পশ্চিমা সহায়তা ছাড়া ইসরাইল টিকতে পারবে?
রামজি বারৌদ
গাজায় ইসরাইলি বর্বরতা ও পাশবিকতা এবং তাতে আমেরিকা-সহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো কীভাবে সমর্থন দিয়ে চলেছে, সে বিষয়ে ক্ষুরধার বিশ্লেষণ করেছেন ‘প্যালেস্টাইন ক্রনিক্যাল’-এর সম্পাদক রামজি বারৌদ।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি গণহত্যা এবং তা থেকে শুরু হওয়া আঞ্চলিক যুদ্ধ দুটি ভয়াবহ সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রথমত, ইসরাইল ইচ্ছাকৃতভাবে আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে অবজ্ঞা করছে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমাদের সহায়তা সমর্থন ছাড়া ইসরাইল একা টিকে থাকতে সক্ষম নয়।
এই দুটি বিষয় আলাদা মনে হলেও বাস্তবে একটি অন্যটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কারণ, যারা সামরিক, রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে ইসরাইলকে টিকিয়ে রেখেছে, তারা সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে মধ্যপ্রাচ্য আর বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে না। টানা সাড়ে সাত দশক ধরে ইসরাইলি আগ্রাসনের কারণে অস্থিতিশীল হয়ে আছে মুসলিম অধ্যুষিত মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
কঠিন বাস্তবতা হল ইসরাইল যদি গাজা থেকে সরে যায় এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত ও গণহত্যার শিকার গাজা উপত্যকা যদি স্থিতিশীল হওয়ার অবকাশ পায়, তাহলেই পার্থক্য প্রকাশ্যে আসবে। এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলি নৃশংসতায় প্রায় ৬০ হাজার গাজাবাসী তথা ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার শিশু এবং অন্তত ২৮ হাজার নারী রয়েছেন। গাজার নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হলে নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে।
‘যার শক্তি, সেই সঠিক ও ন্যায্য’ — আগামীর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ থেকে এই ঘৃণ্য নীতি সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের আরব ও মুসলিম দেশগুলোর সামনে এখন সময় এসেছে, তারা যেন সদর্থক ভূমিকা নেয়। তারা যেন নিজেদের ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ ও জনগণকে সাহায্য করে এবং নিশ্চিত করে যে, ইসরাইল আর তাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করতে পারবে না।
ইসরাইল বহু বছর ধরেই একদল সমর্থকের আনুকূল্য ও সাহায্য নিয়ে চলছে। পশ্চিমারা ইসরালকে সর্বাত্মক সাহায্য দেওয়াকে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক স্বার্থরক্ষার ঘাঁটি হিসেবে দেখে থাকে।
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ফিলিস্তিনি জনগণের অবিচ্ছেদ্য অধিকার রক্ষায় বিশ্ব এগিয়ে এলে হয়ত কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থার দিকে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে।
ইসরাইলের দৃষ্টিতে এই দাবি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য, এমনকি চিন্তার বাইরে। বোঝা যায়, তাদের এই নীতি তাদের ঔপনিবেশিক অবস্থানের কারণেই। কেন?
প্রখ্যাত গবেষক প্যাট্রিক উলফ বলেছিলেন, ‘আক্রমণ কেবল কোনো ঘটনা নয়, এটি একটি কাঠামো।’ এই গভীর বক্তব্যটি বুঝিয়ে দেয়, ১৯৪৮ সালের নাকবা বা ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধনযজ্ঞ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইসরাইলের সব যুদ্ধ ও দখলদারিত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি নিরবচ্ছিন্ন শক্তি কাঠামোর অংশ। তাদের এসবের পিছনে মূল উদ্দেশ্য স্থানীয় বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।
তাই ৭ অক্টোবরের পর ইসরাইলের আচরণকে শুধু প্রতিশোধ বলেই মনে করা ভুল, বরং এর পিছনে সুস্পষ্ট কৌশল ছিল। গাজার রোমহর্ষক ও বিভীষিকাময় হত্যাকাণ্ড দেখে আমরা হয়ত প্রথমে বিষয়টা বুঝতে পারিনি। কারণ, গাজায় প্রতিদিনের নৃশংসতা থেকে ইসরাইল আনন্দ নিচ্ছে এবং নিজেদেরকে শক্তিশালী বলে দাবি করছে এবং সব ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধকে জাহির করছে।
তবে ইসরাইল নিজেই তাদের আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে বলেছে। দেশটির উগ্রবাদী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর বলেছিলেন, ‘আমরা গাজাকে জনশূন্য দ্বীপে পরিণত করব।’ নেতানিয়াহুর এই উম্মত্ত বক্তব্য ইসরাইলের ঔপনিবেশিক কাঠামোরই অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং যতক্ষণ না এটিকে থামানো যায়, ততক্ষণ তার থেকে মুক্তি নেই। কিন্তু কে বা কারা ইসরাইলকে থামাবে? অর্থাৎ বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?
গাজায় প্রায় ২১ মাসের অসহনীয় গণহত্যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এক কঠিন সত্য। সেটা হল ইসরাইল হচ্ছে আসলে একটা ‘সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র’ (যে দেশ অন্য কোনো প্রভাবশালী রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত)। ইসরাইল এমন এক রাষ্ট্র, যে নিজে যুদ্ধ করতে পারে না, নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, এমনকি নিজ দেশের অর্থনীতি চালাতেও পারে না। ইসরাইলও ঠিক তেমনই। মার্কিন বা পশ্চিমা সহায়তা ছাড়া সে কোনো কিছু করতে পারে না, কোনো কিছু চালাতে পারে না। গাজায় নৃশংস হামলা শুরুর আগে কিছু ইসরাইলি নেতা মাঝে মধ্যে বলতেন, ‘ইসরাইল স্বাধীন দেশ। এই দেশ মার্কিন পতাকার আরেকটি তারকা নয়।’ এখন অবশ্য সেসব কণ্ঠ বা এমন কথাবার্তা একরকম থেমে গেছে। বরং এই রাষ্ট্রকে এসব কথা বলার পরিবর্তে এখন কেবল মার্কিন সহায়তার জন্য অনুনয়-বিনয় করতে শোনা যাচ্ছে।
২০২২ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছিলেন, ‘মার্কিন ও ইসরাইলি জনগণের সম্পর্ক রক্ত-মাংসের মতো গভীর। আমরা অভিন্ন মূল্যবোধে ঐক্যবদ্ধ। ধর্মীয় বিশ্বাসে খ্রিস্টান হলেও আমরা যায়নবাদী।’
বাইডেনের এই তথাকথিত ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’ যে গণহত্যাকে সমর্থন করে, সে বিষয়ে প্রশ্ন না তুলেই বাইডেন আসলে স্বীকার করেছিলেন, ইসরাইল-আমেরিকা সম্পর্ক কেবল রাজনীতির বিষয় নয়; বরং গভীর আদর্শিক ও কৌশলগত বন্ধন।
পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য নেতাও ইসরাইল সম্পর্কে অন্ধভাবে একই কথা বিশ্বাস করেন এবং একই কথা বলে থাকেন। তবে গাজায় ইসরাইলের চলমান এই নৃশংস গণহত্যা বহু দেশকে, বিশেষ করে কিছু পশ্চিমা ও বেশিরভাগ অ-পশ্চিমা দেশকে সাহসের সঙ্গে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধ্য করেছে।
নেতানিয়াহু ও তাঁর চরমপন্থী মতাদর্শের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনো এতটা জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়নি। স্পেন, ইতালি, নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড ও স্লোভেনিয়ার মতো দেশ প্রমাণ করেছে, পশ্চিমা ‘বন্ধন’ চিরকাল অটুট থাকবে না। তাদের সমর্থন ইসরাইলের প্রতি একচেটিয়া বা নিরঙ্কুশ নয়। কিন্তু কেন কিছু দেশ ইসরাইলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সাহস করছে, আবার কিছু দেশ শত অন্যায় সত্ত্বেও চুপ থাকছে?
পশ্চিমাদের সঙ্গে ইসরাইলের এই মধুচন্দ্রিমা ভেঙে দেওয়া এখন জরুরি। এটি শুধু ন্যায়ের ভিত্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নয়; বরং ফিলিস্তিনি জনগণের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। ফিলিস্তিনিরা বরাবরের মতো সাহসের সঙ্গে দখলদার ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা এবং একইসঙ্গে কট্টর যায়নবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ লড়াই করছে। এই অবস্থায় যারা আন্তর্জাতিক আইন, ন্যায়বিচার ও শান্তিতে বিশ্বাস রাখে, তাদের দায়িত্ব হল, সেইসব দেশের সরকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানো, যারা আজও ইসরাইলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, তাকে টিকিয়ে রাখছে।
ইউরোপের দেশ স্পেন-সহ কিছু দেশের সরকার যা করছে, তা কয়েক বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ স্পষ্ট বলছেন, ২০০০ সাল থেকে চালু ইইউ-ইসরাইল বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত করতে হবে। কারণ, গাজার ‘গণহত্যা পরিস্থিতি’ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
স্পেনের মতো আরও কিছু দেশ একইভাবে নির্ভীক ও আপসহীন অবস্থান নিলে অন্তত ইসরাইলের পশ্চিমা অর্থ ও অস্ত্র পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে, যেসব অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে তারা গাজায় বর্বরতা চালাচ্ছে।
এই সময়ে আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব হল, সেই সাহসী কণ্ঠগুলোর পাশে দাঁড়ানো। শুধু ইসরাইল নয়; বরং যারা এই বসতি-উপনিবেশিক কাঠামোকে বজায় রাখতে সাহায্য করছে, তাদের সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।








