সালাহ্ উদ্দিন আইয়ুবীর জেরুসালেম পুনরুদ্ধার
মোহাম্মদ সলিমুল্লাহ
১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর সুলতান সালাহ্ উদ্দিন আইয়ুবী জেরুসালেম পুনরুদ্ধার করেন। কিংবদন্তী সেই ইতিহাস আমাদের সকলেরই কম-বেশি জানা। কিন্তু যুদ্ধের পর ক্রুসেডার খ্রিস্টানরা পরস্পরের প্রতি যে হৃদয়বিদারক আচরণ করেছিল- তা কি জানেন? তারা এই ইতিহাস চেপে যায়।
পূর্বকথা- ১০৯৯ সালের ১৫ এপ্রিল ক্রুসেডাররা জেরুসালেম দখল করতে সক্ষম হয়। তারপর তারা যেখানে যাকে পেয়েছে, তাকেই কেটে টুকরো টুকরো করেছে। রেমন্ড এজিলেস নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী উল্লেখ করেন- “মসজিদের বারান্দায় হাঁটু পরিমাণ রক্ত জমেছিল এবং তা ঘোড়ার লাগাম পর্যন্ত স্পর্শ করেছিল”।
মুসলিমদের অনুরূপ ভাগ্যবরণ করতে হয় ইহুদীদেরও। অতীত রীতি অনুসরণে ইহুদী প্রবীণরা নগরীর সমস্ত ইহুদীকে প্রধান সিনাগগে জড়ো হয়ে প্রার্থনায় নিমগ্ন হতে নির্দেশ দেন। তারা ক্রুসেডারদের কাছে তেমন আচরণ প্রত্যাশা করেছিল, যেমনটি বিজয়ী মুসলিমরা করে থাকে। কিন্তু এটা ছিল এক প্রাণঘাতী ভুল।
ধর্মোন্মাদ খ্রিস্টানরা সিনাগগের চতুর্দিক ঘিরে ফেলে এবং আগুন লাগিয়ে দেয়। একটি শিশুও যেন পালিয়ে যেতে না পারে- সেদিকে কড়া নজর রাখে। ফলে হাজার হাজার ইহুদী নর-নারী, শিশু-বৃদ্ধ জীবন্ত পুড়ে মারা যায়। এই কৃতকর্মের জন্য ২০০০ সালের ১২ মার্চ ভ্যাটিকানের পোপ ইহুদীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন।
যুদ্ধের কাহিনী- ১১৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সালাহ্ উদ্দিন আইয়ুবী জেরুসালেম অবরোধ করেন। তার তীরন্দাজরা রামপার্ট দিয়ে একনাগড়ে তীর নিক্ষেপ করে ক্রুসেডারদের অস্থির অবস্থায় রাখে। এরই মাঝে বেলফ্রাই দিয়ে দুর্গের দেওয়াল অতিক্রম করার চেষ্টা চলতে থাকে, কিন্তু ৬ দিন পর্যন্ত তা সফল হয়নি।
২৬ সেপ্টেম্বর সালাহ্ উদ্দিন তার সেনাদের অবস্থান মাউন্ট অব অলিভ-এ উঁচু পাহাড়ে স্থানান্তর করেন। এদিক দিয়ে দুর্গের কোনো গেট না থাকায় ক্রুসেডারদের তৎপরতার সুযোগ ছিল না। মুসলিমরা এখান থেকে সিজ ইঞ্জিন, ক্যাটাপল্ট, ম্যাঙ্গনেল, পেট্রারি, গ্রীক ফায়ার ও তীর-ধনুক দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন আঘাত করতে থাকেন।
এদিকে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্রুসেডে অংশগ্রহণের জন্য শহরে বিপুল পারিশ্রমিক ঘোষণা করা হয়, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। পাদ্রিরা খালি পায়ে মিছিল শুরু করেন। নারীরা মাউন্ট ক্যালভারি’তে উঠে তাদের শিশুদের চুল কামিয়ে মাথা ন্যাড়া করে দেন এবং ঠাণ্ডা পানিতে গলা সমান পানিতে দাঁড় করিয়ে রাখেন। কিন্তু কিছুই কাজে আসেনি।
ফলাফল- ৩ দিনের ক্রমাগত আঘাতে ২৯ সেপ্টেম্বর দুর্গ প্রাচীরের একটি অংশ ভেঙে পড়ে। হতাশায় নিমজ্জিত সৈন্যরা মুসলিম বাহিনীকে আর প্রতিহত করতে পারেনি। নিরুপায় সেনাপতি বালিয়ান আত্মসমর্পণ প্রস্তাব করেন। সালাহ্ উদ্দিন আইয়ুবী জবাব দেন, তিনি যুদ্ধ করে শহর দখল করেছেন। সুতরাং, পরাজিতদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ গ্রহণ করবেন। এসময় দুর্গের দেওয়ালে মুসলিমরা পতাকা তুলতে গেলে ক্রুসেডাররা তা প্রতিহত করে। সালাহ্ উদ্দিন আইয়ুবী সেদিকে বালিয়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বালিয়ান বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংস, শহরের সকল মুসলিমকে সপরিবারে হত্যা, ৫ হাজার মুসলিম দাসকে হত্যা এবং শহরের সমস্ত সম্পদ পুড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেন।
ক্ষিপ্ত সালাহ্ উদ্দিন আইয়ুবী প্রত্যেক ক্রুসেডার পুরুষদের উপর দশ, নারীদের পাঁচ ও শিশুদের উপর দুই দিনার করে মুক্তিপণ আরোপ করেন এবং যারা তা পরিশোধ করবে না, তারা দাস হয়ে থাকবে- এই ঘোষণা করেন। এপর্যায়ে বালিয়ানের সুর নরম হয়। তার অনুনয়ের পর ৩০ হাজার দিনার ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সকল ক্রুসেডারকে মুক্তি দেয়া হয়।
ক্রুসেডাররা ২ অক্টোবর আত্মসমর্পণ করে। ১০৯৯ সালে তারা এই শহর দখল করে ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ রক্তবন্যা বইয়ে দিয়েছিল; আজ তার কোনো প্রতিশোধ নেয়া হল না। ৫ হাজার মুসলিম বন্দী দাসকে মুক্ত করা হল। আর, ‘ডোম অফ দ্য রক’ এর উপর থেকে ক্রুসেডারদের স্থাপিত স্বর্ণের ক্রসটি নামান হয়।
ক্রুসেডের প্রতি উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য বাইজেন্টাইন রানি শহরে অবস্থান করছিলেন। তার রেটিনিউ ও সহযোগীদের নিয়ে শহর ত্যাগ করার অনুমতি দেয়া হয়। নাবলুসে বন্দী জেরুসালেমের রাজা গাই অব লুজিনানের স্ত্রী রাণী সিবিলা-কে তার স্বামীর সাথে দেখা করার নিরাপদ পথ করে দেয়া হয়। স্থানীয় খ্রিস্টানদের শহরে থাকার অনুমতি দেয়া হয়।
ক্রুসেডাররা কপটিকদের জেরুসালেমে প্রবেশ করতে দিত না। সালাহ্ উদ্দিন আইয়ুবী তাদের প্রবেশের অনুমতি দেন। কপটিক উপাসনালয়গুলো ক্রুসেডাররা চার্চে পরিণত করেছিল; সেগুলো কপটিকদের ফিরিয়ে দেয়া হয়। সকল অঞ্চলের ও মতাদর্শের খ্রিস্টানদের বিনাশুল্কে জেরুসালেম পরিদর্শন করার অনুমতি দেয়া হয়।
খ্রিস্টানরা ধরে নিয়েছিল যে, জেরুসালেমে ক্রুসেডের কেন্দ্রবিন্দু- চার্চ অফ দ্য হোলি সেপুলচার ধ্বংস করা হবে। তারা ঐ চার্চ খালি করে ফেলেন ও বন্ধ করে দেন। কিন্তু সালাহ্ উদ্দিন আইয়ুবী হযরত উমর (রাঃ) এর আদর্শ অনুসরণ করেন। বাইজেন্টাইন সম্রাট আইজ্যাক এঞ্জেলাস সালাহ্ উদ্দিন আইয়ুবীকে পত্র পাঠিয়ে অভিনন্দন জানান।
খ্রিস্টানদের দুর্দশা- শরণার্থী খ্রিস্টানরা টায়ার-এ চলে যান। কিন্তু সেখানকার ক্রুসেডার শাসক কনরাড শুধু যুদ্ধ করতে সক্ষম পুরুষদের গ্রহণ করেন এবং অবশিষ্টদের ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণাধীন ত্রিপোলি কাউন্টিতে চলে যেতে আদেশ দেন। তারা ত্রিপোলিতে পৌঁছলে ক্রুসেডাররা তাদের সমুদয় সম্পদ লুঠ করে এবং তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়।
নিরুপায় খ্রিস্টানরা কেউ আর্মেনিয়া, কেউ এন্টিওক যান এবং কেউ-বা জেরুসালেমে ফিরে যান। অনেকে আলেকজান্দ্রিয়ায় পালিয়ে যান। আলেকজান্দ্রিয়ার মুসলিমরা তাদের আশ্রয় দেন। ১১৮৮ সালে মার্চ মাসে ইতালীর পিসা, জেনোয়া ও ভেনিস থেকে আলেকজান্দ্রিয়ায় বাণিজ্য জাহাজ এলে তারা তাতে আরোহন করতে যান। কিন্তু শরণার্থীদের অর্থ না থাকায় জাহাজের ক্যাপ্টেনরা তাঁদের তুলতে অস্বীকার করে। তখন আলেকজান্দ্রিয়ার আইয়ুবী গভর্নর ঐ শরণার্থীদের জাহাজে গ্রহণ ও তাঁদের প্রতি সু-আচরণের শর্তে বিনাশুল্কে জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দেন। ফলে, দরিদ্র শরণার্থীরা বিনা খরচে ইতালি পৌঁছাতে পারেন।
৩য় ক্রুসেডের সূচনা- ইউরোপে পোপ অষ্টম গ্রেগরি ২৯ অক্টোবর ৩য় ক্রুসেডের আদেশ জারি করেন। ক্রুসেডের ব্যয় সংগ্রহের জন্য ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে Saladin Tithe নামে নতুন কর উত্তোলন করা শুরু হয়। ১১৮৯ সালে ইংল্যান্ডের রিচার্ড-১, ফ্রান্সের ফিলিপ-২ ও রোমান সম্রাট ফ্রেডরিক-১ এর নেতৃত্বে তৃতীয় ক্রুসেড এগিয়ে আসে।








