সম্প্রীতির সংবিধান, ঘৃণার রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার সংকট
পাশারুল আলম: ভারতবর্ষ হল বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। সেই গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি হল ধর্মনিরপেক্ষতা, যা কেবল একটি সাংবিধানিক শব্দ নয়; বরং বহু ভাষা, বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতির এই দেশকে একসূত্রে বাঁধার ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটির অন্তর্ভুক্তি সেই অঙ্গীকারেরই লিখিত রূপ। কিন্তু সাম্প্রতিক এক দশকে, বিশেষত ২০১৪ সালের পর থেকে, ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে রাজনৈতিক বক্তৃতা, প্রশাসনিক নীতি এবং সামাজিক আচরণ — তিন স্তরেই।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সাম্প্রতিক বক্তব্য ‘“মিয়া মুসলমানদের যতটা সম্ভব হয়রানি করুন’ — এই সংকটের এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। এটি কোনও বিচ্ছিন্ন বা আবেগতাড়িত মন্তব্য নয়; বরং ক্ষমতার শীর্ষে বসে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, বৈষম্য ও নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা। একজন শীর্ষ সাংবিধানিক পদাধিকারীর মুখ থেকে এমন বক্তব্য শুধু ঘৃণামূলক নয়, গণতন্ত্র-বিরোধীও বটে।
‘‘মিয়া’ মুসলমান’ শব্দ অসমে মূলত বাংলাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যবহৃত হয়। এই জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, এটি কোনও আকস্মিক উক্তি নয়। ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল রিভিশন বা এসআইআর-এর নামে চার থেকে পাঁচ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়তে পারে — এই ঘোষণা সরাসরি ভোটাধিকার হরণের ইঙ্গিত দেয়। বিজেপি কর্মীদের ফর্ম-৭ ব্যবহার করে অভিযোগ জমা দেওয়ার আহ্বান আসলে বেছে বেছে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিকত্বের প্রান্তে ঠেলে দেওয়ার হীন কৌশল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক বয়কটের প্রকাশ্য আহ্বান — রিকশা ভাড়া কম দেওয়া, শুধুমাত্র ‘মিয়া’দের নোটিশ পাঠানো, যা সামাজিক নিপীড়নের এক বিপজ্জনক রূপ।
এই রাজনীতি কেবল অসমেই সীমাবদ্ধ নয়; উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বক্তব্য ও নীতিতেও একই প্রবণতা স্পষ্ট। ‘লাভ জিহাদ’, ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’ কিংবা ‘হালাল ষড়যন্ত্র — এই শব্দবন্ধগুলি রাজনৈতিক পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করে মুসলিম সমাজকে পরিকল্পিতভাবে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। ২০২৫ সালে হালাল সার্টিফিকেশনকে সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মান্তরণের অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত করে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কেবল ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; লক্ষাধিক মুসলিম ব্যবসায়ীর জীবন ও জীবিকার উপর সরাসরি আঘাত।
এই ধরনের বক্তব্য মুসলিমদের কেবল ‘ভিন্ন’ নয়; ‘শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করে। ২০১৪ সালে যোগীর “একটি হিন্দু মেয়ের বদলে ১০০ মুসলিম মেয়ে” সংক্রান্ত মন্তব্য, বা ২০২০ সালে মুসলিমদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা — সবই এক বৃহত্তর বয়ানের অংশ, যেখানে সংখ্যালঘুদের দেশপ্রেম সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়।
পরিসংখ্যান এই বাস্তবতাকে আরও নির্মমভাবে তুলে ধরে। ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে ঘৃণামূলক বক্তব্যের ঘটনা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। প্রতিদিন গড়ে চারটি হেট স্পিচের ঘটনা ঘটছে, যার প্রায় ৯৮ শতাংশই মুসলিমদের লক্ষ্য করে। এই ঘটনাগুলির ৮৮ শতাংশ বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে সংঘটিত হয়েছে। শুধু মুসলিম নয়, খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে আক্রমণের ঘটনাও ২০১৪ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে প্রায় ৫৫০ শতাংশ বেড়েছে। শিখ সম্প্রদায়কে ‘খালিস্তানি’’ তকমা দেওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে — রাষ্ট্র কি তার নিরপেক্ষতা হারাচ্ছে? যখন শাসক দলের নেতারা প্রকাশ্যে ঘৃণাকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন তার প্রভাব সমাজের গভীরে পৌঁছে যায়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধার মুখে পড়ে, এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে স্থায়ী অনিশ্চয়তায় থাকে। এর ফলে শুধু একটি সম্প্রদায় নয়; গোটা সমাজের গণতান্ত্রিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
সংবিধান আমাদের যে ‘গঙ্গা-যমুনা তেহজিব’ বা সংস্কৃতি’র কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে সহাবস্থান, সহনশীলতা ও বহুত্ববাদ ভারতের শক্তি, সেই ঐতিহ্য আজ গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়; বরং সব ধর্মের প্রতি সমান সম্মান। এই মৌলিক সত্যটি ভুলে গেলে ভারত তার আত্মাকেই হারাবে।
আজ এই সময়ে আদালত, নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী মহল এবং সাধারণ মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘৃণামূলক বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক মতামত’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সুপ্রিম কোর্টের উচিত সংবিধানের রক্ষক হিসেবে প্রয়োজনে সুয়ো-মোটো হস্তক্ষেপ করা। একই সঙ্গে সমাজের প্রতিটি স্তরে এই বিষোদ্গারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলা জরুরি।
প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার কাছে, আমরা কেমন ভারত চাই? একটি ভয় ও বিভাজনের ভারত, না কি ন্যায়, সমতা ও ভ্রাতৃত্বের ভারত? উত্তর নির্ভর করবে আমাদের নীরবতার ওপর নয়; আমাদের অবস্থানের ওপর। ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা করা কোনও একক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব নয়; এটি ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। এই লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়লে, ‘সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা’ ভারতের স্বপ্ন ঘৃণার দাবানলে পুড়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না।








