মূল্যবোধের মূল্যায়ন
মূল্যবোধ শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ করলে হয় মূল্য + বোধ। অর্থাৎ যে কোন ব্যক্তি বা বস্তুর মূল্য কতটা, সেই বোধ থাকা। মূল্যবোধ ছাড়া কোনকিছুর সঠিক মূল্যায়ন হয় না। সবার আগে মূল্যবোধ থাকতে হবে ব্যক্তির। তবেই ব্যক্তিনির্ভর পরিবার ও সমাজে মূল্যবোধের প্রতিফলন প্রতীয়মান রহবে। একথা অনস্বীকার্য যে, মূল্যবোধ ছাড়া দেহ-মনে সুস্থ সমাজে আমাদের বাঁচার কোনও উপায় নেই। একটা পরিবার আদর্শ হতে হলে এবং একটা সমাজকে সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর হতে হলে মূল্যবোধ অবশ্যই দরকার। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ছাড়া কোনকিছুর সঠিক মূল্যায়ন সম্ভবপর নয়। অর্থাৎ একটা ভাল ও সুস্থ সমাজে মূল্যবোধ ছাড়া আমাদের বাঁচার কোনও উপায় নেই। ভালভাবে বেঁচে থাকতে হলে মূল্যবোধের আশ্রয়ে থাকাই শ্রেয়। কিন্তু আজকের দিনে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের দিকে তাকালে মূল্যবোধ সেভাবে পরিলক্ষিত হয় না। এটা খুবই দুঃখজনক। কেউ কাউকে মানে না। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। কেউ কাউকে ভরসা করতে পারে না। এর কারণ, সর্বত্র মূল্যবোধের অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান সমাজে মূল্যবোধ একেবারেই তলানিতে। ঠিক-ভুল, ভাল-মন্দ, বৈধ-অবৈধ, হিত-গরহিত, উচিত-অনুচিত সবকিছুর পার্থক্য করে দেয় মূল্যবোধ।
আমাদের প্রথাগত ও পুঁথিগত শিক্ষাব্যবস্থা আমাদেরকে ঠিকমতো মূল্যবোধযুক্ত করেনি। ফলে আমরা নিজেদেরকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি। মানুষ হিসেবে এই সমাজে, জগৎ সংসারে আমাদের মূল্য কী — তার মূল্যায়ন আমরা করতে শিখিনি। আমরা কেবল আমাদের মূল্য চিনেছি, কিন্তু মূল্যবোধের প্রতি একাত্ব বা আত্মস্থ হতে পারিনি। কারণ, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় সেই বোধ আমাদের হয়নি। তাই আমরা কেবল দাবি করি, কিন্তু দায়িত্ব নিই না। আমরা কেবল অধিকার চাই, কিন্তু অধিকার আদায় করতে রাজি নই। এভাবেই আমরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছি বা উঠছি। সব ব্যাপারে কেবল সাবাশি পেতে চাই। অন্যের কাজে খুশি হয়ে তাকে সাবাশ দিতে রাজি নই। অর্থাৎ অন্যকে যথার্থ মূল্য দিতে বা যথাযথ মূল্যয়ন করতে রাজি নই।
আমরা মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। তাই সমাজের প্রতি আমাদের অনেক দায়িত্ব-কর্তব্য বা দায়বদ্ধতা আছে। সেটা আমরা ঘুণাক্ষরেও মনে রাখি না। তাই কেবলই সমাজ থেকে আমরা পেতে চাই। সব বিষয়ে আমরা কেবল আমাদের প্রাপ্তি যোগের অংক কষি, কোথায় কতটা লাভ, আর কতটা ক্ষতি। কিন্তু এই চাক্ষুস লাভ-ক্ষতির বাইরেও যে কিছু মানবিক দায়-দায়িত্ব থাকতে পারে, সেটা আমাদের বোধে আসে না। অধিকার চাইতে হলে, তার আগে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেটা আমরা ভুলেই বসেছি। এই সমাজ থেকে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, পাচ্ছি। অনেক কিছু শিখেছি, শিখছি। কিন্তু কী পাচ্ছি, আর কী শিখছি, সেটা ভাবতে হবে বৈকি। আমরাই শুধুমাত্র এই সমাজের উপাদান নই, পাশাপাশি রয়েছে আমাদের প্রতিবেশীরা, আমাদের সহনাগরিক তারা। তাদের প্রতিও আমাদের কিছু মানবিক দায়-দায়িত্ব আছে, বা থাকে। এটা ভুলে গেলে মূল্যবোধের আশা করাটাই বৃথা। অন্যের বিষয়ে কিছু ভাবা, কিছু করাটাই মূল্যবোধের পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হতে পারলে, তবেই আমি মনুষ্য পদবাচ্য হতে পারি, বা নিজেকে মানুষ বলে দাবি করতে পারি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল যুগে আমরা কেবল নিজেকে নিয়েও ব্যস্ত। নিজের ঢাক নিজে পেটাতেই অভ্যস্ত। সর্বনাশটা হচ্ছে এখানেই। অন্যকে মূল্য দিলে তবেই নিজের মূল্যায়ন হয়। এটাই হল মূল্যবোধের পরিচয়।
যে শুধু নিজেরটা বোঝে, তার থেকে অন্যের সম্মান আশা করাই বৃথা। কিন্তু লেখাপড়া শিখেও কেন আমরা ক্রমেই এমনটা কিম্ভূতকিমাকার হয়ে উঠছি, তার বিন্দুবিসর্গও জানি না। এর কারণ হল পরিবেশ, পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিকতা। এসবকিছুকে আমরা গুলে খেয়ে ফেলেছি। কিন্তু বাস্তবে তার লেশমাত্র দেখা যাচ্ছে না। তাহলে নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করাতেই হয়। তবেই ধরা পড়বে আমার মধ্যে মূল্যবোধ কতটুকু রয়েছে। আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মবিশ্লেষণ না করতে পারলে এগিয়ে যাওয়ার কোন মানেই হয় না। এ তো কেবল নিজের ছায়া মাড়িয়ে এগিয়ে চলা। এ চলায় মুক্তি নেই, আনন্দ নেই।
এতে করে আমরা দিনে দিনে যেন অসামাজিক হয়ে উঠছি। কিন্তু কেন আমরা এমনটা হয়ে যাচ্ছি, সে নিয়ে ভাবার অবকাশ বা ফুরসৎ নেই। দিনরাত একটাই মন্ত্র নিজের অজান্তে জপে চলেছি। সেটা হল চরৈবেতি। যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে। এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে আমরা শিক্ষিত হয়েছি। কিন্তু কথা ছিল, শিক্ষিত হওয়ার পর দীক্ষিত হওয়া। সেটা না হওয়ায় কেবলই আমিত্ববাদে ভুগছি। আমি আর আমরা হতে পারছি না। আমরা হতে পারলেও কল্পনায় প্রতিপক্ষ তৈরি করে নিচ্ছি। আমরা-র শত্রু হয়ে যাচ্ছে ওরা। ওরা শত্রু না হলেও আমরা ওদেরকে শত্রু ভাবছি। ফলে সমাজ বিনির্মাণে যে সামষ্টিক প্রয়াস বা দায়বদ্ধতা থাকা উচিৎ ছিল, সেটা আমাদের চেনা-জানা পরিসর থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। আমরা কেবল নিজেকে নিয়েই ভাবছি, অন্যের কথা বা সকলের কথা আমাদের বিবেচনায় থাকছে না। মূল্যবোধে এখানে কর্কটরোগে আক্রান্ত। আমরা যদি অন্যের বা সকলের কথা ভাবতে না পারি, তাহলে এই সমাজের কাছ থেকেও ভাল আশা করা অমূলক। তখন আমরা সমাজের উপাদান নয়, আমরা সমাজের কাছে বোঝা হিসেবে পরিগণিত হব। আর এখন সেটাই হচ্ছে। এ থেকে মুক্তির পথ হল, আপন হতে বাহির হওয়া। বদ্ধ ঘর থেকে বের হয়ে জগতটাকে দেখতে হবে।








