আত্মীয়-প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণ কেমন হবে?
লামইয়া নাসরিন
নতুন পয়গাম: ইসলাম এমন এক পরিপূর্ণ জীবনবিধান বা ধর্ম; যার শিক্ষার মাঝে সব কিছু বিদ্যমান। আত্মীয় এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ়করণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাল ব্যবহার করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন: ‘আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না এবং সদয় ব্যবহার কর বাবা-মায়ের সঙ্গে, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতিম, মিসকিন, প্রতিবেশী এবং অনাত্মীয় অসহায় মুসাফির এবং নিজের সঙ্গী-সহচর ও পথচারীদের সঙ্গে। আর তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে; তাদের সঙ্গে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা দাম্ভিক-অহঙ্কারীকে ভালবাসেন না।’ (সূরা নিসা: ৩৬)। মহান আল্লাহ তাআলা আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তর আচরণ শিক্ষা দিতে বিশ্বনবী (সা.) এর প্রতি এই আয়াত নাযিল করে তুলে ধরেছেন ইসলামের অতুলনীয় সুমহান শিক্ষা।
আমরা যেন নিজেদের ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, আপনজন এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করি। সব ভাল কাজের বিষয়ে তাদের সহযোগিতা করি। তাদের সব ভাল কাজের প্রয়োজনে যথাসাধ্য সাহায্য-সহযোগিতা করি। আর এমন সব লোকদেরও সাহায্য করি, যাদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই এবং চেনা-জানাও নেই, কিন্তু তারা অসহায়; অপরিচিত মুসাফির।
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা শুধু ইসলামের নির্দেশনাই নয়; বরং এতে অনেক ফজিলত ও মর্যাদাও রয়েছে। কেননা, আত্মীয়তার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা, তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া, তাদের কাছে আসা-যাওয়া করাও ইবাদতের অংশ। এ বিষয়টি বিশ্বনবী (সা.)যেভাবে তুলে ধরেছেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং মৃত্যুর সময় পিছিয়ে দেওয়া কামনা করে, তার উচিত আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।’ (বুখারি)।
হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন আমল বলে দিন; যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। তখন তিনি (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর ইবাদত কর, তার সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করো না। নামায ভাল করে আদায় কর এবং যাকাত দাও, আর আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখ।’ (বুখারি)।
আত্মীয়রা যখন কারো সঙ্গে অন্যায় করবে বা দুর্ব্যবহার করবে, তখনও তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা যাবে না। হাদীসের নির্দেশনা এমনই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী নয়, যে সম্পর্ক রক্ষাকারীর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে; বরং প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী সে, যে সম্পর্ক ছিন্নকারীর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে।’ (বুখারি)। প্রিয় নবী (সা.) এ সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বুখারি)।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় রাসূলুল্লাহ (সা.) আদর্শের ওপর আমল করলে সুন্দর ও আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হওয়া সম্ভব। যে সমাজে ব্যক্তি, পরিবার কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হবে না, ভাই-ভাই বন্ধন নষ্ট হবে না, বৌমা-শাশুড়ির বিবাদ-কলহ থাকবে না, পাড়া-প্রতিবেশীর হিংসাত্মক শত্রুতা ও প্রতিযোগিতা থাকবে না। বিশ্বনবী (সা.) এর নসীহত গ্রহণে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজের প্রত্যেকের সঙ্গে তৈরি হবে মধুর সম্পর্ক। সবাই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করবে। একে অন্যের উপকারে থাকবে উদার ও সচেষ্ট। এ সবই ইসলাম ও মুসলমানের ঐতিহ্য এবং বিশ্বনবী (সা.) এর সর্বোত্তম আচরণ ও আদর্শের বহিঃপ্রকাশ।
ইসলামে যেসব অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, আত্মীয়তা-প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে অধিক মাত্রায় তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কুরআনের নির্দেশনায় তা ওঠে এসেছে। বিশ্বনবী (সা.) অনেক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘জিব্রীল(আ.) এসে আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে অবিরত উপদেশ দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে আমার এমনটি মনে হল যে, হয়ত তিনি প্রতিবেশীকে সম্পদের উত্তরাধিকার বানিয়ে দেবেন।’ (মুসলিম)।
ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় এতবেশি গুরুত্ব দিয়েছে যে, কাফেরদের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতে আর আত্মীয় অমুসলিম হলেও তার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলামের অনুশাসন মেনে চলার পরও কোনো লোক মুমিনের কাফেলায় অন্তর্ভূক্ত হতে পারে না; যদি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী হয়, আর প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণকারী না হয়। কেননা, ইসলামের নির্দেশনাই হচ্ছে- কোনো মুমিন ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করতে পারে না। আর সেই সঙ্গে তার প্রতিবেশীরও ক্ষতি করতে পারে না। ইসলামের এই শাশ্বত ও সুমহান শিক্ষা উপেক্ষা করে কারো পক্ষে পূর্ণ মুমিন হওয়া সম্ভবপর নয়। বস্তুত আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং প্রতিবেশীর অনিষ্ট সাধনকারী ব্যক্তিকে ইসলাম মুমিন বলে স্বীকৃতি দেয়নি। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়। জিজ্ঞাসা করা হল- কে মুমিন নয়? ইয়া রাসূলুল্লাহ! তিনি (সা.) উত্তরে বললেন- যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)।
সুতরাং মুমিন মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখা এবং প্রতিবেশীর সুবিধা-অসুবিধার দিকে দৃষ্টি রাখা। প্রতিবেশীর যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, তা সব সময় খেয়াল রাখা। হোক না আমার প্রতিবেশী ভিন্ন ধর্মের বা ভিন্ন মত ও পথের অনুসারী। কারো সঙ্গে আমার মত-পথ, চিন্তা-ভাবনার মিল নাও থাকতে পারে, তাই বলে কি তার সঙ্গে আমার আচরণ খারাপ হবে? মোটেও নয়। ধর্মীয় মূল্যবোধে প্রতিবেশীর অধিকার এত ব্যাপক ও বিস্তৃত যে, দৈনন্দিন জীবনের সর্বাবস্থায় প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর নেয়া, বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো, অসময়ে সর্বাত্মক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার শিক্ষা ইসলামে রয়েছে।
সাহাবাদের লক্ষ্য করে একবার বিশ্বনবী (সা.) বলেন, তোমরা কি জান, প্রতিবেশীর হক কী? তাহল, যদি সে তোমার কাছে সাহায্যপ্রার্থী হয়; তাকে সাহায্য করবে। যদি সে ধার বা ঋণ চায়; তাকে তা দেবে। যদি সে অভাবগ্রস্ত হয়; তার অভাব মোচন করবে। যদি সে রোগগ্রস্ত হয়; তাকে সেবা দান করবে। যদি তার মৃত্যু হয়; জানাযায় শরীক হবে। যদি তার কল্যাণ হয়; তাকে উৎসাহিত করবে। যদি তার বিপদ হয়; পাশে দাঁড়িয়ে সহানুভূতি জানাবে। প্রতিবেশির অনুমতি ব্যতীত তোমার ঘর এত উঁচু করবে না; যাতে প্রতিবেশির ঘরে আলো-বাতাস ঢোকা বন্ধ হয়। যদি তুমি ফল-মূল কেনাকাটা কর; কিছু অংশ প্রতিবেশীর জন্য উপহারস্বরূপ পাঠাবে, আর যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে তা গোপনে তোমার সন্তানদের খেতে দেবে, যেন প্রতিবেশীর ছেলে-মেয়ে তার বাবা-মাকে বিরক্ত না করে।
আমাদেরকে বুঝতে হবে- প্রতিবেশী যে-ই হোক, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আমাদের প্রতিবেশী। সবাই সমান মর্যাদা পাবে এবং সবার সঙ্গে মানবিক ব্যবহার ও সদ্ব্যবহার বজায় রাখতে হবে। আসুন, আমরা সবাই সবার আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর রাখি, আর তাদের সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে, অসময়ে-দুঃসময়ে পাশে গিয়ে দাঁড়াই। কুরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা মেনে চলি। আল্লাহতাআলা সবাইকে আত্মীয় ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন এবং প্রতিবেশীর অধিকার যথাযথভাবে অটুট রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন।








