পল্লিকবির পল্লিকথা
ফিরোজা বেগম
কবি জসীমউদ্দীন পল্লিকবি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিলেন ১৯২৭ সালে। গ্রাম বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে নিসর্গের নানান চিত্র দেখতে দেখতেই তিনি তাঁর কাব্য জগতের পরিধি ও পরিসরকে বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিলেন অনেক দূর পর্যন্ত। কবিতার প্রতি অকৃত্রিম টান তাঁর মনকে সর্বদা দারুণভাবে মোহময় করে তুলত বলেই তিনি ছুটে যেতেন পল্লির পথে-প্রান্তরে, অরণ্যে এবং নদীর তীরেও। একেবারে শৈশবকাল থেকে সেই নেশাটাই তাঁকে ভীষণভাবে দুরন্তও করে তুলেছিল। আর সেইসব করতে গিয়েই পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়া স্বভাবসিদ্ধ একটা অভ্যাসও হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর। তাই স্কুল ফাঁকি দিয়েছেন তিনি। বনে-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে লিখেছেন অজস্র কবিতা। আপনমনে সেইসব কবিতা আবৃত্তি করেছেন। নতুন নতুন অনেক গান গেয়ে মনকে হালকা রাখার চেষ্টাও করেছেন।
পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের বাবা ছিলেন তাঁদের গ্রামের মসজিদেরই ইমাম। কাব্যরসে ভরা টইটুম্বুর ছিল তাঁর মনটাও। মুখে মুখে ছড়া রচনা করতে পারতেন তিনিও। বন্ধু-বান্ধবদের চিঠিপত্র লিখতেন কাব্যিক ভাষাতেই। তাঁর এক দাদুও ছিলেন কাব্যরসিক মানুষ। তবে তিনি অন্ধ ছিলেন বলে লেখাপড়া শেখার সুযোগ পাননি। কিন্তু তাতে আটকে রাখা যায়নি তাঁর কাব্য-সৃজনী প্রতিভাকে। তিনিও মুখে মুখে কবিতা রচনা করতেন। লিখতেন ছোট-বড় অনেক গল্পকথাও। তিনি সবকিছুই ভাবতেন আর নাতিকে বলতেন, খাতার পাতায় সেগুলো লিখে রাখতে। ছোট্ট জসীমউদ্দীন তাই করতেন এবং মনে মনে বেশ মজাই পেতেন।
তাই কবি জসীমউদ্দীনের কাব্যপ্রতিভা যে পারিবারিক ধারাতেই প্রবহমান হয়েছিল, তা স্বীকার করে নিয়েছেন সকলেই। লেখালিখির ব্যাপারে কবি জসীমউদ্দীন আগ্রহী বা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বাবা এবং দাদুকে দেখেই। ছেলেবেলা থেকেই কাগজ-কলম নিয়ে ছড়া লেখায় মন বসিয়েছিলেন তিনি। তখন তিনি গ্রামেরই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন তিনি কেবল ছড়া- কবিতাই লিখতেন না, নিজের খেয়ালেই অতি গোপনে যোগ দিয়েছিলেন কবিগানের দলেও।
তাঁর নিজের গ্রামের মধ্যেই ছিল কবিগানের একটা দল। সুযোগ পেলে সেখানেই চলে যেতেন তিনি। সেইসব আসর বসত সাধারণত রাতের দিকেই। তাই সেখানে পৌঁছাতে তাঁকে অনেক ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হত। কিন্তু তবুও তিনি সেখানে যেতেন। প্রথম প্রথম গ্রামের আসরে, তারপর তাঁর দৌড় শুরু হয় পাশাপাশি গ্রামের আসরগুলিতেও।
সব জায়গাতেই মুখে মুখে গান রচনা করতেন ও সুর দিতেন তিনি। তারপর সেই গান তিনি গাইতেন নিজের গলাতেই। আসরের অন্যান্য কবিয়ালরাও অনেক সময় তাঁর লেখা গানগুলো গাইতেন। তখন একরাশ তৃপ্তির ঢেউ তাঁকে আপ্লুত করত। নতুন উদ্যমে উৎসাহিত হয়ে উঠতেন কবি। ওই বয়সেই রাত জেগে নতুন নতুন কবিতা লিখতেও শুরু করে দিতেন। একটা সময় সব খবর পৌঁছে যায় তাঁর পরিবারের কাছেও। সব শুনে সকলেই ভীষণ বিব্রত বোধ করেছিলেন নিশ্চয়ই। কিন্তু তখন তাঁর গতি রোধ করা কারো পক্ষেই সম্ভবপর হয়নি, যার জেরে বিষণ্ণ হয়েছিলেন সকলেই। কারণ, মোল্লা বংশের ছেলে ছিলেন তিনি। অত্যন্ত বনেদি পরিবার, আর সেই বাড়ির একটা ছেলে কবিগানের দলে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়াক — সেটা কাম্য ছিল না পরিবারের কোন সদস্যের কাছেই। তাই তো তাঁরা জসীমকে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল তাঁদের সব প্রচেষ্টাই। থামিয়ে বা দমিয়ে রাখা যায়নি তাঁকে। তিনি তার পরেও কবিতা লিখেছেন, গান গেয়েছেন, আবার পরিবারের লোকদের সন্তুষ্টির জন্য পড়াশোনাও করেছেন। ক্ষেতের শ্রমিক, নৌকার মাঝি, পথের ভিখারি, ভবঘুরের দল অথবা রাখাল বালকদের সঙ্গেও সময় কাটিয়েছেন নিজের মতো করেই।








