চলুন, আয়নার সামনে দাঁড়াই
খানা-খন্দ পেরিয়ে গাড্ডায় পড়লে তখন আর জেগে উঠলে কোনো লাভ হয় না। ভু যাকিছু খারাপ, তা আমাদের দুই হাতের কর্মফল। যা কিছু খারাপ, তা আমাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। বিপদ কখনও অভাব-অনটন রূপে, কখনও ঝগড়া-বিবাদ রূপে, কখনও দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক, মামলা-মোকদ্দমা রূপে। আবার কখনও স্বৈরাচারী শাসক, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, ভূমিকম্প, খরা, বন্যা, ধস ইত্যাদি রূপে। পাপ যেমন অসংখ্য, তেমনি পাপের পরিণতি বা শাস্তির রূপও বিভিন্ন।
কিন্তু যখন গোটা সমাজ কিংবা সমাজের অধিকাংশ লোক নৈতিক অধঃপতন ও চারিত্রিক অবক্ষয়ের শিকার হয়, তখন সমাজের ওপর নেমে আসে শাস্তির খাঁড়া। দু-চারজন লোক যদি তখন ভাল থাকে; কিন্তু পতনোম্মুখ সমাজের লাগাম টেনে ধরে ধ্বংসের গহ্বর থেকে তাদেরকে উদ্ধার করে কল্যাণ ও আলোর পথ দেখানোর কোনো চেষ্টা না করে, তাহলে তারাও সেই বিপদের লেলিহান শিখা থেকে নিস্তার পায় না।
এবার এসব বিষয় একটু দূরে সরিয়ে রেখে আসুন, আমরা আমাদের সমাজকে একটু গভীর ও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করি। নিঃসন্দেহে আমরা দেশ ও দশের উন্নয়নের জন্য অনেক শিল্প-কারখানা বানিয়েছি। বিলাসবহুল দালান-কোঠা গড়ে তুলেছি। সড়ক, জনপথ ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছি। আর এসব ক্ষেত্রে অধিকাংশই শাশ্বত বিধান ও নীতিমালার পরিপন্থী পথই আমরা অবলম্বন করেছি।
আমরা সুদভিত্তিক অর্থনীতি ও সুদি-ঋণ নিয়ে কাল্পনিক উন্নতির স্রোতে গা ভাসিয়েছি। ব্যাংক খুলেছি, ইন্সুরেন্সের জাল বিছিয়েছি, থিয়েটার বানিয়েছি, টিভি ও সিনেমা হলে নগ্নতার পসরা বসিয়েছি। মোটকথা পথভ্রষ্ট জাতির যা কিছু বৈশিষ্ট্য, তার সবই আমরা নিজেদের মাঝে ধারণ করেছি। বিদ্বেষী, পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্ত পশ্চিমাদের চিন্তা-নৈতিক সভ্যতার দাসত্বে যেন আমাদের গর্বে বুক ফুলে ওঠে। আমরা লটারি, সাট্টা, জুয়া, মদ, নাচ-গান-বাদ্যের ক্ষেত্রে অন্যদের ছাড়িয়ে যাওয়ার উন্মাদ প্রতিযোগিতায় নেমেছি। নারী স্বাধীনতার নামে মায়ের জাতিকে পথে নামিয়েছি, আধুনিকতার নামে দামি পোশাক পরিয়েও অর্ধ-উলঙ্গ বা অর্ধ-নগ্ন করেছি, পরম পূজনীয় নারীদেহকে ভোগের পণ্য বানিয়েছি। চারিত্রিক অধঃপতনের মেলা বসিয়েছি। নগ্নতা ও অশ্লীলতার প্রসারে লক্ষ-কোটি টাকা খরচ করেছি। রাস্তা-ঘাটে, হাটে-বাজারে, অফিস-কাছারিতে স্বল্পবসনা নারীদের অঙ্গ প্রদর্শনের মেলা বসিয়েছি। সৌজন্যে: আধুনিকতা ও নারী স্বাধীনতা। ইত্যাকার যাবতীয় অনাচার, অবিচার, কদাচার, পাপাচার, ব্যভিচার সবই করে চলেছি। সত্যের গলা টিপে ধরে সোচ্চারে মিথ্যার জয়গান গেয়ে চলেছি। ঘুষের বাজারকে তোল্লাই দিয়েছি। ন্যায়কে অন্যায়, আর অন্যায়কে ন্যায় বানানোর জন্য সব ধরনের কূট-চাল চেলেছি। অত্যাচারীদের কুর্ণিশ করে গরিব, মজদুর ও মজলুমের সম্পদ ছিনিয়ে তাদের পায়ের নিচে পিষে পিপিলিকা বা কীট-পতঙ্গের মতো মেরে ফেলছি।
এভাবেই পরিবার ও সমাজকে রসাতলে পাঠানোর ঠিকা নিয়েছি আমরা। হেন পাপকর্মটি নেই, যা আমরা সজ্ঞানে করিনি? এরপরও কীভাবে, কোন মুখে এই অন্ধকার জীবনে কল্যাণ ও মঙ্গলের শ্বেতশুভ্র-শিশির নেমে আসার দিবাস্বপ্ন দেখি?
যে বিষ খাবে, সে মারা যাবে। যে আগুনে ঝাঁপ দেবে, সে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাবে। আর যে জাতি স্রষ্টার অমোঘ বিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবাধ্য হয়ে বিদ্রোহের পথে চলবে, সে জাতির ললাট-লিখন কী হবে, সেই দেওয়াল লিখন পড়া জলবৎ তরলং। আজ আমরা নিজেদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করছি। শান্তি যেন আজ ডোডো পাখি, অথবা সোনার হরিণ। কৃষক, শ্রমজীবী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, দোকানদার কারও মনে শান্তি নেই। সুখের স্পর্শ নেই। প্রশান্তির লেশমাত্র নেই। হৃদয়ের সবুজ বাগানে যেন চৈত্রের খরা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, নোংরা জাতপাতের রাজনীতি, এলিট সোসাইটির দুর্নীতি, সর্বোপরি নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সংকট তথা সার্বিক অবক্ষয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। সাধ ও সাধ্যের মাঝে কোনো সামঞ্জস্য নেই। দুর্ঘটনার যেন প্লাবন নেমেছে। হাসপাতালে ও আদালতে গিয়ে দেখুন, মনে হবে পুরো শহরবাসী এখানে এসে ভিড় জমিয়েছে। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, অপহরণ এবং আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতির কারণে জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু কোনো কিছুরই আজ নিরাপত্তা নেই। কিন্তু আফসোস! আমরা এখনও প্রবৃত্তির আরাধনায় মশগুল হয়ে আছি। ষড়রিপু আমাদেরকে অক্টোপাসের মতো ঘিরে রেখেছে। দুনিয়াবি মস্তি-মউজে আকণ্ঠ ডুবে আছি। কোনো ঘটনার প্রবল ঝাঁকুনি আমাদের গাফিলতির ঘুম ভাঙাতে পারছে না, বিবেক জাগ্রত করতে পারছে না। উপদেশ গ্রহণ করার জন্য কোনভাবেই চোখ মেলে তাকাচ্ছে না। এ অবস্থা খুবই হৃদয় বিদারক, হতাশা ব্যঞ্জক। আরো একটা নতুন বছর এল। ১২ মাস পর আরো একটা নতুন বছর আসবে। কিন্তু এভাবে আর কতকাল আমরা এমনই হয়ে থাকব? পিপুফিসু জাতির কপাল ফেরানোর দায় কি মহাকাল নেবে? মোটেই না।





