গলাগলির চেয়ে গালাগালির পারদ ঊর্ধমুখী
মোহাঃ সাদেকুল ইসলাম
২৬-এর ফুটবল বিশ্বকাপ আসন্ন। বছর বাদে বল গড়াবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর মাঠে। মাঠের ঘাস যতই মোলায়েম হোক, চুঁইয়ে পড়া বৈভব ও আনন্দোচ্ছ্বাস যতই সুখকর হোক, অঘটন ঘটবেই। জ্যোতিষবিদ্যার জ্ঞান নিয়ে বলছি না, তবে পুরাতন অভিজ্ঞতালব্ধ ঘটনা দেখে এমন ধারণার কথা বলছি। মাঠের মাঝে শিল্পের লাগালাগি গতি যেমন দেখা যাবে, অপ্রীতিকর ঘটনারও সাক্ষী থাকবে আমাদের দু’চোখ। মনের সঙ্গে গায়ের ও পায়ের জোরের পাশাপাশি মুখের জোরটাও চলবে। মুখের জোর হল, বিপক্ষ খেলোয়াড়কে গালি দেওয়া। জিদান ঢুসোর কথা ফুটবল ক্রীড়ামোদীরা আজও ভোলেননি। ইতালিয়ান খেলোয়াড় মাতরাজ্জিকে ঢুসো মেরে লালকার্ড খেয়ে মাঠ ছাড়লেন জিদান। হিরো থেকে ভিলেন হলেন রাতারাতি। সাফল্য ও ফর্মের চূড়ান্ত শিখরে থাকা খেলোয়াড় এমন কু-কীর্তি ঘটালেন কেন? জিদানের মেজাজ বিগড়ে সাফল্য তুলে নিতে চেয়েছিলেন মাতরাজ্জি। বিশেষ অস্ত্রবলে সফল হয়েও ছিলেন তিনি। সেই মহাস্ত্রের নাম ‘গালি’। জিদানের বোনকে গালি দিয়ে সাফল্য হাসিল করেছিলেন কৌশলী এই ইতালিয়ান খেলোয়াড়।
গালির আশ্চর্য ক্ষমতা। অপরজনকে হারিয়ে দিতে পারে। অপর জনের মনে ‘আমি হেরে গেলাম’ এই ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। লঙ্কার ঝাল মাপার একক আছে। গাল মাপার একক নেই। তা যদি থাকত, অভিশাপের পাল্লা থেকে গালির পাল্লা ভারী হত। কাউকে অভিশাপ খেয়ে মরতে দেখা যায় না, কিন্তু গালাগালি খেয়ে লড়তে দেখা যায় হামেশাই। গালিদাতাকে যতটা ফুরফুরে দেখা যায়, গালিগ্রহীতা ততটাই বিমর্ষ থাকেন।
আজকাল গালিদাতা বেড়েছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গালির সংখ্যাও। ‘বাঁদর’ , ‘গাধা’ বলার যুগ আর নেই। গায়ে ফোস্কা ধরানো গালও যেন এখন অনেকটা পানসে। এক-লক্ষ্য গাল, গুষ্টি-সমষ্টি গালও আজ ব্রাত্য হয়েছে গালিদাতাদের মুখে। জাতিকেন্দ্রিক গাল সমাজের দখল নিয়েছে, যা ষোল আনাই সংক্রামক। ফলত বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে সুপারসনিক গতিতে। পূর্বের কিছু অপশব্দের গাল বমনোদ্রেকী ছিল; কিন্তু বর্তমানের গাল ঈর্ষা আর বিদ্বেষ দুই-ই উদ্রেক করে। প্রধানমন্ত্রীর মা, রাহুল গান্ধীর মা, শশী থারুদের স্ত্রী — নানাজনে গালিবাণে আক্রান্ত।
ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপে ইউনিভার্সিটির কিছু ছাত্র-ছাত্রী আজ এই গালাগালির গবেষক। সরব গালির তুলনায় নীরব গালিরও পোষক এরা। নীরব গালে তুলনামূলক দূষণ কম। সরব গালে তীব্র। সমাজে আট থেকে আশি সবাই দূষিত হচ্ছে সরব গালির বদৌলতে। সমাজে দূষণ কম হলেও কিন্তু নীরব গালি কর্কটরোগ। সামান্য অংশ থেকে শুরু করে সমাজের পূর্ণাংশ সংক্রামিত করে ফেলেছে। এই গালিদাতারা নিজের নামে, অপরের নামে ফেক আইডি খুলে অন্যকে খিস্তি বা গালি দিয়ে যাচ্ছে দেদার দিলে। তারা বিষয় না পেয়ে আজ ব্যক্তিকে আক্রমণ করছে। আত্মস্বার্থে আঘাত লাগলে একটা বিশেষ সম্প্রদায়কে আক্রমণ করছে। তলিয়ে দেখলে এ সত্য উদঘাটিত হবে যে, তাদের কেউ ছদ্ম দেশপ্রেমিক, কেউ-বা উগ্র দেশপ্রেমিক। এই দুইয়ের ষাঁড়াষাঁড়ি আক্রমণে পবিত্র-পুণ্যভূমি ভারতাত্মা চোখের জলে নীরবে ক্রন্দন করে চলেছে। অপরদিকে, গালি-খাওয়ার দল মনের অন্তর্দেশে বলগ-ওঠা দুধের মতো টগবগ ফুটে চলেছেন।
এই গালি-সংস্কৃতি বজায় রাখার বা গালি দেওয়ার প্রবণতার উৎসভূমি কী? গালি দেওয়ায় লাভ আছে, নাকি ক্ষতি — তা বিশদে আমরা বলতে পারি না, এটা সমাজবিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যার বিষয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আজ বেঁচে থাকলে হয়ত (কারো দ্বারা প্ররোচিত হলে) বলতেন, ”এক গালে সফল হাতে হাত / অপর গালে বিপক্ষ কুপোকাত”। তবে দেশ, দশ ও জাতির সুশীল মনোভাব বজায় রাখার স্বার্থে এক চিলতে বাক্যব্যয় করে বলতেই পারি, গালি কাঙ্ক্ষিতবস্তু ও ইপ্সিত বাসনা লাভের ঘৃণ্যতম মাধ্যম। খোলা চোখে ক্ষতির খতিয়ান সহজ দৃশ্যমান। হয়ত কোনো গালিদাতা শাণিত যুক্তিনির্ভর পক্ষাবলম্বন করবে। সাপের বিষ মানুষের মরণ আনে, আবার এই বিষই প্রাণ বাঁচায়। তাই বলা হয় বিষে বিষে বিষ-ক্ষয়। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। মোদ্দা কথা, গালি দিয়ে কার্য হাসিল।
তবে দেখে ও ঠেকে মানবসমাজ যেটুকু বুঝতে পেরেছেন তা হল, অপ্রাপ্তি থেকে হিংসার সৃষ্টি, আর হিংসা প্রকাশের বাহন রূপে খিস্তি-গালাগালির আগমন। এটিই উৎসভূমি। সুশীল সমাজ গালি খাওয়ার চেয়ে গালি দিতে ভয় করে বেশি। কারণ, তাঁদের সামাজিক বোধটাই আলাদা। অপরদিকে, ন্যাংটার নেই কাপড়ের ভয়, গালিদাতারা নিজেদের ভাবমূর্তি নষ্টের কথা কখনোই ভাবে না। না বাস্তবে, না স্বপ্নে। কারণ, কটূকাটব্য তাদের ধাত সওয়া হয়ে গেছে। গৃহহীনের ঘর পোড়ার ভয় থাকে না।
ডিজিটাল গালির সিংহ-থাবায় বিবেকবান মানুষ মর্মাহত। মোবাইল-পর্দা, টেলিভিশন-পর্দা ও সেলুলয়েড-পর্দা সর্বত্রই গালিগালাজের রমরমার তাণ্ডবনৃত্যে সুশীল মানব আতঙ্কিত, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘মোল্লার বাচ্চা’ থেকে শুরু করে ‘সোনাটুনির বাচ্চা’ পর্যন্ত প্রাথমিক বিস্তৃতি। ক্রমে সিঁড়ি বেয়ে গালির পারদ বিছানা পর্যন্ত উঠেছে। এতদিন বাবা-মায়ের নামে গালি দিয়ে যারা ক্ষান্ত হত, এই ফাঁকে গালির উচ্চ শংসাপত্র হাসিল করে আরও উন্নততর বা উন্নত মানের গালি আবিষ্কার করেছে। সাধারণ মানুষ তো দূর ছাই, দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্নেল সোফিয়া কুরেশি, উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিং ছাড়াও ভারতীয় বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রিকে ইয়ত্তাহীন গালি হজম করতে হয়েছে সম্প্রতি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ নবাবিষ্কৃত প্রতিষেধক-ঔষধের সাফল্যমান বিচারে গিনিপিগ কী বাঁদর জাতীয় ইতর প্রাণিতে প্রয়োগ ঘটান। ঠিক তেমনি, গালদোষ-দুষ্ট দূষকের দল আবিষ্কৃত গালের তেজস্ক্রিয়তা মাপতে বিশেষ সম্প্রদায় ও সেক্যুলারদের ওপর প্রয়োগ ঘটাচ্ছে।
কোনো এক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছাত্র চূড়ান্ত সাফল্যের সঙ্গে এইচ.এস পাস করে টগবগ আনন্দে ফুটছেন, হঠাৎ তার মন-প্রাণের ওপর ঘটে গেল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। তার মোবাইল স্ক্রিনে একের পর এক ধেয়ে এল মিসাইল হামলা। দেখো বাবা, বিন লাদেনের মতো নাম উজ্জ্বল করতে যেও না। আরেক অস্ত্র এল, যাই হোস হবি, কিন্তু জঙ্গী হতে যাস না। আর এক গালের অস্ত্র, ভাল রেজাল্ট করে কী হবে? ক’দিন পর তো টেররিস্ট হতে হবে। আরেক অস্ত্র, মাদ্রাসা ছেড়ে স্কুলে তুমি কেন? আর এক অস্ত্র, বোমা ভাবতে শিখে নিয়ো।
হিংসা জয় ভালবাসায়, স্বতঃসিদ্ধ কথা। মেরেছ কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দেব না? স্যাকরার ঠুকঠুক, কামারের এক ঘা। হ্যাঁ, দূষকের অস্ত্র গালাগালি, তো সুশীলের অস্ত্র গলাগলি। অর্থাৎ, ঘৃণা-বর্জ্য ত্যাগ করে প্রেম-ভালবাসা, সদ্ভাব-সম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িক মনোভাব আনয়ন আবশ্যক। সমাজে সুশীলের অভাব নেই। তাঁদের থেকেই এসেছে সাহসের রসদ ও সত্যবাণী। সে আক্রান্ত ছাত্রের কাছে এসেছে সংখ্যাগুরুদেরই অমৃত বাণী। অভিনন্দন ! অনেক বড় হও। যা কিছু খারাপ শুনলে মনে রেখো না। এগিয়ে যাও। আরেক উজ্জীবনী মন্ত্র, এই উগ্র ধর্মান্ধদের কথায় মন খারাপ কোরো না। আমরা আছি তোমার সাথে। আরেক জনের বাণী-উপহার, এ ধরনের বিষাক্ত চিন্তাধারা বাঙালির মধ্যে ছিল না। আজ জাত-ধর্ম তুলে যারা তোমাকে গাল-মন্দ করল, জীবনে তারা একটি ধর্মগ্রন্থও পড়েছে বলে মনে হয় না।
আর বিস্তৃতি নয়। স্মরণ রাখা উচিত, বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘লোকহিত’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘মরার বাড়া গালি নাই’। পরক্ষণেই বলেছেন, আছে। তা হল, ‘বাঁচিয়া মরা’। জীবিত অবস্থাতেই যাদের মরণ ঘটেছে, তার ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন। শেষকথা এই, গাল খেয়ে কারও পেট ভরতে পারে, কিন্তু গাল দিয়ে তোমার না পেট, না মন — কিছুই ভরবে না। শূন্য। তুমি বেঁচে আছ, কিন্তু মরে গেছ। তুমি সাগরজলের অন্তঃসারহীন লবণাক্ত ফোসকা। অপরের পিপাসা নিবারণ তোমার কম্ম নয়।








