নগরায়ণে হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ খেলা আমাদের শৈশবের সোনালি ধুলোর সন্ধানে
মইনুল হক:কেবলমাত্র কংক্রিটের জঙ্গল আর ডিজিটাল স্ক্রিন নয়, শৈশব মানে ছিল মুক্ত আকাশের নিচে, মাটির উপর, উল্লাসে ভরা বিকেল। আজ শহুরে জীবনযাত্রার সেই মধুর রূপটি কোথায় হারিয়ে গেল।
শহরের একটি ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের ছোট্ট শিশু উদ্যানে তাকালে চোখে পড়বে দোলনা আর স্লাইড, কিন্তু দেখা যাবে না একদল শিশুর ‘ডাং-গুলি’ নিয়ে উৎসাহিত চিৎকার বা মেয়েদের ‘এক্কা-দোক্কা’ খেলার মধুর কলরব। নগরায়ণের এই দ্রুত ছোঁয়ায় গ্রামীণ জীবনের বিস্তৃত মাঠ, খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ এবং সর্বোপরি, সেখানকার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা আজ সবই প্রায় বিলুপ্তির পথে। এগুলো কেবল বিনোদনের মাধ্যমই ছিল না; ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক ডিএনএ-তে মিশে থাকা সামাজিক মেলবন্ধন, শারীরিক দক্ষতা ও মানসিক কৌশলের এক জীবন্ত পাঠশালা।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে এই সম্পদ?
১) জায়গার অভাব: নগরায়ণের অন্যতম মূল্য হচ্ছে খোলা জায়গা, বিশেষ করে অবাধ খেলার মাঠ। বাড়িঘর, শপিং মল, আর সড়কের চাপে গ্রামের সেই ‘খোলা মাঠ’ শহরে একেবারেই অনুপস্থিত। ‘গোল্লাছুট’ বা ‘কাবাডি’-র জন্য প্রয়োজন বিশাল প্রাঙ্গণ, যা আজকের শহরে এক বিরল দৃশ্য।
২) সময় ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন: তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পড়াশোনা, প্রাইভেট টিউশনের চাপ এবং পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে শিশু-কিশোরদের হাতে আজকাল অবসর সময়ই কম। সেই সময়টা তারা টেলিভিশন, ভিডিও গেম বা মোবাইল ফোনেই কাটিয়ে দিচ্ছে।
৩) আধুনিক বিনোদনের প্রভাব: গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের যুগে ক্রিকেট, ফুটবলের মতো আন্তর্জাতিক খেলার পাশাপাশি ডিজিটাল গেমের প্রতি আকর্ষণ নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যবাহী খেলা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে।
৪) প্রজন্মগত বিচ্ছিন্নতা: যেসব বাবা-মায়ের শৈশব কেটেছে এইসব খেলাধুলোর মাধ্যমে, তারাও আজ ভুলতে বসেছেন অনেক খেলার নাম। ফলে সন্তানের কাছে ঐতিহ্য হস্তান্তর করার সুযোগ তৈরি হয় না।
যে গুলি হারিয়ে গেল, যেগুলো হারানোর পথে: গ্রাম-বাংলার হারিয়ে যাওয়া ও বিলুপ্তপ্রায় খেলার তালিকা অনেক লম্বা।
দলগত ও শারীরিক খেলা – ডাংগুলি (গিল্লি ডান্ডা): ক্রিকেটের আদি প্রতিদ্বন্দ্বী বলা যায় এটিকে। কাঠের ডান্ডা দিয়ে ছোট গিল্লি (গুলি) আঘাত করে দূরে পাঠানোর এই খেলা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই প্রচলিত ছিল।
গোল্লাছুট: এটি একটি বিশেষ ধরনের ট্যাগ বা ধাওয়া খেলা, যার ঐতিহাসিক সম্পর্ক কৃষি সমাজের সাথে জড়িত।
সাতচারা / সাতোড়া / পিঠু (Lagori): সাতটি পাথর স্তূপ করে রাখা হয়। বল দিয়ে স্তূপ ভেঙে আবার তা গড়ার মধ্যে যে উত্তেজনা, তা নাগরিক জীবনে দুর্লভ।
দাঁড়িয়াবান্ধা, বউচি, কানামাছি: এগুলো বিভিন্ন ধরনের দলগত কৌশল ও মজার খেলা, যার বিস্তারিত নিয়ম স্থানভেদে ভিন্ন হত।
ছোট ছোট উপকরণের খেলা – এক্কা দোক্কা (হপস্কচ): মাটিতে কাটা ঘরগুলো দিয়ে পাথর নিয়ে লাফানোর এই খেলা মেয়েদের খুব প্রিয় ছিল।
মার্বেল খেলা (কাচ বা কঞ্চা): রঙিন গুটিগুলো নিয়ে বিভিন্ন নিয়মে প্রতিযোগিতা হত।
লাটিম খেলা: কাঠের তৈরি লাটিম সুতো দিয়ে ঘুরিয়ে প্রতিযোগিতা করা হত; কার লাটিম বেশি সময় ঘোরে বা কার লাটিম দিয়ে অন্যেরটি ভাঙা যায়।
কড়ি খেলা: সামুদ্রিক ঝিনুকের খোল বা কড়ি দিয়ে নানা ধরনের গণনাভিত্তিক খেলা হত।
মেয়েদের খেলা – পুতুল খেলা: মাটির বা কাপড়ের পুতুল নিয়ে সংসার চালানো ছিল মেয়ে বা কন্যা শিশুদের প্রধান সামাজিকীকরণের পাঠ।
টোপাভাতি / জুলাবাতি: পাতা, কাঠি, মাটি দিয়ে রান্না-বান্নার অনুকরণ করে খেলা হত। এই খেলা যা প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক গড়ে দিত।
শুধুই অতীতের গল্প নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। এই ঐতিহ্য রক্ষা ও পুনরুজ্জীবিত করার দায়িত্ব আমাদেরই।
কয়েকটি উপায় হতে পারে:
পরিবার ও স্কুলের উদ্যোগ: বাবা-মা সন্তানদের শৈশবের গল্প শুনিয়ে, স্কুলে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বা বালুচরে এই খেলাগুলোর প্রতিযোগিতা আয়োজন করে নতুন প্রজন্মের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
সামাজিক ও সরকারি পদক্ষেপ: স্থানীয় যুব সংগঠন বা পৌরসভা শহরের ফাঁকা জায়গায় নির্দিষ্ট দিনে ঐতিহ্যবাহী খেলার আয়োজন করা যেতে পারে। ভারত সরকারের ‘খেলো ভারত’ বা ‘ভারতীয় খেল’ উদ্যোগের মতো পদক্ষেপ উৎসাহদাতা হতে পারে।
আধুনিক রূপান্তর: যেমন ‘কাবাডি’ পেশাদার লিগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তেমনি অন্যান্য খেলার নিয়মকে সামান্য রূপান্তরিত করে শহুরে পরিবেশে উপযোগী করা যেতে পারে। সাতচারা বা এক্কা-দোক্কা মল বা পার্কে খেলার উপযোগী করে তোলা সম্ভব।
উপসংহার:
নগরায়ণ অপরিহার্য, কিন্তু তার সাথে আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের টানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ এই খেলাগুলো কেবল আমাদের শৈশবের নয়, আমাদের জাতিসত্তার ঐতিহ্যবাহী অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু খেলার মাঠ নয়, আমাদের স্মৃতি, আমাদের ঐক্য এবং আমাদের স্বকীয়তার মাঠ হারানোর বেদনাতুর ইতিহাস। আসুন, আমরা আমাদের শিশুদের শুধু কংক্রিটের জঙ্গলই নয়, একটু ধুলো-মাটির গন্ধ, দলবেঁধে খেলার উল্লাস এবং আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া এই অমূল্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের স্বাদও দিই। তাহলেই ‘হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ খেলা’ শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; ভবিষ্যতের প্রাণচাঞ্চল্যের উপাদান হয়ে উঠবে।








