এসআইআর নিয়ে রাজ্যে ভয় ও বিভ্রান্তি
ইয়াসমিন খাতুন
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা হালনাগাদের বিশেষ প্রক্রিয়া এসআইআর শুরু হয়ে গিয়েছে, যা এখন রাজনীতির হট ইস্যু। প্রশাসনের দাবি, এটি একেবারেই নিয়মিত প্রক্রিয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই ফর্ম নিয়েই তৈরি হয়েছে আতঙ্ক, গুজব আর রাজনৈতিক তরজা। ভয়, বিভ্রান্তি আর প্রচারের মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছে আসল তথ্য।
ফর্মে কী আছে, ভয় এত কেন?
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে রাজ্যজুড়ে প্রায় ৮০ হাজারেরও বেশি বিএলও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করছেন। এই ফর্মে চাওয়া হচ্ছে ভোটারের নাম, ঠিকানা, বয়স, এপিক নম্বর এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভোটার তালিকার তথ্য। এটাই স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর। একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া, যাতে পুরোনো নামের ভুল সংশোধন করা হয় এবং নতুন ভোটারদের যুক্ত করা হয়। তবুও, রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এক ভয়ভীতির আবহ। বহু মানুষ ভাবছেন, এই ফর্মে সই করলে নাম কেটে দেবে না তো? এটা কি ঘুরপথে নতুন করে এনআরসি? কোথাও বিএলও এলে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার মানুষ ফর্ম নিতে অস্বীকার করছেন। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Fear Psychosis, যখন ভয় ও গুজব মিলে মানুষের বাস্তব উপলব্ধিকে ঢেকে দেয়। ফর্মে বিপদের কিছু না থাকলেও, ভয়ই বাস্তব হয়ে উঠছে সর্বত্র।
তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে বিজেপি ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “এটা নতুন করে এনআরসি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। মানুষকে ভয় দেখিয়ে ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”মঙ্গলবার তিনি কলকাতার রাস্তায় মিছিল করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, “যেভাবে বিএলও-দের পাঠানো হচ্ছে, আর প্রশাসনিক প্রচার করা হচ্ছে, তা অনেকের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠছে।”
অন্যদিকে বিজেপির পাল্টা দাবি, ভয় নয়, যাচাইয়ের সময়। তৃণমূল অযথা ভয় ছড়াচ্ছে। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, “যাদের নাম ভুয়ো, তাদের বাদ পড়তেই হবে। যাদের সব ঠিক আছে, তাদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।”বিজেপির বক্তব্য, ভুয়ো ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া না গেলে গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের মতে, তৃণমূল ইচ্ছাকৃতভাবে গুজব ছড়াচ্ছে, যাতে প্রক্রিয়াটা বন্ধ করা যায়।

নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, “এটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক নয়। প্রত্যেক ভোটার চাইলে নিজের নাম যাচাই করতে বা সংশোধন করতে পারবেন।” কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, “SIR প্রক্রিয়া প্রতি বছরই হয়। কিন্তু এবার রাজনীতির মঞ্চে সেটাই অযথা বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।”
প্রশ্ন উঠেছে, সিপিএমের নীরবতা কৌশল নাকি সাংগঠনিক দুর্বলতা? কারণ, এসআইআর ঘিরে রাজ্য রাজনীতির পারদ যখন ঊর্ধ্বমুখী, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নীরব ভূমিকা নিয়েছে সিপিএম। দলের পক্ষ থেকে এখনো কোনও তীব্র প্রতিক্রিয়া শোনা যায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিপিএম এখন অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ-এর কৌশল নিচ্ছে। তারা চাইছে, তৃণমূল ও বিজেপির সংঘাতের মাঝখানে নিজেদের অবস্থান নিরপেক্ষ রাখবে, যাতে পরে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। এক বিশ্লেষকের ভাষায়, “সিপিএম বুঝতে চাইছে, মানুষের প্রতিক্রিয়া কোন দিকে যায়। তারপরেই তারা মাঠে নামবে।”
ভয় এখন রাজনীতির নতুন হাতিয়ার। প্রশাসন ও কমিশন বলছে, ফর্মে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভুল হলে তা সংশোধন করা যাবে। কিন্তু মানুষের মনে ভয়ের মেঘ ঘনাচ্ছে। রাজনীতির মঞ্চে এই ভয়ই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। ভোটার তালিকা হালনাগাদের প্রশাসনিক কাজকে দুই পক্ষই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। একদল বলছে ভয় ছড়ানো হচ্ছে, অন্যদল বলছে ভয় দেখিয়ে সত্য লুকোনো হচ্ছে। আর সাধারণ মানুষ? তারা শুধু চায় তাদের ভোটাধিকার অক্ষুণ্ণ থাকুক।
শেষ কথা, ভয় নয়, সচেতনতা দরকার। একটি সাধারণ ফর্ম ঘিরে যতটা আতঙ্ক, তা প্রমাণ করে ভয় এখন রাজনৈতিক ভাষার অংশ হয়ে গেছে। রাজনীতির ভাষায় এখন যুক্তি নয়, আবেগ ও আতঙ্কই প্রধান চালক। এসআইআর নিয়ে যত বিতর্কই হোক, গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে জরুরি। মানুষ যেন ভয় নয়, তথ্য ও সচেতনতার ওপর ভরসা রাখে। ভয় থেকে নয়, সচেতনতা থেকেই আসুক প্রকৃত গণতন্ত্রের শক্তি।








