শাসন নয়, শিশুর প্রয়োজন ভালবাসা
লীনা ফেরদৌস
শিশু জন্মের পর পৃথিবীতে এসেই মায়ের কোল, বাবার স্পর্শ, পরিবারের স্নেহের মধ্য দিয়েই পৃথিবীকে চিনতে শুরু করে। তার প্রথম চাহিদা তিনটি — নিরাপত্তা, ভালবাসা এবং বোঝাপড়া। কান্না, হাত বাড়ানো, মায়ের বুকে মুখ লুকোনো — এ সবই বলে দেয় সে ভরসা খুঁজছে, একজন নিরাপদ মানুষ খুঁজছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুরা বড়দের মতো আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তারা রাগ, আনন্দ, বিরক্তি বা দুঃখ — সবকিছুর প্রকাশ সরলভাবে করে। অনেক সময় যা আমাদের চোখে ভুল মনে হয়, তা তাদের কৌতূহল, ক্লান্তি বা আবেগ সামলাতে অক্ষমতার ফল। তাই শিশুর ভুলকে শাস্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। এতে শিশু চিন্তা করতে, অনুভব করতে এবং নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে শেখে।
শিশুরা প্রথম শেখে তার পরিবার থেকেই। মা-বাবা, দিদি-দাদা, কাকা-কাকিমা, দাদু-দিদা এবং যারা প্রতিদিন তাকে ভালবাসা, স্পর্শ ও স্নেহ-মমতার মাধ্যমে বড় করে তোলে। বড়দের আচরণ, ধৈর্য ও স্নেহই তার ভেতর নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু অনেক সময় শিশুর কান্না বা আচরণের মূলে কী অনুভূতি আছে, তা না বুঝেই আমরা বকাবকি শুরু করি। ‘চুপ করো’, ‘এত কান্না কেন?’, ‘ভাল বাচ্চারা এমন করে না’ ইত্যাদি। এতে শিশু শেখে তার অনুভূতিকে প্রকাশ করা নিরাপদ নয়, ফলে সে সংকুচিত হয়ে পড়ে, নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে, নিজের কথা বলতে ভয় পায় এবং তার মধ্যে ভুল লুকানোর অভ্যাস তৈরি হয়। অথচ যদি একটু ধৈর্য নিয়ে প্রশ্ন করা হয় — ‘কী হল?’, ‘তোমার কেমন লাগছে?’, ‘চলো দেখি কীভাবে ঠিক করা যায়’ — তাহলে সে অনুভব করে, তার কথা গুরুত্বপূর্ণ। ভুল তখন শাস্তির নয়, শেখার সুযোগ হয়ে ওঠে। তাই শিশুর মানসিক বিকাশে বকাঝকা নয়, প্রয়োজন স্নেহ, সহানুভূতি ও বোঝাপড়া।
শিশু ভুল করলে বুঝতে হবে সে কেন এমনটা করল। যদি বাবা-মা প্রশ্ন করেন, ‘তোমার কী মনে হয়েছিল?’, ‘তোমার কেমন লেগেছে?’, ‘এখন কীভাবে ঠিক করা যায়?’, তাহলে শিশু চিন্তা করতে শেখে। সে বুঝতে পারে। এতে শিশুর সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ে, যা তার ভবিষ্যতের জন্য দরকারি।
শিশুর মানসিক বিকাশে ভালবাসার ভূমিকা অসাধারণ। যে শিশু বাড়িতে আদর পায়, তাকে গ্রহণ করা হয়, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় — সে বড় হয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়। বাবা-মায়ের গলা, চোখের আশ্বাস, বুকে জড়িয়ে ধরা — এ সবই শিশুর মস্তিষ্ক তথা স্নায়ুর বিকাশ ঘটায়। যদি শিশু শোনে — ‘তুমি পারবে’, ‘আমি তোমার পাশে আছি’ — তবে সে কাজ করার সাহস পায়, মনোযোগ বাড়ে এবং ব্যর্থ হলেও আবার চেষ্টা করতে পারে। যদি শিশুর ভাল কাজ বা ছোট ছোট উন্নতিগুলোর প্রশংসা করা হয়, যেমন ‘বাহ খুব ভাল’, ‘তুমি চেষ্টা করেছ’ — তাহলে সে নিজের ভেতরের শক্তি খুঁজে পায়। প্রশংসা তাকে আরও ভাল হতে উৎসাহ দেয়।
শাসন মানেই কঠোর হতে হবে — এ ধারণা বদলানোর সময় এসেছে। শাসন এমন হতে পারে, যা শেখায়, আচরণ বুঝতে সাহায্য করে এবং ভাল করার উৎসাহ দেয়। যখন বাবা-মা নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে শান্তভাবে কথা বলেন, তখন শিশুর মধ্যেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। কারণ, শিশু শুধু কথা শোনে না, বড়দের আচরণ থেকেও শেখে। কঠোর শাসনের প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে শিশুর ব্যক্তিত্বে নেতিবাচক ছাপ ফেলে। বকা, অপমান, চিৎকার বা শাস্তির মধ্যে যেসব শিশু বড় হয়, তারা ভয় পেয়ে শেখে। এতে তারা স্বাভাবিকভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে ভয় পায়, নিজের ভুল ঢাকতে শেখে এবং ভবিষ্যতের সম্পর্কেও অস্থিরতা তৈরি হয়। অনেক সময় এমন শিশু বড় হলে তুচ্ছ কারণে রেগে যায়, ভেঙে পড়ে বা চাপ নিতে পারে না। অন্যদিকে, যে শিশুকে সম্মান, বোঝাপড়া এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়, সে নিজের আচরণ নিয়ে ভাবতে শেখে। সে বুঝতে পারে ভাল-মন্দ, চিনতে পারে নিজের আবেগ। এভাবেই সে ধীরে ধীরে সহানুভূতিশীল, দায়িত্ববান এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।
একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তার শৈশবের অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। পরিবার যদি তাকে ভালবাসা, নিরাপত্তা, সহানুভূতি ও সম্মান দেয়, তবে সে বড় হয়ে আত্মবিশ্বাসী, সামাজিক ও মানবিক মানুষ হবে। কঠোর শাসন হয়ত সাময়িক কাজ করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। তাই প্রয়োজন পজিটিভ প্যারেন্টিং বা ইতিবাচক অভিভাবকত্ব — যেখানে স্নেহ, বোঝাপড়া এবং সঠিক দিকনির্দেশনায় শিশু বেড়ে ওঠে। শিশুর মানসিক বিকাশে শাসন নয়, সহায়ক হন। কারণ, ভালবাসাই জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।








