এমন এক অগ্নিশিখা আছে, যা জ্বলে উঠলে সে শুধু নিজের ভাগ্য নয়, ইতিহাসের গতিপথকেও পাল্টে দিতে পারে। তাঁর কাছে এই অন্তর্লীন শক্তির নাম ‘খুদি’। এই খুদি কোনও সাধারণ অহংকার নয়; বরং গভীর আত্মসচেতনতা, আল্লাহর নূরের প্রতিফলন। খুদি জাগ্রত হলে মানুষ আত্মবিস্মৃত দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়, সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠে, নৈতিকতার শক্তিতে দৃঢ় হয়, স্বাধীন হয়, আর আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে দাঁড়ায়। আর খুদির পূর্ণ বিকাশই জন্ম দেয় ইনসানে কামিল বা পূর্ণাঙ্গ মানুষের।
কুরআনের ভাষায় মানুষ হল খলিফা ফিল আরদ — পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি। এই ধারণাই ইকবালের দর্শনের ভিত। তিনি বললেন, মানুষ যদি তার খুদিকে শক্তিশালী করে তবে সে প্রকৃত খলিফা হয়ে ওঠে। তখন সে কেবল দাস নয়; বরং আল্লাহর প্রতিনিধি, যে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে, সত্যের পথে দাঁড়ায়, মানবতাকে মুক্ত করে। খুদি দুর্বল হলে মানুষ হয় হীনম্মন্য, পরাধীন, আত্মবিস্মৃত। কিন্তু খুদি জাগ্রত হলে মানুষ হয়ে ওঠে মহৎ, শক্তিশালী, সৃষ্টিশীল। তখন সে দাসত্ব ভাঙে, সময়কে চালনা করে, ইতিহাসকে নতুন দিকে নিয়ে যায়। এই শক্তির চূড়ান্ত রূপই ইনসানে কামিল।
এই ধারণার শিকড় ইসলামী দর্শনের গভীরে। সুফি সাধক ইবনে আরাবী বলেছিলেন, ইনসানুল কামিল বা পূর্ণাঙ্গ মানুষ মানে সেই সত্তা, যিনি আল্লাহর সমস্ত নাম ও গুণের প্রতিফলন। মানুষ আল্লাহর আয়না, তাঁর সৃষ্টিশক্তির প্রতিফলন। রুমীও বলেছিলেন, মানুষ যদি নিজের অন্তর্দীপ জ্বালাতে পারে, তবে সে ঈশ্বরের সৌন্দর্যের প্রতিফলন হয়। কিন্তু ইবনে আরাবীর পূর্ণাঙ্গ মানুষ ছিল ধ্যাননিবিষ্ট সাধক, অনেকটা সমাজ থেকে সরে থাকা। ইকবাল এই ধারণাকে নতুন জীবন দিলেন। তিনি বললেন, আজকের পৃথিবীকে বদলাতে হলে প্রয়োজন কর্মমুখর মানুষ, যিনি সমাজ, রাজনীতি ও ইতিহাসের ভিতরে দাঁড়িয়ে কাজ করবেন। তাঁর ইনসানে কামিল নিছক মরমী নন; বরং বিপ্লবী নেতা।
ইকবালের কবিতায় এই পূর্ণ মানুষ ঈগলের প্রতীকে ভেসে ওঠেন। ঈগল আকাশে উড়ে, ঝড়কে ভয় পায় না, পাহাড়ের চূড়ায় বাস করে, নিজের শিকার নিজে করে। দুর্বল কবুতরের মতো নয়, ঈগল আত্মনির্ভরশীল, সাহসী, দৃঢ়, স্বাধীন। ইকবাল মুসলমানদের বললেন, তোমরা ঈগলের মতো হও। ঈগলের চোখে থাকে দূরদৃষ্টি, তার উড়ানে থাকে সাহস, তার ডানায় থাকে স্বাধীনতার ঘোষণা। ইনসানে কামিল ঠিক এই ঈগল-মানুষের মতো, যে আকাশ ছোঁয়, পৃথিবীতে নেতৃত্ব দেয়, আল্লাহর সঙ্গে একাত্ম হয়।
কিন্তু এই পূর্ণাঙ্গ মানুষ হওয়া সহজ নয়। ইকবাল দেখিয়েছিলেন এর কয়েকটি ধাপ। প্রথম ধাপ আত্মসংরক্ষণ — নিজেকে ভেঙে পড়তে না দেওয়া, নিজের সত্তাকে রক্ষা করা। দ্বিতীয় ধাপ আত্মবিকাশ — জ্ঞান, শিল্প, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে আত্মাকে প্রসারিত করা। আর তৃতীয় ধাপ আত্মসমর্পণ — নিজের খুদিকে আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে একীভূত করা। এই শেষ ধাপেই মানুষ পূর্ণাঙ্গ বা ইনসানে কামিল হয়। তখন সে হয় আল্লাহর প্রতিনিধি, ন্যায় প্রতিষ্ঠার যোদ্ধা, অন্যায়ের বিনাশকারী, মানবতার দিশারি।
ইকবালের যুগে এই ধারণার রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল বিপুল। মুসলিম জাতি তখন ঔপনিবেশিক শাসনে নিস্তেজ, অতীতের গৌরব গেয়ে যাচ্ছিল, বর্তমানের জন্য কিছু করতে পারছিল না। ইকবাল বললেন, মুক্তির পথ বাইরে নেই, মুক্তির পথ ভেতরে। খুদিকে জাগাও, পূর্ণ মানুষ হও। জাতির প্রয়োজন সেই ইনসানে কামিল, যিনি নেতা হবেন, যিনি সমাজকে বদলাবেন, যিনি নতুন ইতিহাস রচনা করবেন। তাঁর দর্শন কেবল আধ্যাত্মিক নয়, রাজনৈতিক মুক্তিরও আহ্বান।
এখানেই আসে পাশ্চাত্যের সঙ্গে তুলনা। নীটশ-এর সুপারম্যানও সীমা অতিক্রমী মানুষ, যিনি পুরোনো নৈতিকতার গণ্ডি ভেঙে নতুন মূল্যবোধ সৃষ্টি করবেন। ইকবালের ইনসানে কামিলের সঙ্গে তাঁর মিল আছে। দু’জনেই শক্তিশালী, দু’জনেই সীমা অতিক্রমী। কিন্তু পার্থক্য বিশাল। নীটশ-এর সুপারম্যান ঈশ্বরকে অস্বীকার করে, নৈতিকতার ঊর্ধ্বে উঠে যায়। ইকবালের ইনসানে কামিল ঈশ্বরকেন্দ্রিক, আল্লাহর প্রতিফলন, নৈতিকতায় দৃঢ়। নীটশ-এর সুপারম্যান নিঃসঙ্গ, সমাজ থেকে দূরে; আর ইকবালের ইনসানে কামিল সমাজের নেতা, মানবতার প্রতিনিধি, খলিফাতুল্লাহ। হেগেলের দর্শনেও তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন, বিশেষ করে বিশ্ব আত্মার ক্রমোন্নতির ধারণায়। কিন্তু সবশেষে ইকবাল ইসলামী আধ্যাত্মিকতাকেই ভিত্তি বানালেন।
তাঁর কবিতায় শোনা যায় অগ্নিঝরা ডাক — “নিজের সত্তাকে এত শক্তিশালী করো যে, ভাগ্যও তোমার সামনে এসে নত হয়।” এই উচ্চারণ নিছক কবিতা নয়, বিপ্লবের ভাষা। তিনি মানুষকে শেখাচ্ছিলেন, তুমি ভাগ্যের দাস নও, তুমি ইতিহাসের স্রষ্টা। খুদিকে জাগাও, তবে সময় তোমার হাতে বাঁক নেবে। তাঁর কবিতায় ঈগলের ডানা ঝাপটানোর শব্দ শোনা যায়, শোনা যায় আকাশভেদী আত্মবিশ্বাসের আহ্বান।
আজকের পৃথিবীতেও ইকবালের এই মানবতাবাদী দর্শন জরুরি। প্রযুক্তি আমাদের যান্ত্রিক করছে, ভোগবাদ আমাদের দুর্বল করছে, নৈতিকতার আগল ভাঙছে। মানুষ আত্মবিস্মৃত, নিজের ভেতরের শক্তিকে ভুলে যাচ্ছে। এই সময়ে ইকবালের ইনসানে কামিল আমাদের মনে করিয়ে দেয় মুক্তির পথ খুদি জাগানোয়। পূর্ণাঙ্গ মানুষ হওয়া ছাড়া মুক্তি নেই। ইনসানে কামিল কেবল মুসলিম সমাজের নয়, মানবতার প্রয়োজন। কারণ, পূর্ণাঙ্গ মানুষ মানে সেই সত্তা, যিনি সাহসী, সৃজনশীল, নৈতিক, কর্মঠ ও আলোকিত। তিনি সমাজকে জাগান, জাতিকে বদলান, মানবতাকে মুক্ত করেন।
ইকবাল তাই শেখান — মানুষ ক্ষুদ্র নয়, মানুষ মহাবিশ্বের কেন্দ্রে দাঁড়ানো এক অদম্য শক্তি। খুদি দুর্বল হলে মানুষ দাস, খুদি জাগ্রত হলে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। তখন সে পাহাড় ভাঙতে পারে, সময় বদলাতে পারে, ইতিহাস রচনা করতে পারে। তখন সে হয় ইনসানে কামিল — পূর্ণাঙ্গ মানুষ, আল্লাহর প্রতিনিধি, ন্যায়ের বাহক, আলোর দিশারি। আজকের অন্ধকার সময়ে তাই প্রয়োজন সেই অগ্নিঝরা ডাক — খুদিকে প্রজ্বলিত করো, খুদিকে জাগাও, পূর্ণাঙ্গ মানুষ হও, ইনসানে কামিল হও।
(লেখক: সহ-শিক্ষক, মাড়বেদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, পুরুলিয়া)।








