সব পেলে নষ্ট জীবন
মাত্র তিনটি অক্ষরের সমষ্টি হল ‘জীবন’, যা মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়। তাই জীবন নিয়ে অনেক গল্প, অনেক গবেষণা সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকেই চলে আসছে। কিন্তু উপসংহারে কেউ আসতে পারেনি। জীবন যেমন চলমান, জীবনের ভাবনা, জীবনবোধ, জীবনদর্শনও তেমনি সচল, স্থবির নয়। থেমে গেলেই জীবনের ইতি। জীবনকে নিয়মের বন্ধনে সংযম রেখে পরিচালিত করাই জীবনের ধর্ম। অনিয়মে কোনকিছুই সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় না, এ কথা পরীক্ষিত সত্য। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় পৃথিবীটা সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। কিন্তু একটু চিন্তা করলে বোঝা যায়, এই সৌন্দর্যের মধ্যে একটা কঠিন নিয়মের বন্ধন আছে। যেমন- গ্রহ, তারকা ঘুরছে, ঋতুচক্র নিয়ম মেনে আবর্তিত হচ্ছে। আকাশে সূর্য প্রতিদিন উঠছে, ডুবছে। সূর্যকে পাশ কাটিয়ে ঠিক সময়ে নেমে আসছে সন্ধ্যা এবং তারপর রাত্রি। মহাজাগতিক বিষয়ে কোথাও কোনো বিচ্যুতি নেই, ব্যতিক্রম নেই। সবাই এক কঠিন শৃঙ্খলার শাশ্বত আবর্তে চলছে।
প্রকৃতির মতো আমাদেরও নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলা উচিত। আমাদের জীবনের সব ক্ষেত্রে এই নিয়ম অপরিহার্য। নইলে আমরা পদে পদে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতাম। আমরা এই শিক্ষা প্রকৃতি থেকে নিতে পারি, প্রাণীজগৎ থেকেও নিতে পারি। যেমন ধরা যাক, পাখিরা জেগে ওঠে মনের আনন্দে, গান করে, সারাদিন উড়ে-ঘুরে বেড়ায়। সন্ধ্যা নামলে যে যার বাসায় ফেরে। মৌমাছি, পিপীলিকা, কীট-পতঙ্গের দল, অঙ্গুরীমাল প্রাণী সবার মধ্যেই প্রায় একই নিয়ম। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, মানুষ সামাজিক জীব। নিয়ম-শৃঙ্খলা ব্যাহত হলে সমাজজীবন গড়ে উঠত না। আমরা যে সুন্দর সুশৃঙ্খল পৃথিবীতে ও সমাজে বসবাস করছি, সেখানে রয়েছে পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ইত্যাদি। অন্যান্য জীবজন্তুদের কিন্তু এসব নেই।
যুগে যুগে দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী, মনীষীরা মানুষের জন্য শিক্ষা এবং জ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়েছেন। সবাই বলেছেন, মূলত শিক্ষা এবং জ্ঞানের কারণেই অন্যান্য প্রাণীকুল থেকে মানুষ আলাদা। এই দুটো কারণেই মানুষের এত সম্মান এবং মর্যাদা। মানুষ শারীরিকভাবে হাতি, বাঘ-সিংহ ইত্যাদির থেকে যত দুর্বলই হোক না কেন, জ্ঞানের কারণেই তাকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শক্তি ও সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে পরিগণিত করা হয়। মানুষের গায়ে হিংস্র জীবজন্তুর মতো শক্তি না থাকা সত্ত্বেও শুধু জ্ঞানের কারণে হিংস্র জন্তুদেরকে মানুষ বশে আনতে পারে, পোষ মানাতে পারে।
জল, স্থল, অন্তরীক্ষ সর্বত্র মানুষের গতায়াত। মানুষ মহাশূন্যে পাড়ি দিচ্ছে অজানাকে জানতে। সমুদ্রের অতলে ডুব দিয়ে গবেষণা করছে। দেখছে পৃথিবীর মতো অন্যান্য গ্রহে কী আছে বা নেই। বুদ্ধিবলে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলে মানুষ পৃথিবীকে করতলগত করেছে। এসব কর্মকাণ্ড মানুষের অপরিসীম জ্ঞান-শক্তির প্রমাণ। তাই বলা হয় Knowledge is power। অর্থাৎ জ্ঞানই শক্তি। জ্ঞানবান ব্যক্তিরা রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি — সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। সীমাবদ্ধ জীবনের সময়টুকুকে অবহেলা, অপচয় বা অপব্যয় করার সুযোগ এখানে নেই। নিজেকে সুষ্ঠুভাবে, সুচারুরূপে পরিচালনা করলে প্রকৃতির রূপ, রস, গন্ধ — সবকিছুরই নির্যাস অনুভব করা যায়।
পৃথিবীতে খরা, বন্যা, দাবানল, অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প, দিন-রাত্রি, মাস, বছর, সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা, জোয়ার, ভাটা, চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ — এসব স্রষ্টা কর্তৃক নিয়ম মেনেই হয়ে থাকে। ঐশী বিধান অমান্য বা লঙ্ঘন করলে মহাপৃথিবীতে মহাবিপর্যয় ঘটে যাবে এক লহমায়। পৃথিবী তার নিজের কক্ষপথে ঘুরছে। এভাবেই সে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। তারই পরিণামে হচ্ছে আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতি। এই প্রদক্ষিণ থেমে গেলে সারা পৃথিবীটাই নরওয়ের মতো নিশিথসূর্যের দেশ হয়ে যাবে। সূর্য একটু নীচে নেমে এলে পৃথিবীর মুখ ঢেকে যাবে বরফের চাদরে। এরকম আরো কতশত উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। তালিকা দী…র্ঘ করে লাভ নেই।
বলতে চাইছি, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে আমরা কি সত্যিকার অর্থে মানুষ হতে পেরেছি বা চেষ্টা করছি? হাত, পা, মাথা, চোখ, কান সবার সব আছে। কিন্তু আমরা কি নৈতিকতা, মানবিকতা, মূল্যবোধের শাশ্বত নীতিমালা মেনে চলছি? চলছি না। তাই তো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, অশ্লীলতা, পাপাচার, সংকট, অবক্ষয়, বিপর্যয়। এসব আমাদের নীতিভ্রষ্টতার পরিণতি। আমরা নিজেদেরকে সংশোধন করতে না পারলে, আত্মশুদ্ধি করতে না পারলে এই পৃথিবী খুব বেশিদিন আমাদের বাসযোগ্য থাকতে পারে না। তার নমুনা দেখতেও পাচ্ছি সর্বত্র, সর্বক্ষণ। কিন্তু আমরা সেসব দেখেও না দেখার ভান করে আছি। পার্থিব স্বার্থে মশগুল হয়ে আছি, রঙিন স্বপ্নের বিলাসিতার ঘোরে আছি। সর্বোপরি আমরা জেগে ঘুমাচ্ছি। কোনকিছু থেকে আমরা শিক্ষা নিচ্ছি না। প্রকৃতি ও জীবজগৎ নিজ নিজ নিয়ম-বিধি মেনে চললেও ব্যত্যয় ঘটে শুধু আমাদের মাঝে। কারণ, আমাদের জ্ঞান আছে, বুদ্ধি আছে, অর্থ আছে, সম্পদ আছে। আমাদের অনেক কিছুই আছে। কিন্তু নেই কেবল সময়। যে কোন সময় আমাদের জীবনের সাজানো বাগিচায় হানা দেবে মৃত্যু-কীট। তারপর কী হবে? সে নিয়ে ভাবতে হবে বৈকি। ভাবলেই দেখা যাবে, কতকিছুর অভাব নিজ থেকেই ধরা পড়বে। তাই ভাবতে হবে, ভাবাতে হবে।





