নির্বাচন কমিশন ও এসআইআর
মজিবুর রহমান:১৯৪৬-৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে এও স্থির হয়ে যায় যে, স্বাধীন ভারতে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হবে। এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হল জনপ্রতিনিধি নির্বাচন। নির্বাচনে সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার থাকে। কোটি কোটি মানুষের অংশগ্রহণ থাকা নির্বাচন ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট ও যথেষ্ট ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থা থাকা দরকার। এরূপ ভাবনা থেকেই সংবিধান প্রণয়নের কাজে নিযুক্ত গণপরিষদ সংবিধানের পঞ্চদশ অংশে ৩২৪–৩২৯ ধারার মধ্যে নির্বাচন সম্পর্কে আলোকপাত করে। নির্বাচন কমিশন গঠন ও তার কার্যাবলী উল্লেখ করা হয়। সংবিধানের পঞ্চদশ অংশের পরিপূরক হিসেবে ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন রচিত হয়।
সংবিধানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করার কথা বলা হয়। তবে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছে করলে অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারও নিয়োগ করতে পারেন। ১৯৮৯ সালে নবম লোকসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার মাত্র একদিন আগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অধীনে প্রথম বারের মতো আরও দু’জন নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু ১৯৯০ সালের ১ জানুয়ারি ওই দু’জন নির্বাচন কমিশনারকে তাঁদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর থেকে নির্বাচন কমিশন পুনরায় তিন সদস্যবিশিষ্ট হয়। কমিশনারদের কার্যকালের মেয়াদ ৬ বছর। তবে বয়স ৬৫ বছর হলে আর ওই পদে থাকা যায় না। অন্যান্য কমিশনারদের সহজেই বরখাস্ত করার নিয়ম থাকলেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করার জন্য সংসদে অভিশংসন প্রস্তাব (ইম্পিচমেন্ট মোশন) পাস করতে হয়।
নির্বাচন কমিশনকে সাহায্য করার জন্য নির্বাচনের ঠিক পূর্বে আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করা যায়। যেমন- প্রথম সাধারণ নির্বাচনে দু’জন এবং অষ্টম লোকসভা নির্বাচনে ছ’জন আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করা হয়েছিল। তাদের কার্যকালের মেয়াদ ৬ মাস। নির্বাচনের তিন মাস পূর্বে তাঁদের নিয়োগ করা হয়। বর্তমানে প্রতি রাজ্যে একজন করে পূর্ণ সময়ের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা চিফ ইলেক্টোরাল অফিসার (সিইও) রয়েছেন। তিনি নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্যের নির্বাচন পরিচালনা ব্যবস্থার মধ্যে যোগসূত্র রক্ষা করেন। ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতি জেলায় একজন করে জেলা নির্বাচন আধিকারিক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এই পদে কোনো পৃথক ব্যক্তি নিযুক্ত হন না। জেলাশাসকরাই সাধারণত এই দায়িত্ব পালন করেন। একইভাবে ডিএম, এসডিও, বিডিও-রা ভোটের সময় বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন কেন্দ্রের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। মহকুমা শাসকদের ‘ভোটার তালিকাভুক্তি আধিকারিক’ (ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ইআরও) এবং ব্লক পর্যায়ের কর্মীদের অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (এইআরও) হওয়ার কথা। প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকরা বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও হিসেবে কাজ করেন। এছাড়াও প্রতিটি নির্বাচনের সময় কয়েক লাখ সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী ভোট গ্ৰহণ ও গণনার জন্য নিযুক্ত হন।
সংবিধানের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হল পার্লামেন্ট, রাজ্য-আইনসভা, রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্ত কার্যাবলীর তত্ত্বাবধান, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ করা। নির্বাচন কমিশনের কর্মপরিধির মধ্যে রয়েছে ভোটার তালিকা প্রণয়ন, খসড়া ও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ। সংবিধান প্রবর্তনের সময় ভোটদাতার ন্যূনতম বয়স ছিল ২১ বছর। ১৯৮৮ সালে ৬১তম সংবিধান সংশোধনে ১৮ বছর করা হয়। নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বীকৃতিদান ও স্বীকৃতি প্রত্যাহার, প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ, নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ এবং বিজয়ী প্রার্থীদের শংসাপত্র প্রদান করে।
নির্বাচন সংক্রান্ত যে কোনও বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা প্রথমে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গঠিত নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের হাতে অর্পণ করা হয়। কিন্তু ১৯৬৬ সালে ১৯তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব আদালতের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।
নির্বাচনে ‘অসাধু আচরণ’ তথা উৎকোচ প্রদান, ভোটারদের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা গ্রহণ, ভোটকেন্দ্র থেকে ভোটপত্র অপসারণ প্রভৃতি কাজের জন্য নির্বাচন কমিশন যে কোনো নাগরিকের ভোটাধিকার ৬ বছরের জন্য কেড়ে নিতে পারে। অসাধু আচরণ করার জন্য শিবসেনার প্রয়াত শীর্ষনেতা বালা সাহেব ঠাকরে একবার তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। কোনো আদালত কর্তৃক নির্বাচন সংক্রান্ত অপরাধ বা দুর্নীতিমূলক আচরণের জন্য দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। এই আইনের প্রয়োগ ঘটেছিল লালু প্রসাদের ক্ষেত্রে।
ভোট প্রদানের মাধ্যমে একজন নাগরিক তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন ছাড়া সংসদীয় শাসনব্যবস্থা সাফল্য লাভ করতে পারে না। এজন্য মাঝেমধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন হয়। প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টি.এন শেষনের আমলে (১৯৯০-৯৬) একাধিক উল্লেখযোগ্য সংস্কার সাধন হতে দেখা যায়। যেমন, আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষণার দিন থেকে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য আদর্শ আচরণবিধি (মডেল কোড অব কন্ডাক্ট) কার্যকর হয়। প্রচারের জন্য প্রার্থীদের ব্যয়ের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করা হয়। প্রচারণায় সাম্প্রদায়িক ও বর্ণভিত্তিক মন্তব্য নিষিদ্ধ করা হয়। ভোট প্রচারের সময় মন্ত্রিসভা তথা আইনসভার সদস্যদের সরকারি সুযোগ সুবিধা ভোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। ১৯৯৩ সালে সকল ভোটারের জন্য সচিত্র পরিচয়পত্র বা এপিক চালু হয়। এখন ভোটার লিস্টেও ভোটারের ফটো থাকে। বাড়ি বাড়ি ভোটার স্লিপ পৌঁছে দেওয়া হয়। ১৯৯৯ সাল থেকে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে ভোট গ্ৰহণ করা হচ্ছে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে ভোটগ্ৰহণ কেন্দ্রে গিয়েও একজন ভোটারের কোনও প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ইভিএম-এ ‘নোটা’ সংযুক্ত করা হয়। ভিভিপ্যাট থেকে ভোটার দেখে নিতে পারেন, তিনি যে প্রার্থীকে ভোট দিলেন, তিনিই সেই ভোট পেলেন কিনা। আগে পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোটপর্ব শেষ হবার অব্যবহিত পরে ভোটগ্ৰহণ কেন্দ্রেই গণনা হত, এখন তা দিনকয়েক পর বিডিও অফিসের তত্ত্বাবধানে করা হয়। ২০১১ সাল থেকে ২৫ জানুয়ারি ‘জাতীয় ভোটার দিবস’ উদযাপন করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন নিয়মিত ভোটার তালিকা সংশোধন বা রিভিশন করে। বর্তমানে এই ত্রৈমাসিক প্রক্রিয়ায় নতুন ভোটারদের নাম সংযোজন এবং মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বিয়োজন করা হয়। এই একই কাজ বৃহৎ আকারে ‘নিবিড় সংশোধন’ বা ইনটেনসিভ রিভিশন (আই.আর) নাম দিয়ে ১৯৫২ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত ৮ বার করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে শেষ বারের মতো হয় ২০০২ সালে। পূর্বতন ‘আই.আর’ ২০২৫ সালে বিহার থেকে ‘এসআইআর’ বা ‘স্যার’ হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ‘স্যার’-এর উদ্দেশ্য একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরির থেকেও বেশি কিছু বলে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন যেকোন মূল্যে এরাজ্যে বিরাট সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত করছে বলে মনে হচ্ছে। প্রথমত, ‘স্যার’-এর জন্য নথিপত্রের যে তালিকা নির্ধারণ করা হয়, তা এ রাজ্যের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সকল সরকারি-বেসরকারি কাজে বহুল ব্যবহৃত আধার কার্ড, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড ‘স্যার’-এ ব্রাত্য করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আধার কার্ডকে মান্যতা দিলেও তার সঙ্গে নাগরিকত্বের প্রশ্ন জুড়ে দেওয়ায় বিভ্রান্তি ও বিতর্কের অবসান ঘটেনি। দ্বিতীয়ত, ভিত্তিবর্ষ হিসেবে ২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে গণ্য করা হয়। ২০০২ সালের পূর্বের অথবা ২০০২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ের ভোটার তালিকাগুলোর একটিও গ্ৰহণযোগ্য হয়নি। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবেই অযৌক্তিক। তবুও বিএলও-দের অক্লান্ত পরিশ্রম ও জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের ফলে যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়, তাতে দেখা যায় মতুয়া সম্প্রদায়ের বহু মানুষের নাম বাদ পড়া ছাড়া বাকি সবকিছু মোটামুটিভাবে ঠিক আছে। নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল, মতুয়াদের সমস্যার সমাধান-সহ খসড়া তালিকা সংশোধন করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা। কিন্তু তা না করে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র নামে ইললজিক্যাল অ্যাকটিভিটি শুরু করা হয়েছে। প্রতি সাতজনের মধ্যে একজনের নাম সন্দেহের তালিকায় উঠেছে। বেশকিছু বুথে ৫০ শতাংশের বেশি ভোটারকে নোটিশ ইস্যু করা হয়েছে। ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’-র অযৌক্তিকতার কারণে অশীতিপর-নবতিপর নাগরিক, রাজ্য-কেন্দ্র সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিক, জাতীয়-আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব এবং সাংসদ-বিধায়কদের শুনানিতে ডাক পড়ছে। হিয়ারিং-এর নামে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ ‘ডি-ভোটার’ হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে। নির্বাচন কমিশন কার্যত ‘নির্যাতন কমিশন’ হয়ে উঠেছে। কমিশনের নিত্যনতুন ফরমান কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়ে তথা অতিরিক্ত কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক বিএলও আত্মহত্যা করেছেন। অনেক জায়গায় বিএলও-রা গণইস্তফা দিয়েছেন। অনেক সাধারণ মানুষ এসআইআর আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অথবা আত্মহত্যা করে বসছেন। শুনানি কেন্দ্রগুলোতে মানুষ তিতিবিরক্ত হয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। একটা ভোটার তালিকা তৈরি করতে গিয়ে এরাজ্যে এমন লঙ্কাকাণ্ড এর আগে কখনও ঘটেনি। ঘোষিত উদ্দেশ্যের আড়ালে কমিশনের অন্য অভিসন্ধি রয়েছে বলেই এমনটি ঘটছে। তাছাড়া এখন যেহেতু ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার ব্যবস্থা রয়েছে, সেহেতু আড়ম্বরপূর্ণ এসআইআর প্রক্রিয়ার বিশেষ প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রচুর ক্ষমতা। কিন্তু সেই ক্ষমতার অপব্যবহার যাতে না হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে। কমিশন ‘লক্ষ্মণ রেখা’ মেনে কাজ না করলে সমস্যা সৃষ্টি হবেই। কমিশনকে বাস্তবসম্মত নিয়মাবলি ও নির্দেশাবলী জারি করতে হবে এবং সেই সঙ্গে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন সেই কাজে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
(লেখক: প্রধানশিক্ষক, কাবিলপুর হাইস্কুল, মুর্শিদাবাদ)








