ধর্মে এবং জিরাফে
নুনের পুতুলকে সাগরের গভীরতা মাপতে বললে যা হয় আর কী! তারা তো বলবেই, ধর্ম আর জিরাফ এর মধ্যে ১৮০ ডিগ্রির ব্যবধান। কারণ, প্রবাদে অন্তত তেমনটাই বোঝানো হয়। যাহোক, ভুল করে হলেও কখনো দু-নৌকায় পা রাখবেন না প্লিজ। যুক্তিবাদী হওয়া ভাল এবং আবশ্যিক। কিন্তু যুক্তি বিনা মুক্তি নেই — এমন যুক্তিকে অবলম্বন করে যুক্তি’কে সবার উপরে বসানো সমীচীন নয়। সবার ওপরে যুক্তি সত্য, তাহার উপরে নাই — একথা সর্বত্র সঠিক নয়। প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্তি অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত হওয়া অনিবার্য। কিন্তু ধর্মের ব্যাপারে বা ধর্মের সঙ্গে নয়। কারণ, ধর্ম আপনি বা আমার তৈরি নয়। মানবেতিহাসের ঊষাকাল থেকে ধর্ম ছিল, আছে, থাকবে। বিজ্ঞান তো এই সেদিন এল। ধর্ম স্থির, বিজ্ঞান সতত পরিবর্তনশীল। কাল যা জ্ঞান ছিল, আজ তা বিজ্ঞান, আগামীকাল তা আবার সেকেলে। বিজ্ঞানের উদ্ভাবন বা আবিষ্কার প্রায়ই বদলে যায়। নিত্য নতুন আবিষ্কারে আগেরটা ব্যাকডেটেড হয়ে যায়। তাই যুক্তির কষ্টিপাথরে ধর্মকে যাচাই করা যৌক্তিক নয়। প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে বিজ্ঞান আশীর্বাদ হতে পারে, অভিশাপও হয়ে ওঠে। ধর্ম কিন্তু শাশ্বত।
আসলে একবিংশ শতাব্দীর সিকি ভাগে এসেও ধর্মের সংজ্ঞা আমাদের বোধগম্য হয়নি। ধর্ম মানে কিছু আচার-অনুষ্ঠান, কিছু বিধি-নিষেধ, কিছু করণীয় ও পালনীয় নয়। ধর্ম মানে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান বা জীবনযাপনের বিধান। আর আপত্তি বা সমস্যাটা এখানেই। কারণ, আমরা প্রায় সবাই যুক্তিবাদী, এবং বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে গেছি। জ্ঞানে-গুণে একেবারে টুইটম্বুর। তাই ধর্মকে নিজের মতো করে সংজ্ঞায়িত করে নিয়েছি। ধর্মকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে রেখেছি। ধর্মের ব্যাখ্যা নিজেদের মতো করে উপস্থাপন করেছি। যেখানে ধর্ম মানলে লাভ, সেখানে ইয়েস বস। আর যেখানে লোকসান, সেখানে ধর্মকে দুয়োরানি করে রেখেছি। অর্থাৎ ধর্মের ব্যাপারে আমরা সম্পূর্ণ সুবিধাবাদী। ধর্ম আমাদেরকে ধারণ করলেও, আমরা ধর্মকে ধারণ করি না। ধর্মকে বাহন করেছি আমরা। ধর্ম থেকে সুযোগ-সুবিধা নিতেই অভ্যস্ত। আপনি আচরি ধর্ম অন্যেরে শিখাও — এই মতের ধার ধারি না বা ধারে কাছে যাই না।
সাঁতার না জানলে, ঝঞ্ঝা-তুফানে মাঝি আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। তখন যতই বিদ্যে বোঝাই বাবুমশাই হন না কেন, আপনার ষোলআনাই বৃথা। যুক্তি, বুদ্ধি কিছুই তখন কাজে দেবে না।
‘ধর্মে নাকি জিরাফে’ কবিতায় দেবেশ ঠাকুর লিখেছেন — ”তোমার ধর্ম তোমার থাকুক, আমার ধর্ম আমার; নিক্তি মেপে তফাৎ করো কপার এবং তামার! ধর্ম যদি ব্যক্তিগত আল্লাহ, গড, ঈশ্বর;
নিজের মতোই আরাধ্য হোন বিশ্ব চরাচর; সৃষ্টিকর্তা নিয়ে বিভেদ! সৃষ্টি নিয়ে নয়?”
ধর্ম ও বিজ্ঞান (পড়ুন জিরাফ) সম্পর্ক বরাবরই সাপে-নেউলে, কখনো-বা অম্ল-মধুর। ধর্ম বলে আমায় দেখ, তো বিজ্ঞান বলে আমায় দেখ। বিনা যুদ্ধে কেউ কাউকে সূচাগ্র মেদিনি ছাড়তে নারাজ। ধর্ম হল বিশ্বাসের ধারাপাত। আর বিজ্ঞান হল যুক্তির নির্যাস। ধার্মিকরা মনে করেন, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। আর যারা নিজেদেরকে বিজ্ঞানমনস্ক বলে দাবি করেন, তাদের সাফ কথা হল, যুক্তি প্রমাণ ছাড়া কিছু মানি না, বিন্দু-বিসর্গ বুঝি না। অর্থাৎ ধর্মপ্রাণ ও বিজ্ঞান মনস্কদের সম্পর্ক যেন তেল আর জল, এই যুযুধান শিবির কখনোই মিলেমিশে এক হতে পারে না। কিন্তু সত্যিই কি তাই? ধর্ম আর বিজ্ঞান কি ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত মেরুর? দুইয়ের মধ্যে সত্যিই কি আসমান জমিন ব্যবধান? নাকি এক শ্রেণির ধূর্ত অথবা কায়েমী স্বার্থান্বেষী মানুষ এই ভেদরেখা টেনেছে?
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা একটা কাব্যগ্রন্থের নাম হল ”ধর্মে আছো জিরাফেও আছো”। ধর্ম আর জিরাফ কেন বলা হয়? বিজ্ঞান কি তাহলে জিরাফ? বিজ্ঞানের গলা কি এতই লম্বা যে, ধর্ম তার নাগাল পায় না? ধর্ম যদি লেংচে জিরাফ (থুড়ি, বিজ্ঞান)-এর গলা ধরে ঘাড়ে উঠতে কিংবা ঘাড় মটকাতে চায়, তাহলে কি ধর্মকে এই বলে তাচ্ছিল্য করা হবে যে, বিজ্ঞান নাকি ধর্মের থেকে অনেক বেশি স্মার্ট? এলিট? পোস্ট মর্ডার্ন? তর্কের খাতিরে না হয় তা-ই মেনে নিলাম যে, বিজ্ঞানের থেকে ধর্ম অনগ্রসর, পিছিয়েপড়া কিংবা ব্যাকওয়ার্ড। অথবা বিজ্ঞান প্রগতিশীল, আর ধর্ম হল প্রতিক্রিয়াশীল। বিজ্ঞানের সঙ্গে মেলাতে গেলে ধর্ম কি তবে বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াচ্ছে বলা হবে? দুইয়ের মধ্যে সম্পর্কের রসায়নটা কেমন হওয়া উচিৎ, তারা উভয়ে কি একে অপরের শত্রু? পারস্পরিক সম্পৃক্ততা ও স্বকীয়তা বজায় রেখে তারা একই সাথে চলতে পারবে কিনা, এটা এক বিস্তৃত অধ্যয়ন ও আলোচনার বিষয়।
কিন্তু বর্তমানের বস্তুবাদী বিজ্ঞান ধর্মকে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়ে ধর্মকে তার শত্রুর অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। ঐশী ধর্মকে বাতিল করে বিজ্ঞান নিজেও একটা ধর্মীয় ও ভাববাদী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। এর নিজস্ব বিশ্বাস আছে, অনুসারী-অনুগামী আছে, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আছে, ভিশন-মিশন আছে, মতবাদ এবং মতাদর্শও আছে। সেটা হল, বিজ্ঞান দিয়ে মানুষকে ধর্ম বিমুখ করার কৌশল। যারা এই মত-পথে বিশ্বাসী, তারা জানে না যে, প্রকৃত ধর্ম হল বিজ্ঞানময়। বিজ্ঞান হল ধর্মের প্রতিপাদ্য বা উপপাদ্য। দুইয়ের মধ্যে সংঘাত নেই। একে অন্যের পরিপূরক। বিজ্ঞানের জ্ঞান থাকলে ধর্মকে উপলব্ধি অনুধাবন করা সহজতর হয়।








