কালজয়ী পদার্থবিদ সত্যেন্দ্রনাথ বোসের রসায়ন গবেষণা
শামীম হক মণ্ডল
বোসনের স্রষ্টা সত্যেন্দ্রনাথ। তাঁর আবিষ্কৃত বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানের কথা বিশ্বময় ছড়িয়ে আছে। কিন্ত রসায়নে তাঁর অবদানের কথা ক’জন আর জানেন? বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু আবিষ্কৃত (১৯২৪) বোসনের শতবর্ষ উদযাপন চলছে বছরভর। তাঁর পরিসংখ্যানের কথা, বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন, ভর প্রদানকারী ‘হিগস বোসন’-এর নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা বিশ্বজুড়ে পদার্থবিদ্যার শিক্ষার্থীদের জানা। কিন্ত তাঁর রসায়ন গবেষণার কথা খুব অল্প লোকই জানেন। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কৌতূহল ছিল অপরিসীম। তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার প্রথম সারির গবেষক হয়েও পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ্যা, কেলাস বিদ্যা, জৈব রসায়ন সবই ছিল তাঁর আগ্রহের বিষয়।
বোস তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা প্রকাশের পর বিলেত যান। জার্মানিতে থাকাকালীন বিশিষ্ট রসায়নবিদ হার্মান মার্কের ল্যাবরেটরি বা পরীক্ষাগার পরিদর্শন করেন তিনি। সেই থেকে পরীক্ষামূলক রসায়নে কাজ করার একটা ঝোঁক তার মধ্যে তৈরি হয়। দেশে ফিরে আবার যোগদান করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। সেসময় তাঁর আলাপ হয় রসায়নের অধ্যাপক সুশীলচন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে রসায়নে কিছু কাজ করেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু, যা প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে জার্মানির এক খ্যাতনামা রসায়ন পত্রিকায়। এর দু-বছর পর বেরিলিয়ামের বর্ণালী সংক্রান্ত একটি কাজ প্রকাশিত হয় ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন বোস এক অত্যাধুনিক গবেষণাগার তৈরী করেন, যেখানে একটি এক্স-রে ডিফ্র্যাক্টোমিটার আনেন, যাতে করে তত্ত্বীয় বিজ্ঞানের পাশাপশি পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের কাজও করা যায়। সেখানেই তিনি প্রথম জৈব রসায়নের কাজ শুরু করেন। সালফোনামাইড যৌগ বিষয়ক তাঁর কাজ সেই সময় বেশ সাড়া ফেলেছিল। পি.কে. দত্ত নামে তাঁর এক ছাত্র ঢাকায় থাকাকালে তাঁর কাছে জৈব রসায়নের ওপর কাজ করে ডক্টরেট ডিগ্রি পান। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে তিনি খয়রা অধ্যাপকের পদ গ্রহণ করেন। তাঁর আসার আগে বিধুভূষণ বাবু এক্স-রশ্মি নিয়ে কাজ করার জন্য একটি ল্যাবরেটরি বা পরীক্ষাগার তৈরি করেছিলেন, সত্যেন বোস সেখানেই সক্রিয় জৈব যৌগ সংশ্লেষের কাজ শুরু করেন। যদুগোপাল দত্ত নামে আর এক ছাত্র তাঁর সঙ্গে কাজে যোগ দেন এবং এমেটিন সংশ্লেষ করেন, যেটি সাধারণত অ্যান্টি-প্রোটোজোয়াল ড্রাগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রাণবন্ধু দত্ত ও তাঁর তত্ত্বাবধানে বেশ কিছু জটিল জৈব যৌগ সংশ্লেষ সম্পর্কিত কাজ করেন। তিনি কুইনিন তৈরির চেষ্টাও করেছিলেন, যাতে এই অভাগা দেশে ওষুধের অভাব কিছুটা দূর করা যায়।
সালফোনামাইডের রাসায়নিক গঠন:
ক্লেমেন্স উইঙ্কলার নামক এক জার্মান রসায়নবিদ আর্গাইরোডাইট নামক একটি খনিজ থেকে রূপা ও গন্ধকের সঙ্গে নতুন এক মৌল আবিষ্কার করেন। উইঙ্কলার নিজের দেশের সঙ্গে মিলিয়ে তার নাম রাখেন জার্মেনিয়াম। এই জার্মেনিয়ামের পলিক্রিস্টাল ব্যবহার করে বিশ্বে প্রথম যেই ট্রানজিস্টর তৈরি হল, তখন থেকেই বাণিজ্য মহলে এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এর চাহিদা আরো বাড়ে। দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ সত্যেন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হতে গেলে অদূর ভবিষ্যতে এদেশেও জার্মেনিয়ামের দরকার পড়বে। কিন্তু ভারতে তা মেলা ভার।
পরিশেষে বন্ধু পুলিন বিহারী সরকারকে সঙ্গে নিয়ে নেপাল থেকে স্ফালেরাইট নিয়ে আসেন। শুধু তাই নয়, সেই আকরিক থেকে জার্মেনিয়ামের নিষ্কাশন কীভাবে করা যায়, সে বিষয়ে কয়েকটি মৌলিক গবেষণাপত্র লেখেন। পদার্থবিদদের, সাধারণত ভৌত রসায়নের প্রতি বেশি আগ্রহ থাকে, কিন্ত সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন তার উল্টো। তিনি পরীক্ষামূলক রসায়নের কাজ হাতে-কলমে করতে ভালবাসতেন, বিশেষত জৈব রসায়ন। সাধারণত অনুমান করা হয়, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে তার বিশেষ যোগাযোগ থাকায় ও তাঁর বাবার রাসায়নিকের কারবার, তাঁকে রসায়ন শাস্ত্রে আগ্রহী করে তুলেছিল।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন ল্যাবরেটরির সামনে এক ছাত্রের সঙ্গে দেখা সত্যেন্দ্রনাথের। ছাত্রটি বেশ চিন্তিত- অনেক দিন ধরে একটা পরীক্ষা করেই যাচ্ছেন, কিন্ত আশানুরূপ ফল মেলে না। সত্যেন্দ্রনাথ বললেন, যা এই পরীক্ষাগুলো কর, তাহলে ফল পাবি, আর কাজের পদ্ধতিটা তোর গাইডকে দেখাস।’ অবিশ্বাস্য! এবার ফলাফল ঠিক ঠাক এসেছে। ছাত্র চললেন তাঁর মাষ্টারমশায়ের কাছে। ঘটনাক্রমে তাঁর মাষ্টারমশাই ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথের বন্ধু জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, প্রখ্যাত রসায়ন বিজ্ঞানী, আইআইটি খড়গপুরের প্রতিষ্ঠাতা নির্দেশক। আর ছাত্রটি ছিলেন প্রতুল চন্দ্র রক্ষিত। যারা কেমিস্ট্রি বা রসায়নশাস্ত্রে অনার্স পড়েছেন, তাঁদের চেনা লাগবে নামটা। কারণ পি.সি. রক্ষিতের লেখা ‘ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি’ বইখানি কেমিস্ট্রি অনার্সের জন্য অনবদ্য ও অপরিহার্য।
তাঁর জীবনের এক অপূরণীয় বিস্ময়কর ঘটনা হল, বিশ্ববন্দিত কিংবদন্তী পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু কেন্দ্র সরকারের কাছে অনুদান চেয়ে জীবনের শেষ চিঠি লিখছিলেন, যার বিষয়বস্তু ছিল, হিলিয়াম গ্যাস প্রকল্প। কিন্ত সেই চিঠি লেখা শেষ করার আগেই, উনি চলে গেলেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জন্মদিন ১ জানুয়ারি ১৮৯৪ এবং প্রয়াণ ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪।








