শেরে বাংলা ফজলুল হক ও বাংলার রাজনীতি
ওয়াহেদ মির্জা
সিপাহী বিদ্রোহের ১৬ বছর পর ও জাতীয় কংগ্রেস পার্টি তৈরির ১২ বছর পর বাংলা ও বাঙালি জাতির জননায়ক শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক এর জন্ম ১৮৭৩ সালের ২৯ অক্টোবর বর্তমান বাংলাদেশের বরিশালের সাতুরিয়া গ্ৰামে মামার বাড়িতে। তাঁর আদি পৈতৃক নিবাস বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখার গ্রামে। পিতা খ্যাতনামা উকিল কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ এবং মাতা সাইদুন্নেসা খাতুনের একমাত্র পুত্র তিনি। শেরে বাংলার প্রাথমিক শিক্ষা মাদ্রাসায়৷ পরে তিনি বরিশাল জেলা স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৮৮৯ সালে বিশেষ কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রাস পাস করেন৷ প্রথম বিভাগে আই.এ পাস করে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৮৯৩ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে বি.এ অনার্স পাস করেন৷ ১৮৯৫ সালে গণিতশাস্ত্রে এম.এ করেন৷ প্রসঙ্গত আজও যেমন পশ্চিমবঙ্গে শোনা যায়, মুসলমানদের মেধা নেই, তাই চাকরি হয় না৷ তখনকার যুগে এ.কে ফজলুল হক সাহেবকেও এই রকম কথা শুনতে হয়েছিল৷ মুসলমান ছাত্ররা গণিত, বিজ্ঞান নিয়ে পড়ে না। কারণ, তারা মেধাবি নয়। একথা শুনে ফজলুল হকের প্রবল জিদ চেপে যায়। তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, গণিতশাস্ত্রেই পরীক্ষা দেবেন। এরপর মাত্র ছয় মাস গণিত নিয়ে পড়েই ফার্স্ট ক্লাস পান। পিতার পরামর্শে তিনি আইন কলেজে পড়েন এবং ১৮৯৯ সাল থেকে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন৷ এর পর ১৯০৬ সালে বাংলায় ব্রিটিশ সরকারের অধীনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি পান৷ ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা হয় জাতীয় কংগ্রেস৷ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ কংগ্রেসের মধ্যেও শুরু থেকেই লালিত পালিত হতে থাকে৷ এই পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ধীরে ধীরে বিনষ্ট হতে থাকে। এরই মাঝে ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ নিয়ে বাংলার জনগণ বিভক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিপরীতে গড়ে ওঠে মুসলিম জাতীয়তাবাদ৷ পরিণতিতে ১৯০৬ সালে তৈরি হয় মুসলিম লীগ৷ ফজলুল হক ১৯১১ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ওই বছরই বঙ্গ বিভাগ রদ হয়৷ এই সময় লর্ড হার্ডিংয়ের শাসনামলে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়।

এই সংকটময় মুহূর্তে বাংলার ভাগ্যাকাশে রাজনৈতিক দিশারি হিসেবে আবির্ভূত হলেন এ.কে ফজলুল হক৷ ১৯১২ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেন তিনি কলকাতায় কেন্দ্রীয় মুসলিম শিক্ষা সমিতি গঠন করেন৷ ১৯১৩ সালে সর্বপ্রথম ঢাকা বিভাগ হতে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৪ থেকেই জমিদার ও মহাজন শ্রেণির বিরুদ্ধে প্রথম সংগ্ৰামের সূচনা করেন৷ ১৭৯৩ সালে যখন বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন হয়, ফলে এদেশে ইংরেজের একদল অনুগত জমিদার গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়৷ এই জমিদারদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কলকাতার ভদ্রলোকেরা ১৮৩৮ সালে গড়ে তোলে ল্যান্ডহোল্ডার’স সোসাইটি নামে এক রাজনৈতিক সংগঠন৷ অনুকম্পায়ী ফজলুল হক বুঝেছিলেন, যদিও কৃষককুলের অধিকাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত এবং জমিদারদের অধিকাংশ উচ্চবর্গীয় হিন্দু, তবুও সমস্যাটা কিন্তু সম্প্রদায়-ভিত্তিক নয়, শ্রেণিগত। তাই তিনি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের উচ্চবর্ণ ও অভিজাত শ্রেণির এলিটিজম বা অভিজাত গোষ্ঠীর রাজনীতি ভেঙে বাংলার রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর ও জমিদারী অত্যাচার নির্মূলের পথিকৃৎ হয়ে উঠেছিলেন৷ এই সময় ১৯২৯ সালে স্যার আবদুর রহিম “নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি” গঠন করেন৷ ১৯৩৫ সালে এ.কে ফজলুল হক এই দলের সভাপতি নির্বাচিত হন৷ ১৯৩৬ সালে প্রজা সমিতির নতুন নামকরণ হয় “কৃষক প্রজা পার্টি”৷ এই পার্টি গঠনের মাধ্যমে বাংলার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আন্দোলনের গতি-প্রকৃতিতে পরিবর্তন আসে৷ এছাড়া তিনি রাজনৈতিক অনেক পদে অধিষ্ঠান করেছেন৷ তার মধ্যে কলকাতার মেয়র (১৯৩৫), অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৭-১৯৪৩), বাংলার শিক্ষামন্ত্রী (১৯৪২), পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী (১৯৫৪), পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৫৫), পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (১৯৫৬-১৯৫৮) ইত্যাদি অন্যতম।

আমরা জানি ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী বাংলায় জমিদার, মজুতদার ও মহাজন শ্রেণি সৃষ্টি করে এবং ১৮৩৫ সালে ভারতের রাষ্ট্রভাষা ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা প্রবর্তিত হয়। তখন একদিকে যেমন হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম চলতে থাকে, অন্যদিকে তেমন ইংরেজের অনুগত দলও তৈরি হয়৷ এই অনুগত দলের নব্য শিক্ষিত হিন্দুরা সিপাহী বিদ্রোহকে সমর্থন না করায় এরা ব্রিটিশের বেশি আস্থাভাজন হয়ে ওঠে৷ সরকারি চাকরি দখল করে৷ এই সময় মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার ও চাকরি ক্ষেত্রে বড় বাধা ছিল৷ ইতিপূর্বে মুসলমানদের শিক্ষক পদে নিয়োগ করা হত না৷ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উদ্যোগে ব্রিটিশ আমলে বাংলায় সাম্প্রদায়িক বিভেদ নিরসনের লক্ষ্যে ১৯২৩ সালে বেঙ্গল প্যাক্ট চুক্তি হয়।

এদিকে ফজলুল হক মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য বেকার হস্টেল, কারমাইকেল হস্টেল এবং আজকের মাওলানা আজাদ কলেজ-সহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করেন৷ প্রাদেশিক সরকারে ৫৪ শতাংশ চাকরির সুযোগ মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষণ করেন৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্ত সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলিম ছাত্রদের জন্য আসন সংরক্ষণ, বাংলায় মাদ্রাসা শিক্ষার পুনর্গঠন এবং গ্রামীণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করেন। তাছাড়া তখন মুসলমান ছাত্রদের সংস্কৃত পড়তে হত৷ তিনি মুসলমানদের শিক্ষার প্রতি আগ্ৰহ বাড়াতে আরবি শিক্ষা চালু করেন এবং সরকারি স্কুলে মুসলমান শিক্ষক ও একজন মৌলভী রাখতে হবে – এই নিয়ম লাগু করেন৷ তিনি কিন্তু মোটেই হিন্দু-বিদ্বেষী ছিলেন না৷ শিক্ষাক্ষেত্রে হিন্দু মুসলিম সাম্য প্রতিষ্ঠার্থে পরীক্ষার খাতায় নামের পরিবর্তে ক্রমিক নম্বর লেখার নিয়ম প্রবর্তন করেন৷ ফলে মুসলমান ছাত্রদের পাসের হার বাড়তে লাগল৷ কিন্তু বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে আবার পরীক্ষার খাতায় নাম লেখা ও ইন্টারভিউতে বৈষম্য করা হচ্ছে৷ মাদ্রাসার সিলেবাসে আরবি ভাষা শিক্ষা থাকলেও উচ্চ শিক্ষার জন্য জেলার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরবি ডিপার্টমেন্ট নেই, আরবি শিক্ষক নিয়োগ এবং সাম্প্রতিক ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে বঞ্চনা ও অবহেলার ছবি স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে৷
![]()
আজকের পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরি ও রাজনৈতিক অংশিদারিত্বে মুসলমানদের ক্ষমতাহীন করে রাখার প্রয়াস চলমান৷ স্বাধীনতার ৭৮ বছর পর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানরা কেন দুর্দশাগ্রস্ত, বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার — এ বিষয়ে আওয়াজ ওঠে না তথাকথিত সেক্যুলার রাজনৈতিক দলগুলো থেকে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের এলিটিজম রাজনীতির শিকার হচ্ছে বাঙালি মুসলমান ও নিম্নবর্ণীয় হিন্দুরা৷ তাই এই উচ্চবর্ণ নিয়ন্ত্রিত ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে বাঙালি হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হকের ন্যায় নেতার শূন্যতা আজও বাংলার রাজনীতিতে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।








