আফ্রিকার ১৪ দেশ থেকে ঔপনিবেশিক আমলের কর নিচ্ছে ফ্রান্স
নতুন পয়গাম,প্যারিস,
১৯ সেপ্টেম্বর: ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বেড়াজাল থেকে এখনও পুরোপুরি মুক্ত নয় আফ্রিকার কয়েকটি দেশ। দাসত্বের শৃঙ্খল পরিয়ে প্রাক্তন উপনিবেশের ১৪টি দরিদ্র দেশকে এখনও নানা রকম কর ও ভাড়া দিতে বাধ্য করছে ফ্রান্স। বিশ্বে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের পরিচয় শিল্পকলা, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে। সেই পরিচয়ের ছিটেফোঁটাও সাবেক ফরাসি উপনিবেশগুলোর ভাগ্যে জোটেনি। আফ্রিকা ও এশিয়াজুড়ে প্রায় দুই শতাব্দীকাল ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনে ফ্রান্স মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে, তৎকালীন ইন্দো-চীন বলে পরিচিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়।
উপনিবেশগুলোর মানুষের জীবনমান নিয়ে উদ্বেগ না থাকলেও অবশ্য ফ্রান্স এখনও বহু দরিদ্র আফ্রিকান দেশকে কর ও ভাড়া দিতে বাধ্য করছে। এর মাঝে ১০টি দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে শিক্ষাহার পুরো বিশ্বের মাঝে সবচেয়ে কম। প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষাহার-সহ হতভাগ্য দেশগুলোর মধ্যে ৮টি দেশের দিকে নজর দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এই ৮ দেশ হল বেনিন (৪০%), বুর্কিনা ফাসো (২৬%), চাদ (৩৪%), আইভরি কোস্ট (৪৯%), গায়ানা (২৯%), মালি (২৩%), নাইজার (২৯%) এবং সেনেগাল (৪২%)। ১৫০ বছরের ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনে এটাই সবচেয়ে চমকপ্রদ ফলাফল! ১৫০ বছর পর মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র যখন ১৯৬০ সালে ফ্রান্স থেকে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা লাভ করে, তখন পর্যন্ত সে দেশটির মাত্র একজন ব্যক্তি পিএইচডি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্বিত ফ্রান্স ন্যক্কারজনক অবস্থা রেখে গেছে তার আফ্রিকান কলোনিগুলোয়। আর এই অনগ্রসরতার সুযোগ নিয়ে এখনও এই ইউরোপীয় প্রভু আফ্রিকাকে সাংস্কৃতিক নির্ভরতা আর আর্থিক শোষণের বেড়াজালে বন্দি রাখতে পারছে। এসব দেশে গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণহত্যা অধিকাংশ সময়েই ঔপনিবেশিক শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইন্ধনে সংগঠিত হয়। ফ্রান্স এখনও এসব দেশে ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত সরকারি ভবন ও স্থাপনার ভাড়া বা কর আদায় করে থাকে।
এই প্রেক্ষিতে এখন ধরে নেওয়া যাক, স্বাধীনতার পরেও আমেরিকাকে হোয়াইট হাউজের ভাড়া ব্রিটেনকে দিতে হচ্ছে। কিংবা প্রাক্তন সোভিয়েত আমলে তৈরি করা পূর্ব ইউরোপের আবাসিক ভবনগুলোর ভাড়া আদায় করছে রাশিয়া! অবিশ্বাস্য এবং অবাস্তব এই শোষণ কিন্তু আফ্রিকার বাস্তবতা। প্রাকৃতিক সম্পদও অবাধে উত্তোলনের সুযোগ পায় ফরাসি কোম্পানিগুলো। নিয়ন্ত্রণ করে অনেক দেশের অর্থনীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ।
১৯৯০ এর দশকে যখন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, তখন প্রত্যেকটি দেশেই শিক্ষার হার ছিল একশো শতাংশ। একটি দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। শুধু শিক্ষা হার নয়; ১৯৯০-৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসান হওয়ার সময় এইসব দেশগুলোতে ছিল হাজার হাজার সুপ্রশিক্ষিত চিকিৎসক আর প্রকৌশলী। সোভিয়েতরা তৈরি করেছিল মানসম্মত বহু বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, আবাসন এলাকা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিকাঠামো।
স্বাধীনতা লাভের দুই দশক পর আজও পূর্ব ইউরোপের অধিকাংশ বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসন, অন্যান্য পরিকাঠামো সেই সোভিয়েত আমলেই তৈরি করা হয়। সেই তুলনায় মুক্ত-বিশ্বের সংস্কৃতিমনা নক্ষত্র ফ্রান্সের অবদান নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাই নয় কি?
————————
পেটে
ফরাসি ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য
নতুন পয়গাম: ফরাসি ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বলতে ১৭শ শতক থেকে ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ পর্যন্ত ইউরোপের বাইরের যে সমস্ত অঞ্চল ফ্রান্সের অধীনে ছিল, তাদেরকে বোঝায়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ফরাসি সাম্রাজ্য বিস্তারের চরমে পৌঁছেছিল। ওই সময় তাদের সাম্রাজ্যের আয়তন দাঁড়ায় ১ কোটি ২৩ লক্ষ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার।
স্পেনীয় এবং পর্তুগিজদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ফরাসিরাও উত্তর আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং ভারতীয় উপমহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আধিপত্যের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। ১৮শ ও ১৯শ শতকের শুরুর দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাথে একাধিক যুদ্ধে পরাজিত হবার পর ফ্রান্স তার ঔপনিবেশিক অভিলাষ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় এবং এর সাথে সাথে প্রথম ফরাসি ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটে। ১৯শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন করে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য স্থাপন করে ফ্রান্স। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) সময়েও এই উপনিবেশগুলি ফ্রান্সের অনুগত ছিল।
কিন্তু যুদ্ধের পরে উপনিবেশবাদ-বিরোধী আন্দোলন ফরাসি কর্তৃত্বকে অস্বীকার করা শুরু করে। ফ্রান্স ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনাম ও আলজেরিয়ায় ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য যুদ্ধ করেও ব্যর্থ হয়। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে বিভিন্ন মহাসাগরে অবস্থিত কয়েকটি দ্বীপপুঞ্জ বাদে ফ্রান্সের বেশিরভাগ উপনিবেশ স্বাধীনতা লাভ করে। অবশিষ্ট অঞ্চলগুলিকে ফ্রান্সের অংশ করে নেওয়া হয়।








