হয় কে নয়, নয় কে ছয়
নয় দশ ছয় ছিয়ানব্বই, নাকি নয় ছয়? এই অনুষঙ্গেই আসে, হয় কে নয়, নয় কে ছয়। তার মানে হল সব হিসেব-নিকেশ ওলোট পালোট করে দেওয়া। আমাগো দ্যাশে এমনই এক সরকার রহিয়াছে, যাহারা সর্বদা এই কম্মটিতেই ওস্তাদ। দেশের উন্নতি, সাফল্য নিয়ে প্রতিদিন কতই না উৎসাহব্যঞ্জক গল্প, তথ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায় কেন্দ্রীয় শাসক দলের চুনোপুঁটি রাঘব-বোয়াল নেতা-মন্ত্রীদের কাছ থেকে। তারা যেন আবহাওয়া দফতর কিংবা বাতপতাকা। রোজকার আবহাওয়া সংবাদের মতো গোদি মিডিয়া জানিয়ে দেয় উন্নয়নে দেশ কত তরক্কী করছে, দেশের অর্থনীতি নিত্যদিন বৃদ্ধির হার, মূল্যবৃদ্ধি তলানিতে নামার গপ্পো। বুক বাজিয়ে সবচেয়ে যেটা প্রচার হয়, তা হল ১৪৬ কোটি নাগরিকের দেশ ভারতবর্ষে অর্থনীতির বিকাশ হচ্ছে লাফিয়ে, বিশ্বের যে কোনও দেশের তুলনায় বেশি হারে। অর্থাৎ গ্রোথ রেট ইজ স্কাই ইজ দ্য লিমিট। আহা রে ভাবলেই মাথা বনবন কইরা ঘুরিয়া যায়। যাদের মাথা ঘোরার ব্যামো নেই, তারা ভিমরি খায়। কাহারো বা চক্ষু কপালে উঠিয়া যায়। কাহারো বা ছানা বড়া হইয়া যায়।
নমো ঘোষিত বিকশিত ভারতের স্বপ্নকে জীবন্ত রাখতে হলে বিকাশের উচ্চ বা সর্বোচ্চ দেখানো ছাড়া উপায় নেই। যদিও ভারতের অর্থনীতি এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে এবং যে হারে বৃদ্ধি ঘটছে, তাতে ২০৪৭ সালে বিকশিত ভারত গড়া অলীক স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। বর্তমানে কেন্দ্র সরকারের বিতর্কিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী যে হারে অর্থনীতি অর্থাৎ জিডিপি-র বৃদ্ধি ঘটছে তাতে ২০৬০ সালেও বিকশিত ভারত বা উন্নত ভারত হবার সম্ভাবনা নেই। অথচ প্রতিনিয়ত প্রচার চলছে এবং সরকার বাহাদুরও একের পর এক পরিসংখ্যান দিচ্ছে, দেশে নাকি মূল্যবৃদ্ধির হার শূন্যের কাছাকাছি অর্থাৎ নমোর জামানায় দেশে জিনিসপত্রের দাম আদৌ বাড়ছে না। যেটুকু শোনা যাচ্ছে, তা কেবল দেশদ্রোহী বিরোধীদের অপপ্রচার। তারপরেও যদি সত্যিই মূল্যবৃদ্ধি হয়ে থাকে, তার জন্য দায়ী নেহরু কিংবা ইন্দিরা।
কিন্তু বাজারে গেলে প্রত্যেকেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে প্রতিটি জিনিসের দাম কীভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি জিএসটি-র হার কমিয়ে জোর প্রচার হয়েছে জিনিসের দাম আরও কমে যাবে। কিন্তু সত্যি সত্যি কোনও জিনিসের দাম কমেছে, এমনটা কেউ টের পাননি। এমনকি গত আগস্টে দেশজুড়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে জিএসটি উৎসব করার পরেও অবস্থা তথৈবচ। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বুঝিয়ে দিচ্ছে সাফল্যের ঢাক পেটানোর জন্য নমো সরকার সরকারি সিলমোহর দিয়ে যে সব তথ্য-পরিসংখ্যান বাজারে হাজির করছে, তার আদৌ বিশ্বাসযোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা নেই। তেমনি জিডিপি-র যে হার বাজারে ছাড়া হচ্ছে, তাতে কতটা জল মেশানো বলা মুশকিল।
তার মানে এই নয় যে, দেশে কোনও উন্নয়নই হচ্ছে না, বা অর্থনীতির শ্রীবৃদ্ধি ঘটছে না। কিঞ্চিতের বঞ্চিত হচ্ছে বৈকি। জিডিপি অবশ্যই বাড়ছে, আয় বাড়ছে, সম্পদও বাড়ছে। তবে প্রশ্ন হল সেই আয় বা সম্পদ কি সত্যি সত্যি সাধারণ মানুষের ঘরে যাচ্ছে, সুষম বণ্টন হচ্ছে? নাকি উপরতলার অল্প সংখ্যক মানুষ সব লুটেপুটে খাচ্ছে। এই গুরুতর প্রশ্নের জবাব খানিকটা মিলবে আয় ও সম্পদের বৈষম্য সংক্রান্ত বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক রিপোর্ট। ওয়াল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের অগণিত মানুষ প্রতিদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শ্রম দিয়ে যে সম্পদ সৃষ্টি করে চলেছেন, ন্যায়সঙ্গত হারে সেই সম্পদ তাদের ঘরে আসে না। চলে যায় উপরতলার মুষ্টিমেয় বিত্তবানের হাতে। ভারতের মোট সম্পদের ৪০ শতাংশের মালিকানা ভোগ করে জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ মানুষ। আর উপরতলার ১০ শতাংশ মানুষের হাতে আছে দেশের ৬৫ শতাংশ সম্পদ। তেমনি আয়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। মোট আয়ের ৫৮ শতাংশ উপর তলার ১০ শতাংশের কাছে রয়েছে। অর্থাৎ মোদিরা উন্নতি, বিকাশের যে গল্প প্রতিদিন মানুষকে শোনাচ্ছেন, সেটা আদৌ দেশের সাধারণ মানুষের সত্য কাহিনি নয়। সেটা আসলে বিত্তবানদের গল্প। বর্তমান কেন্দ্র সরকার তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করে। এই অভিযোগ বরাবর করে আসছে বিরোধীরা। কিন্তু তথ্য, পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়। বাস্তবে মানুষের আয় বাড়ে না, সম্পদ বাড়ে না। শুধু বৈষম্য বেড়ে যায়। গত এক দশকে বৈষম্য বৃদ্ধির দৌড়ে ভারতবর্ষ বিশ্বে এক নম্বর স্থান দখল করে নিয়েছে। কিন্তু কচ্ছপ উল্টে দেওয়া হয়। যেমন টাকার মূল্য কমে গেলে বলা হয়, টাকার দাম কমেনি, বেড়েছে ডলার দাম।








