কাদের জন্য এই বাজেট
প্রতি বছরের মতো এবার বাজেট পেশের প্রাক্কালে প্রকাশিত হয় কেন্দ্র সরকারের আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্ট। তাতে বলা হয়েছে, দেশের মোট উৎপাদনে শিল্প কারখানার অংশগ্রহণ ১৭-১৮%। উন্নত অর্থনীতির দেশের পক্ষে এই সূচক খুব একটা সন্তোষজনক নয়। এ ছাড়াও প্রাক-বাজেট অর্থনীতির খতিয়ান বলছে, দেশে মোট বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়নি। গত বাজেটে কর্পোরেট হাউসকে মেগা কর ছাড় দিয়েও দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে সক্ষম হয়নি কেন্দ্র সরকার। এই প্রেক্ষিতে এবার বাজেট পেশ করতে গিয়ে কর্তব্য পালনের কথা বলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ। শুরুতে তিনি বলেন, দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার আরো বাড়াতে হবে। রাজস্ব আয়ের মধ্যে কর বাবদ আয়ের ক্ষেত্রে কর্পোরেট করের থেকে আয়করের সংগ্রহ অনেক বেশি। দেশের সাধারণ মানুষ যে পরিমাণ কর দিয়ে থাকেন, কোটিপতি কর্পোরেট তার থেকে কম কর দিয়ে থাকেন। কিন্তু কেন এই অবস্থা?
কারণ, সরকার আশা করে, এই কর ছাড় কর্পোরেট হাউসগুলোকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই বিনিয়োগ বাড়েনি। এই প্রবণতা চলে আসছে বেশ কয়েক বছর ধরে। গত বছর কর্পোরেট কর সংগ্রহ হয়েছিল ১১ লক্ষ কোটি টাকা, আর আয় কর থেকে এসেছিল ১৩.১ লক্ষ কোটি টাকা। এবছর কর্পোরেট কর ধার্য করা হয়েছে ১২.৩ লক্ষ কোটি টাকা, আয়কর ধার্য হয়েছে ১৪.৬ লক্ষ কোটি টাকা। জিডিপি’র অংশে করের সগ্রহ ১২ শতাংশ, যা সর্বোচ্চ। কিন্তু এই করের বেশির ভাগ দিয়ে চলেছেন দেশের সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ এবং জিএসটি-সহ পরোক্ষ করের মাধ্যমে। তার মানে হল, মুনাফাকে ছাড় দিয়ে রোজগার থেকে রাজস্ব আয় বেশি। তাহলে কোথায়, কোন কর্তব্য পালন করলেন অর্থমন্ত্রী? যারা এই সরকারকে বিপুল চাঁদা বা ফান্ড দিয়ে ক্ষমতায় রাখতে সাহায্য করেছে, তাঁদের প্রতি কর্তব্য পালনের কথা বললেন অর্থমন্ত্রী।
এরপর নির্মলা যে কর্তব্যের কথা উল্লেখ করেন, তা হল সাধারণ মানুষের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা, যাতে দেশের আর্থিক বৃদ্ধির অংশীদার তাঁরা হতে পারেন। দেশে বহুদিন ধরে কৃষক আন্দোলন চাষের খরচ কমানোর কথা বলেছিল। ঋণের ভারে জর্জরিত কৃষকদের আত্মহত্যার কথা গোটা দেশ জানে। অথচ সার এবং কৃষি পরিকাঠামোয় বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হল। বহুল বিজ্ঞাপিত প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় বরাদ্দ ছিল ১২২৪২.২৭ কোটি টাকা, তা এবছর কমিয়ে হল ১২২০০ কোটি টাকা।
এছাড়াও গত বাজেটে ডাল, সবজি, ফল, শঙ্কর বীজ, মাখানা ইত্যাদি নানা প্রকল্প ঘোষণা করেছিল সরকার। এবার এই প্রকল্পগুলিতে বরাদ্দ শূন্য করেছে কেন্দ্র সরকার। কৃষি পরিকাঠামো এবং কৃষি উন্নয়ন ফান্ডে এ বছর কোনও বরাদ্দই হয়নি। প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ যোজনায় বরাদ্দ ২০,৩০০ কোটি থেকে একটু বেড়ে হয়েছে ২২,৭৪২৯ কোটি টাকা। এবার অর্থমন্ত্রীর বাজেট ভাষণে শ্রমিকদের কথা একবারও উল্লেখ হয়নি। শ্রম এবং কর্মসংস্থান দপ্তরে গত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩২,৬০৬.৯২ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে ব্যয় হয়েছে ১২,৬৫৯.৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষদের দেশের বৃদ্ধির হারের অংশীদার করা হয়নি। এবার এই দপ্তরের বাজেট বরাদ্দ প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে, ৩২,৬২৫.৩৩ কোটি টাকা।
বাড়েনি আশা, অঙ্গনওয়াড়ি, মিড-ডে মিল প্রকল্প। তাহলে শ্রমিক কৃষকদের প্রতিও সরকার কর্তব্য পালন করল না। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী তথ্য সংগ্রহের উপর খুব জোর দিয়েছেন এবং এবিষয়ে এআই ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এই তথ্য সংগ্রহ কাদের স্বার্থে? নিঃসন্দেহে বাজারের স্বার্থে, খরিদ্দারদের স্বার্থে নয়। রেশন ব্যবস্থা জোরদার করতে এবার বাজেটে বরাদ্দ নেই। রেশনের ক্ষেত্রে কেন তথ্য ব্যবহার করা হবে না, তার সদুত্তর নেই। গণবণ্টন ব্যবস্থায় সংস্থান বৃদ্ধির কোনও সম্ভাবনা নেই এই বাজেটে, যদিও বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে দেশ ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে। তাহলে এক্ষেত্রে কেন্দ্র কাদের প্রতি কর্তব্য পালন করছে, তা সহজেই অনুমেয়।
শিল্পক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বায়োফার্মা, সেমিকন্ডাক্টর ইত্যাদি এমন কিছু ক্ষেত্র, যা ইতিমধ্যেই গুটিকয় কর্পোরেটের দখলে। এগুলি কোনভাবেই শিল্প কারখানার উৎপাদনের মৌলিক ক্ষেত্র নয়। তেমনই দেখা গেল কৃষিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নারকেল, বাদাম, চন্দনকাঠ ইত্যাদি উৎপাদনে। এগুলিও কোনভাবেই কৃষির মূল উৎপাদনের মধ্যে পড়ে না। তাই এই বাজেটের পরিধি ক্ষুদ্র। দেশের উৎপাদনের মৌলিক ক্ষেত্রগুলি বাদ দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটি ক্ষেত্রকে বাছাই করে ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে। এই বাজেটে তাই দেশের আমআদমির কথা নেই। যাকিছু হয়েছে, তার প্রায় অধিকাংশই তেলা মাথায় তেল দেওয়ার নামান্তর।








