গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার ভয়াল সত্য
আবীর লাল
পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার আলো আজ গ্রামীণ অঞ্চলে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এক ভয়ঙ্কর বাস্তব সামনে এনেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে গত এক দশকে সাত হাজারেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষা দপ্তরের পরিকল্পনা অনুসারে প্রায় আট হাজারেরও বেশি প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় বন্ধ করার তালিকা ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে আরও বিস্ময়কর তথ্য হল, তিন হাজারেরও বেশি সরকারি বিদ্যালয়ে একজনও পড়ুয়াব বা শিক্ষার্থী নেই। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে এক বছরে ৪০৯টি বিদ্যালয় বন্ধ হয়েছে। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে মোট বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৯৫ হাজারেরও বেশি। এই অধোগতির ধারা চলতে থাকলে গ্রামীণ শিক্ষা ব্যবস্থা অচিরেই ভেঙে পড়বে, আর সমাজের এক বৃহৎ অংশ চিরকালীন অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে যাবে।
বিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পেছনে নানা জটিল কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে মূল কারণ হল দীর্ঘকাল শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকা। রাজ্যের বহু বিদ্যালয়ে প্রায় অধিকাংশ বিষয়েই বিপুল শূন্যপদ রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, গণিত শিক্ষক প্রয়োজনীয় সংখ্যার তুলনায় প্রায় ৩,১৩২ জন কম, পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষকের ঘাটতি প্রায় ১,৭৯৫ জন। বহু বিদ্যালয়ে একজনও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। নিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা কার্যত পাঠ্যক্রম শেষ করতেই পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকেরাও ধীরে ধীরে আস্থা হারাচ্ছেন সরকারি বিদ্যালয়ের ওপর। পরিকাঠামোর দুরবস্থা সমস্যাকে আরও প্রকট করছে। বহু গ্রামীণ বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, শৌচালয় নেই বা ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের জন্য আলাদা টয়লেট নেই। পানীয় জলের অভাব এক ভয়াবহ সমস্যা। অনেক স্কুলে বিদ্যুৎ সংযোগও নেই। পাঠাগার বা বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরি অধিকাংশ জায়গায় অচল, আবার কোথাও ল্যাব থাকলেও ব্যবহার করার মতো সরঞ্জাম নেই। সরকারি পরিদর্শনে উঠে এসেছে, ডিজিটাল পরিকাঠামো প্রায় অনুপস্থিত, ফলে অনলাইন বা হাইব্রিড শিক্ষা চালানো গ্রামীণ এলাকায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমনকি বহু জায়গায় মিড-ডে মিলের জন্য উপযুক্ত রান্নাঘর পর্যন্ত নেই। শিক্ষার জন্য ন্যূনতম যে পরিবেশ প্রয়োজন, তা না থাকায় বিদ্যালয়ে যাওয়া শিশুদের কাছে দিন দিন দুরূহ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনসংখ্যার স্থানান্তর। কাজের খোঁজে বহু পরিবার গ্রাম থেকে শহরে চলে যাচ্ছে। গ্রামে যেসব শিশু রয়ে যাচ্ছে, তাদের অভিভাবকেরাও চায় সন্তানকে ভাল ইংরেজি মাধ্যম বা কর্পোরেট স্কুলে ভর্তি করাতে। বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রসার এবং শহরমুখী প্রবণতা গ্রামীণ সরকারি বিদ্যালয়কে আরও ফাঁকা করে দিচ্ছে। শিক্ষা দপ্তর এই তথ্যের ওপর নির্ভর করে যুক্তি দিচ্ছে যে, যেখানে ছাত্র সংখ্যা ৩০-এর নিচে, সেখানে বিদ্যালয় চালিয়ে যাওয়া অর্থবহ নয়। কিন্তু এই যুক্তি শিক্ষার মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, দূরবর্তী এলাকায় একটি স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে কচিকাঁচা শিশুরা ৫-৭ কিলোমিটার হেঁটে অন্য বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। ফলত তারা মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। সরকারি পরিভাষায় যাকে বলা হচ্ছে স্কুল-ছুট।
বিদ্যালয় অচল হয়ে পড়ার অন্যতম পরিণতি হল শিক্ষার প্রতি অনীহা। যখন কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই, পাঠদান নেই, পরিকাঠামোর ভগ্নদশা, তখন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন জাগে, বিদ্যালয়ে গিয়ে লাভ কী? এই প্রশ্নই এক সময় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ নষ্ট করে দেয়। শিক্ষার্থীরাই ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ে যাওয়া কমিয়ে দেয়। ফলে স্কুলছুট বাড়তে থাকছে। একবার পড়াশোনার শৃঙ্খল ভেঙে গেলে পুনরায় স্বাভাবিক ছন্দে ফেরানো কঠিন।
শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় গ্রামীণ শিশুদের অনেকেই খুব অল্প বয়সে শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে। কাজের খোঁজে তারা ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে, কেউ ইটভাটায়, কেউ চা বাগানে বা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে যুক্ত হচ্ছে। শিশু-শ্রমের এই প্রবণতা শিক্ষার আলো নিভিয়ে দিচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের কথায়, পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকায় শিশুদের সিংহভাগ বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে শ্রমের বাজারে লেগে পড়ছে। ফলে গোটা সমাজ ভবিষ্যতের দক্ষ জনশক্তি বা মানবসম্পদ হারাচ্ছে।
শিক্ষা সংকটের প্রভাব সমাজে নানা স্তরে দেখা যাচ্ছে। শিক্ষাহীনতা মানেই সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি। যেসব পরিবারের সামর্থ্য আছে, তারা তাদের সন্তানকে বেসরকারি কর্পোরেট স্কুলে পাঠাচ্ছে, ফলে তারা সুযোগ পাচ্ছে উন্নত উচ্চশিক্ষার, শহুরে চাকরির। অন্যদিকে গরিব গ্রামীণ পরিবারগুলো সরকারি বিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল, আর যখন সেই বিদ্যালয়ও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা কার্যত নিষ্ক্রিয়, তখন তাদের সন্তানরা অশিক্ষার দুষ্টচক্রে আটকে যাচ্ছে। ফলে ধনী গরিবের ফারাক আরও বাড়ছে। শিক্ষা হয়ে উঠছে পণ্য। মোদ্দা কথা, ফেল কড়ি মাখো তেল।
মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও কম নয়। বিদ্যালয় শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন গড়ে তোলে। কিন্তু বিদ্যালয় যখন অচল, তখন শিশুদের মধ্যে আত্মমর্যাদাহীনতা তৈরি হয়। তারা ভাবতে শুরু করে, শিক্ষা একপ্রকার বিলাসিতা বা আমাদের জন্য শিক্ষা নয়। এই ধারণা তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি হতাশা তৈরি করে, যা সমাজের অগ্রগতির পথে এক বড় বাধা।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই সংকট মারাত্মক। একটি সমাজে যখন যথেষ্ট শিক্ষিত মানুষ নেই, তখন সেই সমাজে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয় না, দক্ষ কর্মী পাওয়া যায় না, আর্থিক উন্নয়নের চাকা থেমে যায়। রাজ্যের বহু গ্রামীণ অঞ্চল ইতিমধ্যেই কর্মসংস্থানের অভাবে পিছিয়ে পড়েছে, তার সঙ্গে শিক্ষার সংকট যোগ হওয়ায় বিপদ দ্বিগুণ বাড়ছে।
তাহলে সমাধান কী? সমস্যার মূলে গিয়ে দেখতে হবে। প্রথমত: শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অবিলম্বে স্বচ্ছ, দ্রুত, স্বাভাবিক ও নিয়মিত করতে হবে। বছরের পর বছর শিক্ষক নিয়োগ আটকে থাকা মানে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। প্রতিটি বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক থাকা আবশ্যক। দ্বিতীয়ত: বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নত করা অপরিহার্য। পানীয় জল, শৌচালয়, বিদ্যুৎ, পাঠাগার, ল্যাবরেটরি, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট — এসব ন্যূনতম সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত: যেখানে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কম, সেখানে ক্লাস্টার ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। অর্থাৎ কাছাকাছি একাধিক বিদ্যালয়কে মার্জ বা সংযুক্ত করে শিক্ষক ও সুযোগ ভাগ করা। এর সঙ্গে থাকতে হবে বিনামূল্যে পরিবহন ব্যবস্থা, যাতে দূরের শিশু বিদ্যালয়ে আসতে পারে। প্রান্তিক অঞ্চলে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ করে শিক্ষা সুরক্ষা জরুরি। জঙ্গলমহল, সীমান্ত বা ছিটমহলের মতো এলাকায় সরকারি সহায়তা ও বাজেট বরাদ্দ দ্বিগুণ করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার গুণমান বাড়াতে আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে পাঠ্যক্রম সাজানো জরুরি। মনিটরিং ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে হবে। UDISE, DISE বা NCERT-এর PARAKH রিপোর্টে যে সমস্যাগুলি ধরা পড়ছে, সেগুলিকে দ্রুত সমাধানের জন্য জেলা ও ব্লক পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিদ্যালয়গুলির বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নিলে সমস্যা আরও বাড়বে।
শিক্ষাকে শুধু সরকারি দপ্তরের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজকেও অংশীদার করতে হবে। স্থানীয় পঞ্চায়েত, এনজিও, সামাজিক সংগঠন, এমনকি বিদ্যালয় সংস্কা ও মানোন্নয়নে কর্পোরেট CSR অর্থও ব্যবহার করা যেতে পারে। স্কুল শিক্ষা নিয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং শিক্ষা আমাদের মৌলিক অধিকার — এই বার্তা প্রতিটি পরিবারে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।








