মালদা-মুর্শিদাবাদ-নদিয়া সহ পশ্চিমবঙ্গের নদীভাঙ্গন: মানুষের আর্তনাদ ও আইনের দাবি
ইকাবুল সেখ, নাকাশিপাড়া, নদিয়া
ভারতবর্ষ একটি নদীমাতৃক দেশ। পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়া জেলা এই বৈশিষ্ট্যের অন্যতম নিদর্শন। গঙ্গা, পদ্মা ও তাদের শাখা- উপ নদীগুলোকে কেন্দ্র করে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা বহুলাংশে নির্ভরশীল। নদী একদিকে যেমন জীবিকা, চাষাবাদ ও পরিবহনের সহায়ক, অন্যদিকে বর্ষাকালে তার ভয়াবহ রূপ মানুষকে করে তোলে উদ্বিগ্ন ও অসহায়।গত কয়েক দশকে মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কা অঞ্চলে নদীভাঙনের সমস্যা প্রবল আকার ধারণ করেছে। ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পর নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ও মেজেন্ডারিং প্যাটার্নে পরিবর্তন ঘটে। স্রোত প্রবাহের দিক ব্যাহত হওয়ায় নদীর বাঁক বদলেছে এবং তীরভাঙন তীব্র ও দ্রুততর হয়েছে। এছাড়াও মৌসুমি বন্যা, বঙ্গোপসাগরীয় জোয়ার–ভাটা ও প্রবল বর্ষণের ঢেউ নদীর তীরকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে প্রতিবছরই মুর্শিদাবাদ, মালদা ও নদিয়ার বহু এলাকা নদীভাঙনের কবলে পড়ে। আর দুর্বিষহ হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকা।
২০২৫ সালের বর্ষাকালে প্রচণ্ড ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে গঙ্গা ও পদ্মার স্রোত ভয়াবহ রূপ নেয়। ফলে বহু মানুষের ঘরবাড়ি ও চাষযোগ্য জমি নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী জানাগেছে, মুর্শিদাবাদের সামসেরগঞ্জ ব্লকে প্রায় ৬০টি বাড়ি ভেঙে গেছে ও লালগোলা ব্লকে প্রায় ২৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধুমাত্র দুই ব্লক মিলিয়ে প্রায় ৩০০–৩৫০ পরিবার তথা প্রায় ১, ৫০০ জন মানুষ গৃহহীন ও ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হয়েছে। এছাড়া মালদা ও নদিয়ার সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায়ও একই চিত্র দেখা গেছে। না জানি কত মানুষ আজ এই পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। সাধারণ মানুষ আজ খাদ্যহীন, আশ্রয়হীন হয়ে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিয়ে জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে। স্ত্রী–সন্তান নিয়ে অনাহারে আকাশের নিচেই কাটছে রাতের পর রাত। এই পরিস্থিতি থেকে কবে মিলবে সুরাহা? এর সদুত্তর কারো জানা নেই, হয়তোবা আছে।
এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা ও আইনগত দায়িত্ব প্রশ্ন উঠছে বারবার। এই সমস্যা আজ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের ফলে সাধারণ মানুষ ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার উভয়েই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। নদী সংস্কার বা টেকসই বাঁধ নির্মাণ এখনো কার্যত উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এক কথায়, দুই সরকার অর্থাৎ কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের এক চরম উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। শুধুমাত্র সরকার নয় এক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমও কার্যত বিচ্ছিন্ন।
ইতিমধ্যেই দেখেছেন, মাত্র ১-২ দিনের টানা বৃষ্টিতে কলকাতা শহর জলমগ্ন হয়েছে। যে খবর, প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে বারবার উঠে এসেছে ফলে সরকার সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও আধিকারিকরা নড়েচড়ে বসেছে। অথচ মালদা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ এর এই ভয়াবহ নদী ভাঙ্গনের বিষয়ে উনারা মুখে কুলু পেটে বসে আছে। হয়নি তেমন কোন খবর। একই রাজ্য বিভিন্ন চিত্র? শুধুমাত্র কি রাজধানী হওয়াতেই এত তফাৎ? কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, মুর্শিদাবাদ বাংলার প্রাচীন রাজধানী। আর দেশের প্রত্যেকটা নাগরিক তথা পশ্চিমবঙ্গের মালদা মুর্শিদাবাদ নদিয়ার প্রত্যেকে মানুষের প্রাণ গুরুত্বপূর্ণ। যা রক্ষা ও সুরক্ষার দায়িত্ব বর্তায় সরকারের উপর।
ইতিমধ্যেই, এই বিষয়ে সবর হয়েছেন কৃষ্ণনগর জর্জ কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী আতাউর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, ভারতীয় আইন The Right to Fair Compensation and Transparency in Land Acquisition, Rehabilitation and Resettlement Act, 2013 অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ প্রদান সরকারের বাধ্যবাধকতা ও সরকারি দায়িত্বের কথা।
পশ্চিমবঙ্গের নদীমাতৃক জেলা গুলি প্রতিবছর নদীর দাপটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে সাধারণ মানুষ জীবন–জীবিকা হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ছে। জলতলেই হারিয়ে যাচ্ছে বহু প্রাণ। সরকার, সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও আধিকারিকদের উচিত মানবিক ও আইনগত দায়িত্ববোধ থেকে অবিলম্বে এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসা ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ জরিপ করে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি বাঁধ ও নদী সংস্কার প্রকল্প গ্রহণ করা অপরিহার্য। অন্যথায় নদীর এই ভয়াল রূপ আরও হাজারো পরিবারকে গৃহহীন ও সর্বস্বান্ত হবে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
“না জানি আর কত প্রাণ কেড়ে নেবে এই নদী, এই মা!”








