প্রতিবন্ধী-বান্ধব হতে হবে
তিন ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। ১৯৯২ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘ এই দিনটি ঘোষণা করে। প্রতিবন্ধীদেরকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্নও বলা হয়। এই ধরনের মানুষদের প্রয়োজন বিশেষ যত্ন। তারাও কিন্তু আদর বোঝে, মায়া বোঝে। তাদেরও আত্মসম্মান বোধ আছে, আছে বিশ্বাস, স্বপ্ন। কিন্তু পদে পদে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হতে হতে, সবকিছু থেকে বঞ্চিত হতে হতে আপনজন, সমাজ বা রাষ্ট্রে পরগাছার মতো তারা বেঁচে থাকে। অথচ তাদের অনেকের প্রতিভা স্বাভাবিক অনেকের থেকে বেশি। একটু খেয়াল করলেই আমরা দেখতে পাই, আমাদের চারপাশে নানা রকম মানুষের বাস। কেউ স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় শারীরিক, মানসিক, সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতায় পিছিয়ে আছে। তাদের কারও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অস্বাভাবিক, কারও বুদ্ধি কম, দেখা ও শোনার সমস্যা কারও, কারও আবার সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন ও যোগাযোগের অসুবিধা। আচরণেও তারা অন্যের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে।
এই ভিন্নতার পিছনে থাকতে পারে জিনগত সমস্যা, গর্ভাবস্থায় মায়ের স্বাস্থ্যগত সমস্যা, জন্মগত ত্রুটি, প্রসবকালীন জটিলতা, পরিবেশের খারাপ প্রভাব, মায়ের পুষ্টি, মানসিক অবস্থা-সহ নানাবিধ কারণ। আবার দুর্ঘটনা, কঠিন অসুখে চিকিৎসার অভাব বা ভুল চিকিৎসায়ও মানুষ প্রতিবন্ধী হয়ে জীবনের বাকি সময় দুরূহ কষ্টে অতিবাহিত করে।

সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো মারাত্মক দুর্ঘটনা কেড়ে নিতে পারে বেঁচে থাকার সব আনন্দ। চলতে চলতে হঠাৎ বদলে যেতে পারে জীবনের গতি। চুরমার হয়ে যেতে পারে জীবনের স্বপ্ন। অগ্নিকাণ্ডের ফলেও অনেকে প্রতিবন্ধী হয়ে গিয়েছে। কিন্তু যখন অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তখন অনেক হইচই করলেও দু-দিন পর সবাই সব ভুলে যায়। দোষীদের সামনে আসতে দেখা যায় না, সচরাচর শাস্তি হয় না। অগ্নিদগ্ধ হয়ে যারা বেঁচে থাকে, তাদের ক্ষতিপূরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে শুনিনি। আবার ভুল চিকিৎসায় অনেক শিশু, অনেক প্রাপ্তবয়স্ককে প্রতিবন্ধী হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। চিকিৎসকদের জবাবদিহির কোনো উল্লেখযোগ্য খবর আমার চোখে পড়েনি। অজ্ঞানতাবশত বিনা চিকিৎসায় অনেকেই বিকলাঙ্গ হয়ে যায়। গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তার বা কবিরাজের ভুল চিকিৎসায় কিংবা হুজুরদের তাবিজ, কবজ ব্যবহার করে, অথবা তেলপড়া-পানিপড়া খেয়ে অনেকেই প্রতিবন্ধী হয়ে যায়।
পরিবার যদিও তাদের গ্রহণ করে, সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের এড়িয়ে চলতে পারলেই বাঁচে। এরা যেন রাষ্ট্র বা সরকারের কাছে আপদ। প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও হ্যান্ডিক্যাপ সার্টিফিকেট বার করতে কালঘাম ছুটে যায়। এদের জন্য সরকারি ভাতা নামমাত্র।

সরকার বছরে এই একটা দিন ৩ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করেই দায় সারে। তাতে প্রতিবন্ধীদের তিমির বদলায় না। সরকার বহু ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা মোচ্ছব করে। কিন্তু প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাতা কিংবা সংরক্ষণ বাড়ায় না। সরকারের যাবতীয় বদান্যতা কেবল সরকারি কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ। বেসরকারি লোকেরা চুলোয় যাক, কিংবা নিপাত যাক। যাহোক, আসুন, আমরা সবাই মিলে দেশটাকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলি। দূর হোক বৈষম্য, দূর হোক অমানবিকতা। প্রতিবন্ধীদেরকে যেন আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী মনে না করি। তারা যেন আমাদের দয়ায় বেঁচে না থাকে, তারা যেন আমাদের স্নেহ-ভালবাসার ছায়ায় বেড়ে ওঠে।








