ইতিহাস বিকৃত, ভূগোল বিক্রিত
যে জাতি নিজের ইতিহাস জানে না, সে জাতির ললাট লিখন সহজেই অনুমেয়। আবার যে জাতির ইতিহাস বিকৃত করা হয় এবং ভূগোল বিক্রিত হয়ে যায়, সে জাতির সাড়ে সর্বনাশ অনতি বিলম্বেই সুনিশ্চিত। ইতিহাস এবং ভূগোল একটা দেশ, জাতি বা সভ্যতার অমূল্য সম্পদ, যদি তা যথার্থভাবে সংরক্ষিত ও পরিবেশিত হয়। অন্যথায় ভবিষ্যত কী হতে পারে, তা আর কহতব্য নয়। আর ইতিহাস ভূগোল ঠিকঠাক থাকলে বা বিকৃত ও বিক্রিত না হলে, সেই দেশ সোনায় সোহাগা হয়ে যাবার কথা। কিন্তু দশচক্রে ভগবান ভূত হয়ে যাবার মতোই আমাদের দেশে নোংরা রাজনীতির জাঁতাকলে পিষে এত রকম সম্পদের এই দেশ অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সূচকে তলানিতে ঠেকে গিয়েছে।
চিন্তা, ভাবনা ও চেতনার প্রসার এবং এর ভিত্তিতে জনমত বা মতাদর্শ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতিহাস ও ভূগোলের ভূমিকাই প্রধান। কিন্তু দুঃখের হলেও সত্যি যে, ইতিহাস ভূগোল কিছুই এখন যথাযথ নেই। বিজ্ঞানের মুখও ঢেকে গেছে কুসংস্কারের রমরমায়। ভাষা ও সাহিত্য বিভাগেও চলছে আগ্রাসন। সরকারি বদান্যতায় হিন্দির দাপট বা দৌরাত্ম এত বেশি যে, শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার অপরাধে বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালিদের হেনস্থা, মারধর, গ্রেফতার এমনকী পুশব্যাক পর্যন্ত করা হচ্ছে। বুলডোজার চালিয়ে ইতিহাস, ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক স্থাপত্য, বহু প্রাচীন নিদর্শন ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। কারণ, মুসলিম শাসকদের নাম নিশানা দেশের ইতিহাস থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে হবে। তাহলেই নাকি আমাদের দেশ গড়গড়িয়ে এগিয়ে যাবে।
মনে রাখতে হবে, বিকৃত ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাকে বিকৃত করেই ক্ষান্ত হয় না, বরং বর্তমানের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকেও বিষাক্ত করে তোলে। তাই দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশে শিক্ষার হার বাড়ছে, শিক্ষিতের হার বাড়ছে, কিন্তু শিক্ষার প্রসার হচ্ছে না, বরং সাম্প্রদায়িকতার প্রসার হচ্ছে। দেশের চালিকা শক্তি যখন সাম্প্রদায়িকতার ফেরিওয়ালা, তখন এর থেকে ভাল আর কী আশা করা যাবে। তাই সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে, কিন্তু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাড়ছে না। বিদ্বেষ বাড়ছে, কিন্তু দেশ আগে বাড়ছে না।
২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি কেন্দ্রে ক্ষমতা দখল করার পর আরএসএস-এর রাজনৈতিক এজেন্ডার অন্যতম হিন্দু-রাষ্ট্র কায়েমের লক্ষ্যে এগোচ্ছে দেশ। এ জন্যই চলছে ইতিহাস ও ভূগোলে রদবদল। এই লক্ষ্যেই বিদেশি, বাংলাদেশি, রোহিঙ্গা বা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়কে তকমা দেওয়া হচ্ছে। এবং নিত্যনতুন ন্যারেটিভ তৈরি করে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। আর সেই তথ্য ও তত্ত্ব রোমন্থন করে বা জাবর কেটে বাজার মাত করছে মিডিয়া ও এক শ্রেণির একবগ্গা বুদ্ধিজীবীর দল। এরা মাথা থেকে যুক্তি-বুদ্ধি সব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মাথায় গোবর ভর্তি করে নিয়েছে। বিজেপি সরকারে থাকায় রাষ্ট্রের সব শাখা ও সংস্থাকে তাদের এজেন্ডা পূরণের কাজে লাগাচ্ছে। সব সরকারি ব্যবস্থাপনাকে কুক্ষিগত করে ফেলেছে। তিরঙ্গা ভারতকে তারা গেরুয়া ভারতে পরিণত করতে বদ্ধপরিকর। অন্ধভক্তরা কেবল একটাই রঙ দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সেটা হল নাগপুর থেকে আমদানি করা গেরুয়া রঙ। ঘাস থেকে আকাশ – সর্বত্র তারা গেরুয়া রঙের প্রলেপ দিতে চায়। সব ঐতিহ্য, পরম্পরা ও বহুত্ববাদকে জলাঞ্জলী দিয়ে তারা সবকিছুকে এক করে দিতে মরিয়া। এক দেশ এক আইন, এক দেশ এক ভোট, ওয়ান নেশন ওয়ান স্টেশন ইত্যাদি। তারা একের পক্ষে, একের পরে একাধিক তারা কিছুতেই মানতে পারে না।
তাই তারা আম্বেদকরকে বরদাস্ত করতে পারে না। নাম শুনলেই চুলকানি শুরু হয়ে যায়। তাদের নজরে ভারত-রত্ন হলেন গোলওয়ালকর, সাভারকর, হেডগেওয়ার প্রমুখ। তারা নাগপুরের স্কুলে ভর্তি হয়ে এই নামতা মুখস্ত করেছে। তাই তাদের অংক আলাদা। তাই তাদের আমাদের অংকের উত্তর তাদের সঙ্গে মেলে না। হিন্দুত্ববাদী নেতা এম.এস গোলওয়ালকর তাঁর লেখা ‘উই আর আওয়ার ন্যাশনহুড ডিফাইনড’ বইয়ে তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, হিন্দুস্তানে বিদেশি জাতিগুলিকে হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দি ভাষাকে গ্রহণ করতে হবে, হিন্দু ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে হবে, হিন্দু জাতি ও সংস্কৃতিকে গৌরবান্বিত করা ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা পোষণ করা চলবে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হয় তারা এসব করবে, অন্যথায় এদেশে থাকতে হবে হিন্দু জাতির কাছে পদানত হয়ে। আরএসএস এই ভাবনা থেকেই বছরের পর বছর ধরে প্রচার করে আসছে যে, মুসলিমরা এদেশে অনুপ্রবেশকারী। এই ইস্যুতে তারা গত এক দশক ধরে জোরদার আখ্যান ও উপাখ্যান প্রচার করে চলেছে। কিন্তু অনুপ্রবেশের আসল তথ্য তাদের কাছে নেই। অথবা থাকলেও ঝুলি থেকে বিড়ালটা বের করতে চাইছে না। তাহলে হয়ত কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে পড়বে। অতএব, কেবলই ঠাকুমার ঝুলি থেকে অনুপ্রবেশের রঙচঙে মুচমুচে গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে কান ঝালাপালা করে দাও। অন্ধভক্তের দল সেই গল্প গোগ্রাসে গিলছে আর বমি করছে।








