সংখ্যালঘুদের প্রাপ্তি ও বঞ্চনার মিশ্র ইতিহাস
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
পশ্চিমবঙ্গের আকাশে যখন নতুন সূর্য ওঠে, তখন তার আলো কি সমানভাবে পৌঁছে যায় প্রতিটি ঘরে? এ প্রশ্ন আজ শুধু পরিসংখ্যানের কাগজে নয়, সমাজের বুকেও ধ্বনিত হয়। সংখ্যালঘুদের প্রাপ্তি আর বঞ্চনার মিশ্র ইতিহাস এক জটিল সুর তোলে — যেখানে আশা ও হতাশার টানাপড়েন এক সঙ্গে বাজে। বাংলা দীর্ঘকাল ঐক্য ও সম্প্রীতির জন্য গর্ব করেছে। কবির বাউলগান থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার মেলা — সবখানেই মিলেমিশে থেকেছে হিন্দু-মুসলমান। অথচ বর্তমান বাস্তবতা যেন অন্য গল্প বলে। পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাদের অনেকাংশ এখনও প্রান্তিক। পিছিয়ে থাকা শুধু কাকতালীয় নয়; বরং সুপরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত অবহেলার ফল।
সাচার কমিটির রিপোর্ট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল শিক্ষা, চাকরি, অর্থনীতি — প্রতিটি স্তরে সংখ্যালঘুদের পিছিয়েপড়া চিত্র। স্কুলের বেঞ্চে বসা শিশুর স্বপ্ন কেবল বইয়ের পাতায় আটকে যায়। কারণ, উচ্চশিক্ষার পথে হাজারো বাধা। সরকারি চাকরির তালিকায় নাম খুঁজে পাওয়া যায় অতি সামান্য। অথচ এ রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তারা। সংখ্যার অঙ্ক এত বড়, অথচ সুযোগের অঙ্ক এত ছোট কেন?
প্রশ্ন জাগে, পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘুরা পিছিয়ে আছে, নাকি ইচ্ছে করেই পিছিয়ে রাখা হয়েছে? ক্ষমতার রাজনীতিতে তারা প্রায়শই ভোট-ব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভেসেছে। কিন্তু বাস্তব উন্নয়নের স্রোত তাদের ঘরে পৌঁছায়নি। রাজনীতি তাদের কণ্ঠকে ব্যবহার করেছে। কিন্তু কণ্ঠস্বরকে শোনেনি। তবু হতাশার আঁধারে কিছু প্রদীপও জ্বলছে। নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণী শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতায় এগিয়ে আসছে। তারা বুঝতে শিখেছে, অধিকার ভিক্ষে চেয়ে নয়, সংগ্রাম করে আদায় করতে হয়। সংখ্যালঘু সমাজের মধ্যেই স্বপ্ন বুনছেন অনেকে, যারা জানেন শিক্ষাই একমাত্র মুক্তির পথ।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, রাষ্ট্র কি তাদের এই স্বপ্নের পাশে দাঁড়াবে? নাকি প্রতিটি নির্বাচন শেষে প্রতিশ্রুতির মায়াজাল ছিন্ন হয়ে আবারও ফিরে আসবে সেই পুরনো বঞ্চনার ছায়া?
আজকের প্রজন্মের সামনে তাই দ্বিমুখী পথ। একদিকে সংগ্রামের দুঃসাহস, অন্যদিকে আত্মসমর্পণের শিকল। পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘুদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তারা কোন পথ বেছে নেবে, তার উপর। এ সমাজ যদি সত্যিই সমতা আর ন্যায়ের কথা বলে, তবে অচিরেই দরকার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে সংখ্যালঘুরা আর শুধু ‘পরিসংখ্যান’ নয়, বরং রাজ্যের উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার। সেটাই হবে সত্যিকারের গণতন্ত্রের পরিচয়।
পশ্চিমবঙ্গের আকাশে সমান আলো ছড়িয়ে পড়ার দিনটির প্রতীক্ষায় আমরা আছি। সেই আলোই ভাঙবে অদৃশ্য শিকল। আর উন্মোচন করবে সমতার নতুন সকাল।








