রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হাফিজ শিরাজি: দুই সভ্যতার কাব্যিক সংলাপ

রফিক আনোয়ার:বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে কিছু কবি আছেন, যাঁদের কণ্ঠস্বর ভৌগোলিক সীমা ছাড়িয়ে মানব-আত্মার গভীরে পৌঁছে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর হাফিজ শিরাজি সেই বিরল শ্রেণির দুই প্রতিনিধি। একজন ঊনবিংশ-বিংশ শতকের বঙ্গদেশের কবি, অন্যজন চতুর্দশ শতকের পারস্যের সুফি সাধক — তবু প্রেম, সৌন্দর্য, বিশ্ববিধাতা ও মানবজীবন সম্পর্কে তাঁদের কাব্যিক অনুসন্ধানে আশ্চর্য মিল লক্ষ্য করা যায়।
হাফিজ শিরাজি (১৩১৫–১৩৯০) জন্মেছিলেন পারস্যের শিরাজ নগরে। তাঁর গজল-সমূহ পারস্য সাহিত্যকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি; বরং সুফি দর্শনের এক গভীর কাব্যিক রূপ পেশ করে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) ঔপনিবেশিক ভারতের প্রেক্ষাপটে বেড়ে উঠেও পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের মধ্যে এক সেতুবন্ধন গড়ে তোলেন।
দুই কবিই নিজ নিজ সভ্যতার কেন্দ্রে অবস্থান করেও ছিলেন বিশ্বমানবের। তাঁদের সাহিত্য কোনো সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে আবদ্ধ নয়; বরং মানবাত্মার মুক্তির দিকেই তাঁদের দৃষ্টি নিবদ্ধ।
প্রেম মানবিক, আবার একইসঙ্গে আধ্যাত্মিকও বটে! হাফিজের কবিতায় প্রেম এক বহুমাত্রিক সত্তা। বাহ্যত তা প্রেয়সীর প্রতি আকর্ষণ মনে হলেও, সুফি পাঠে সেই প্রেম আসলে স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণ। অনন্য নির্মাণ ও সৃজন-চিত্রকল্পে হাফিজ ইন্দ্রিয় ও আধ্যাত্মিকতার ভেদরেখা ভেঙে দেন।
রবীন্দ্রনাথের প্রেমভাবনাও দ্বৈত — মানবপ্রেম ও ঈশ্বরপ্রেমের এক গভীর মেলবন্ধন। গীতাঞ্জলি-তে তিনি লিখেছেন, ঈশ্বর মানুষের মধ্যেই প্রকাশিত।
‘তুমি আছো সকলের সঙ্গে, সকলের মাঝে’ — এই উপলব্ধি রবীন্দ্রনাথকে হাফিজের খুব কাছে এনে দেয়। হাফিজের বিধাতা কোনো কঠোর বিধানদাতা নন; তিনি প্রেমিক, বন্ধু, কখনো রহস্যময় প্রিয়া। ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে হাফিজ ছিলেন স্পষ্টতই বিদ্রোহী।
রবীন্দ্রনাথও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে চেয়েছেন। তাঁর ব্রহ্মবোধ মানবিক, উদার আর নৈতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। উভয়ের কাছেই বিশ্ববিধাতা মানে মুক্তি — ভয়ের নয়, আনন্দের।
রবীন্দ্রনাথের কবিতায় প্রকৃতি এক জীবন্ত সত্তা — আকাশ, নদী, ঋতু মানুষের অনুভূতির প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে। হাফিজের কবিতায়ও গোলাপ, বসন্ত, মদিরা, বাগান — সবই প্রতীক, যা পার্থিব সৌন্দর্যের আড়ালে এক চিরন্তন সত্যের ইঙ্গিত দেয়।
দু’জনেই সৌন্দর্যকে সত্যের পথ হিসেবে দেখেছেন। ভাষা ও কাব্যরীতির ক্ষেত্রে হাফিজের গজল সংক্ষিপ্ত, ঘন, প্রতীকধর্মী। এক একটি শের যেন বহুস্তর বিশিষ্ট অর্থের ভাণ্ডার। রবীন্দ্রনাথের কবিতা তুলনামূলক বিস্তৃত, সংগীতধর্মী ও ভাবপ্রবণ। তবু উভয়ের ভাষাতেই রয়েছে এক ধরনের স্বাভাবিকতা, যা পাঠককে সহজেই টেনে রাখে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হাফিজ শিরাজি — দুই আলাদা সময়, দুই আলাদা ভাষা, দুই আলাদা ধর্মীয় পরিসর। তবু তাঁদের কবিতা প্রমাণ করে, মানবসত্তার প্রশ্নগুলো চিরন্তন। প্রেম, ঈশ্বর, সৌন্দর্য ও মুক্তির সন্ধান — এই বিষয়গুলোতে তাঁরা যেন একে অপরের সঙ্গে নীরব সংলাপে লিপ্ত। এই সংলাপই বিশ্বসাহিত্যের আসল শক্তি, যেখানে ভিন্নতা মিলনের পথে বাধা নয়; বরং গভীরতার উৎস।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রাতে ঘুমোবার সময় হাফিজের দিওয়ান বা কবিতাগুচ্ছ পড়তেন। আর তাঁর মাথার বালিশের নিচে রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন। তাই তাঁকে ‘হাফিজের হাফিজ’ বলা হত। রবি ঠাকুর নিজেও সেকথা বলেছেন। এমনকি ১৯৩২’তে ইরান সফরকালে রবীন্দ্রনাথ শিরাজ নগরীতে হাফিজের মাজারে হাজিরাও দেন। তদানীন্তন ইরানের শাসক রেজা শাহের আমন্ত্রণে রবি ঠাকুরের ওই সফর। ১৯৩২’র ১১ এপ্রিল নিজের বউমা প্রতিমা দেবীকে সঙ্গে নিয়ে বিমানযাত্রা করেন। ১৩ এপ্রিল ইরানের বন্দর শহর ‘বুশেহর’ পৌঁছন। তারপর ১৬ এপ্রিল পৌঁছে যান হাফিজের শহর শিরাজে। সেখানে তিনি ফার্সির দুই কালজয়ী কবি সাদি ও হাফিজের মাজারে হাজিরা দেন। ভল্টেয়ারের (যাঁকে সাদি নামে ডাকা হত) মতো রবি ঠাকুরও সাদি-হাফিজের ভক্ত ছিলেন। বিশেষ করে হাফিজের সঙ্গে তিনি একরকম আত্মীয়তার সম্পর্কও অনুভব করতেন। অনেকের মনেই ধারণা জন্মে, রবি ঠাকুরের ওই অনুভূতি হয়ত তাঁর লালন-পালনের জেরেই।
রবি ঠাকুরের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচিতি ছিল ‘হাফিজের অনুরাগী’ হিসেবে। তিনি তাঁর বাল্যকালের সাঁঝবেলাগুলির স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেছিলেন: ‘আমি আমার মাঝরাত পর্যন্ত কাটিয়ে দিতাম স্তবগান আর হাফিজের কবিতা আবৃত্তিতে।’ হাফিজের প্রতি এই অনুরাগের স্রোত-ধারাই তাঁর ছেলে রবি ঠাকুরের মধ্যেও বয়ে যায়। ইরান সফরকালে ইস্ফাহান শহরে এক অনুষ্ঠানে রবি ঠাকুর বলেন: ‘হাফিজের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে বাবার মাধ্যমেই। বাবা আমাকে প্রায়ই হাফিজের কবিতা শোনাতেন। তা শুনে আমার মনে হত, কবিতাগুলি যেন দূর থেকে আমায় ডাক দিচ্ছে। কবি (হাফিজ) কিন্তু আমার কাছেই।’ (They seemed to me like a greeting from a faraway poet who was yet near to me)। ব্রিটিশ লাইব্রেরি’র ‘Untold Lives Blog’-তে প্রথম প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, রবি ঠাকুরের সঙ্গে হাফিজের সম্পর্ক ছিল কবিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে। হাফিজের মাজারে হাজিরা দেওয়ার সময় রবি ঠাকুর চোখ বন্ধ করে একাকী সমাধির সামনে বসে চারণ কবিতা বলতে থাকেন: ‘এক স্পষ্ট অনুভূতি আজ আমায় পেয়ে বসেছে। যেন বহু শতাব্দীর পথ পেরিয়ে, জন্ম-মৃত্যুর বহু পরিসরসীমা পারাপার করে… এই আরেক পথিক… হাফিজের সঙ্গে তার মেলবন্ধনের খোঁজ পেয়েছে।’ (I had the distinct feeling that after a lapse of many centuries, across the span of many births and deaths … another wayfarer … had found his bond with Hafez)। এই কথাগুলি রবি ঠাকুর নিজেই লেখেন পরবর্তী কালে। ওই বছরই জুন মাসের শুরুর দিকে সফর শেষে কলকাতা যাত্রার আগে রবি ঠাকুর হাফিজের স্মরণে একটি স্তুতি-কবিতা রচনা করেন। তিনি লেখেন: “Iran, all the roses in thy garden / and all their lover birds / have acclaimed the birthday / of the poet of a far-away shore / and mingled their voices in a pair of rejoicing.… And in return I bind this wreath of my verse / on thy forehead, and I cry: Victory to Iran!”
(“ইরান! তোমার বাগিচাতে আজি হাজির হরেক গোলাপ; / জমিয়েছে ভিড় গোলাপ-প্রেমী পাখিদের দল সব; / কণ্ঠে তাদের সাগরতীরের কবিকে স্বাগত-রব; / জয়গান-সুরে সুর মিলিয়ে একাকার আজ সব…… /… প্রতিদানে রাখি মোর কবিতার গোলাপগুঞ্চা খানি; / তব ললাটের ‘পরে; আর হাঁকাই- হোক ইরান জয়ী।”
(আমি কবিগুরুর ওই কবিতাটি অনেক খুঁজেও পাইনি। তাই ইংরেজি ট্রান্সলেশনকে সামনে রেখে একটু কবিতাচ্ছলে লাইনগুলোকে তুলে ধরার অতি-দুর্বল এক প্রয়াস চালিয়েছি মাত্র। ভুল-ত্রুটি মাফ করবেন)।


















































































































