‘আই লাভ মুহাম্মদ’, ভালবাসা নাকি হুজুগ?
মনিরুল ইসলাম তপন
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চোখে পড়ছে এক অদ্ভুত দৃশ্য। শহরের মোড়ে মোড়ে, বাজারের সরু গলিতে, গ্রামগঞ্জের পথঘাটে – একই ব্যানার, একই বাক্য: I Love Muhammad। ব্যানারের ঝলক, মিছিলের আওয়াজ, সামাজিক মাধ্যমে লাইভ ও ভিডিও পোস্ট – সব মিলিয়ে মনে হয় যেন নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে ভালবাসার নতুন আন্দোলন জেগেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি সত্যিই ভালবাসা? নাকি কেবল একটি অস্থায়ী আবেগের প্রদর্শন, এক হুজুগ, যা কয়েকদিনের মধ্যেই মিলিয়ে যাবে?
রাস্তার পাশে ঝোলানো সুদৃশ্য বৃহদাকার রঙিন চকচকে ব্যানারের অনেকগুলোই আবার কয়েকদিনের মধ্যে ছিঁড়ে ঝুলে আছে, রাস্তার পাশে নোংরা জায়গায় বা ডাস্টবিনে পড়ে আছে। ভালবাসার নামে নবী (সা.)-এর প্রতি অজান্তে এ এক অসম্মান, যা মনকে কষ্ট দেয়, হৃদয়কে ব্যথিত করে।
নবী (সা.)-এর প্রতি ভালবাসা মানে কেবল মুখে উচ্চারণ নয় – তা হল অনুসরণ, চরিত্র গঠন, ত্যাগ ও নৈতিকতার মাধ্যমে প্রমাণ। আজকের এই ব্যানার-ভালবাসা কি সেই প্রকৃত ভালবাসার প্রতিফলন, নাকি কেবল নতুন যুগের ধর্মীয় প্রদর্শনবাদ?
ঘটনার সূত্রপাত ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ উত্তরপ্রদেশের কানপুর থেকে। সেখানে একটি মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠানে “I Love Mohammad” লেখা একটি ব্যানার সড়কে ঝোলানো হয়। স্থানীয় মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে তাৎক্ষণিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অনেকে মনে করেন, এটি নবীপ্রেমের নিদর্শন। আবার অনেকের মতে, এটি ধর্মীয় সংবেদনশীলতার সঙ্গে খাপ খায় না। স্থানীয় পুলিশ দ্রুত হস্তক্ষেপ করে ব্যানারটি সরিয়ে ফেলে।
ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় এটি দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকদিনের মধ্যেই মির্জাপুর, আলিগড়, কানপুরের আশেপাশের শহর ও গ্রামের বাজার, মসজিদ প্রাঙ্গণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণেও একই ধরনের ব্যানার ঝুলতে দেখা যায়। ভারত ছাড়িয়ে বাংলাদেশ, নেপাল, ব্রিটেন এবং কানাডার প্রবাসী মুসলিম সম্প্রদায়েও একই ধরনের মিছিল ও ব্যানার দেখা যায়। বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়, সামাজিক মাধ্যমে। ”I Love Muhammad” দ্রুত ট্রেন্ড হতে থাকে, ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে লাইভ সম্প্রচার করা হয় এবং বিভিন্ন নিউজ পোর্টালও এটি কভার করে। ফলে ধর্মীয় উদযাপন যেন নতুন এক ডিজিটাল ট্রেন্ডের আকার ধারণ করে।
ইসলামের ইতিহাসে নবী (সা.)-এর প্রতি ভালবাসার প্রকৃত উদাহরণ রেখেছেন সাহাবীগণ। জীবনের প্রতি পদে তারা সেই ভালবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ভালবাসা দেখাতে ”আমি ভালবাসি” লিখে তারা কখনও ব্যানার টাঙাননি বা মিছিলও করেননি। বরং তাঁদের জীবন, ত্যাগ, তিতিক্ষা ও চরিত্রই ছিল ভালবাসার প্রকৃত প্রকাশ। কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন রাসুল (সা.)-কে রক্ষা করতে, কেউ নিজের সন্তান ও সম্পদ কুরবানি করেছেন দ্বীনের খাতিরে। তাঁদের চোখে রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন প্রাণের চেয়েও প্রিয়।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসো তবে আমাকে অনুসরণ করো, আল্লাহ তখন তোমাদের ভালবাসবেন।” (আলে ইমরান: ৩১)। অর্থাৎ, রাসুলকে ভালবাসার প্রকৃত মানে হল তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা, তাঁর আখলাককে জীবনে ধারণ করা। দাড়ি রাখা, নামায-রোযা ঠিক রাখা, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা – এসবই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, যারা ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নামছে, তারা বাস্তবে রাসুলের শিক্ষা থেকে বহু দূরে। মিছিলে স্লোগান তোলা সহজ, কিন্তু মসজিদের জামাতে ফজরের নামায আদায় কঠিন। ব্যানারে লেখা সহজ, কিন্তু ব্যবসায় সত্যবাদিতা বজায় রাখা কঠিন।
এ ধরনের কার্যকলাপ প্রকৃত ভালবাসার নিদর্শন নয়। এতে ধর্মীয় আন্তরিকতার চেয়ে অনেক বেশি থাকে দেখানেপনা মনোভাব। ইসলাম এমন প্রদর্শনবাদকে উৎসাহিত করে না। বরং সতর্ক করা হয়েছে, যখন আমল শুধুই লোক দেখানোর জন্য হয়, তখন সেটি রিয়া বা ভণ্ডামিতে পরিণত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে লোক দেখানোর জন্য আমল করে, আল্লাহও তাকে লোক দেখানো হিসেবে গণ্য করবেন।” (সহীহ মুসলিম)।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ভালবাসা মানে তাঁকে অনুসরণ করা, সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, দুর্নীতি থেকে বিরত থাকা, মিথ্যা না বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, আত্মীয়-প্রতিবেশীর হক আদায় করা। এসবই তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালবাসার উদাহরণ। আর এসব না করে কেবল ব্যানার ঝোলানো বা মিছিল করা হলে সেটি ভালবাসা নয়, নিছক হুজুগমাত্র।
সুতরাং আজকের সমাজে সত্যিকার নবীপ্রেম জাগাতে হলে আমাদের ফিরতে হবে মূল শিক্ষার দিকে। ব্যানার নয়, চাই বাস্তব পরিবর্তন। স্লোগান নয়, চাই সুন্নাহর অনুকরণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানবতার শিক্ষক। তাঁকে ভালবাসা মানে মানবতাকে ভালবাসা, মানুষের জন্য শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। ব্যানারের ঝড়ে নয়, জীবনের আমলে তাঁর ভালবাসার প্রমাণ রাখতে পারলেই আমরা প্রকৃত নবী-প্রেমিক উম্মত হতে পারব।








