নগর জীবন: ভীড়ের মাঝেও একা মানুষ
খান বাহাদুর শেখ:নগর জীবন আজ বৈপরীত্যে ভরা। চারদিকে মানুষের ভিড়, উঁচু ভবন, ব্যস্ত সড়ক আর কোলাহল। তবুও মানুষের মনে বাড়ছে একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা। শহরে মানুষ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু পারস্পরিক সম্পর্ক দিন দিন কমে যাচ্ছে। একই হাউজিং বা ফ্ল্যাটে বহু পরিবার বাস করলেও কেউ কাউকে চেনে না। একই লিফটে উঠেও চোখে চোখ মেলে না। ব্যস্ততা আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের ভেতরে হারিয়ে যাচ্ছে মানবিক সম্পর্ক। ভীড়ের মাঝেও সবাই যেন একা।
এক সময় পাড়া-মহল্লা ছিল সামাজিক বন্ধনের জায়গা। প্রতিবেশী মানেই ছিল আপনজন। বিপদে-আপদে সবাই সবার পাশে দাঁড়াত। এখন সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। ফ্ল্যাট কালচারে মানুষ নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। সবাই যেন ক্রমে বনসাই হয়ে যাচ্ছে। দরজা বন্ধ থাকে, কিন্তু মোবাইল ফোন সারাক্ষণ খোলা। ভার্চুয়াল যোগাযোগ বাড়লেও বাস্তবের মাটিতে সম্পর্ক কমে যাচ্ছে।
কলকাতার নিউটাউনে এক বহুতল ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকেন গৈরিক দাশ। বয়স ৬২ বছর। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তিন বছর আগে স্ত্রী মারা গেছেন। দুই ছেলে কর্মসূত্রে বিদেশে থাকেন। একই ভবনে শতাধিক মানুষ থাকলেও গৈরিকবাবু কার্যত একাই থাকেন। সকালে উঠে নিজেই চা বানান, নিজেই খাবার গরম করেন। অসুস্থ হলে খবর নেওয়ার মানুষও পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, “আগে যখন গ্রামে থাকতাম, মানুষ এসে খোঁজ খবর নিত। এখন ফোন করলেও সবাই ব্যস্ত। সত্যিকার ব্যস্ত না থাকলেও ব্যস্ততার ভান করে। মনে হয় আমি এখন কারও প্রিয়জন নই, কারণ আমাকে এখন কারো প্রয়োজনে লাগে না।” তার কথায় ক্ষোভ নেই, আছে নিঃশব্দ কষ্ট, আর একবুক অভিমান। শহরের হাজারো প্রবীণ মানুষ আজ এই একাকীত্ব নিয়ে বেঁচে আছেন, যা চোখে পড়ে না, কিন্তু প্রতিদিন ভেতরে ভেতরে মানুষকে নিস্তব্ধ করে দেয়। এসব বয়স্কদের দরকার কাছের মানুষ। কাছে মানুষ থাকলেও তারা সব যেন অন্ধের জন্য চশমার মতো, তারা কেউ লাঠি নয়।
অন্যদিকে নগর জীবনের তরুণ প্রজন্মও একাকীত্ব থেকে মুক্ত নয়। দেবরাজ দত্ত, বয়স ২৮। এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জব করে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিসের কাজের চাপ। সপ্তাহ শেষে ছুটির নিশ্চয়তা নেই। তার বন্ধুর সংখ্যা নেহাৎ কম নয়, সোশ্যাল মিডিয়াতেও বেশ সক্রিয়। তবুও দিন শেষে ঘরে ফিরে সে নিজেকে ভীষণ একা মনে করে।
দেবরাজ বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই আছে, কিন্তু কথা বলার মতো কেউ নেই। হাসি দিই, কাজ করি, কিন্তু মনে হয় কেউ আমাকে সত্যি বোঝে না।” আধুনিক শহরে তরুণদের এই নিঃসঙ্গতা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
নগর বা শহুরে জীবনের একাকীত্ব আসলে নীরব এক সংকট। আমরা সময়ের অজুহাতে সম্পর্ক এড়িয়ে চলছি। পারস্পরিক বন্ধন শিথিল করে নিচ্ছি। বড্ড বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি। নিজের মতো থাকাকেই স্বাধীনতা ভাবছি। অথচ মানুষ সামাজিক জীব। পারস্পরিক যোগাযোগ, আর সম্পর্ক ছাড়া মানুষ বেশিদিন ভাল থাকতে পারে না।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুব জটিল নয়। দরকার মানসিকতা বদলানো। প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলা, প্রবীণ মানুষের খোঁজ নেওয়া, সহকর্মীর কথা মন দিয়ে শোনা — এসব ছোটখাট অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলেই বড় পরিবর্তন আসতে পারে। আবাসিক এলাকায় সামাজিক কার্যক্রম বাড়ানো, কমিউনিটি সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারে সময় দেওয়া এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।
সময়ের হাত ধরে শহর আধুনিক হতেই পারে, কিন্তু মানবিক না হলে সেই শহর অনুর্বর, অর্থহীন, বন্ধ্যা। এমন শহরে বসবাস করা মানুষগুলোও যেন জড় পদার্থ হয়ে যায়, যান্ত্রিক হয়ে যায়। মানুষ শুধু দালান-কোঠায় বাঁচে না, মানুষ বাঁচে মানবিক সংবেদনশীলতার মধ্যে। তাই নগর জীবনে সেই সম্পর্ক ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।




