ভাঙড় থেকে রেডিও’র মাধ্যমে বিশ্বজয় চন্দন মুন্সীর
নতুন পয়গাম:
বাংলা তথা ভাঙড়ের ভূমিকে গর্বিত করেছেন এবং আগামী প্রজন্মের শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের ইনফরমেশন টেকনোলজির ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা ভাঙড়-১ নং ব্লকের দক্ষিণ প্রান্তের মাধবপুর গ্রামের বাসিন্দা Provision Technologies গ্রুপের কর্ণধার চন্দন মুন্সী।
শিক্ষা জীবন: প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের মাধবপুর অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তাড়দহ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক, কালিকাপুর রামকমল বিদ্যাপীঠ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং বঙ্গবাসী কলেজ থেকে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স (সাম্মানিক) নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেন। কম্পিউটার শিক্ষার প্রতি অগাধ ভালবাসার কারণে এমএসসি না করে কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ২ বছর পড়াশোনা করেন। কীভাবে এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে তথ্য আদান-প্রদান হয়, কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার ইত্যাদি জটিল বিষয় শেখেন।
রেডিও-তে বিশ্বজয়: নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন বাড়ির রেডিওটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে রেডিও’র পিছনের দিকের ব্যান্ড সিলেক্টর চেঞ্জ করে সর্টওয়েভ করে দিলেন। দেখলেন চ্যা চু আওয়াজ হতে হতে টিউনার এদিক ওদিক ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎই শুনতে পান বাংলায় একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে এবং মাঝে মাঝেই বলছে ‘ভয়েস অব আমেরিকা-বাংলা বিভাগ’। এর আগে তিনি কোনোদিন জানতেন না যে, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের বাইরে আর কোথাও বাংলায় কিছু হয়। সেই শুরু, তারপর রোজ একটু একটু করে এদিক ওদিক এক্সপ্লোর করতে করতে বুঝতে পারলেন, আকাশবাণীর মতো অনেক দেশেরই রেডিও স্টেশন থেকে অন্য দেশের ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার হয়। চন্দন মুন্সির কাছে যেন এক অজানা দুনিয়া খুলে গেল। অচিরেই জানতে পারলেনস রেডিও শোনার শখের নাম D-Xing। D ফর ডিস্ট্যান্স, আর X ফর আননোন রেডিও স্টেশন। এটা অনেকটা আমেচার রেডিও বা হ্যাম রেডিও’র মতো। যদিও হ্যাম রেডিও’র উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা।
যাহোক, এই করতে করতে তিনি দেখলেন ভারত, বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, সৌদি আরব, ইরান, চীন, জাপান, ফিলিপিন্স, মিশর, জার্মানি, ইংল্যান্ড এবং আমেরিকা থেকেও বাংলায় অনুষ্ঠান হয়। এদের সবার সঙ্গে ধীরে ধীরে যোগাযোগ শুরু করলেন চিঠি লেখার মাধ্যমে। একবার এক প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় জার্মানির রেডিও স্টেশন ‘ডয়চেভেলে’-এর বাংলা বিভাগে তিনি ফার্স্ট হলেন এবং পুরস্কার হিসেবে পেলেন ১০০ জার্মান মার্ক। এরকম আরো অনেক দেশ থেকে নানা রকমের উপহার পেয়েছেন।
ইংরেজী অনুষ্ঠানের জন্য যোগাযোগ করলেন দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, স্পেন, সুইডেন, নরওয়ে, রাশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া, চেকস্লোভাকিয়া, কিউবা, হাঙ্গেরি ইত্যাদি দেশের সঙ্গে। এদের সঙ্গে নিয়মিত চিঠিপত্রে যোগাযোগ করেন ২০০৪ সাল পর্যন্ত। জাপানের ঐতিহ্যবাহী হাতপাখা, দক্ষিণ আফ্রিকার টুপি, ফিলিপিন্সের টি-শার্ট, জার্মানির ঘড়ি — এসব এখনো তাঁর বাড়িতে রয়েছে। আর রয়েছে অজস্র চিঠি, একটা বড় ঘর জুড়ে আনুমানিক ২০-২২ হাজার হবে।
একদা নিজে রেডিও বিষয়ে একটা দ্বি-মাসিক পত্রিকাও প্রকাশ করতেন। ভারত এবং বাংলাদেশ থেকে অনেকেই সেখানে লিখতেন। প্রথম দিকে সেই ম্যাগাজিন হাতে লিখে প্রকাশ করতেন, পরে কম্পিউটারে। সময়ের সাথে সাথে রেডিও’র গুরুত্ব কমতে থাকে এবং ইন্টারনেট আসার পরপরই রেডিও’র মৃত্যুঘণ্টা বেজে যায়। পরে সর্টওয়েভ থেকে আরো একটা নতুন প্রযুক্তি এসেছিল, যার নাম DRM। কিন্তু রেডিও’র প্রতি সেই অদম্য আকর্ষণ হারিয়ে গেল। ততদিনে এফ.এম. এসে গেছে এবং দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
কর্মজীবন ও সঙ্গী রোগ: প্রথম চাকরি এক ছোট আইটি কোম্পানিতে। কিন্তু মায়ের কিডনির রোগ ধরা পড়ায় তিনি চাকরি ছেড়ে মায়ের কাছে সর্বক্ষণ থাকতেন এবং অসুস্থ মা’কে সময় দিতেন, সেবা-যত্ন করতেন। তার আব্বা শিক্ষকতার কারণে সারাদিন প্রায় স্কুলেই থাকতেন। অগত্যা বাড়ির কাছে শিশু বিকাশ একাডেমিতে কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে বছর দুয়েক শিক্ষকতা করেন।
তারপর প্রতিষ্ঠা করলেন নিজস্ব কোম্পানী Provision Technologies, আইটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও সাইবার সিকিউরিটি। এরই মাঝে ২০১৯ সালে আক্রান্ত হলেন কিডনির অসুখে। ডাক্তার বলে দিলেন ভবিষ্যতে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হবে। শেষে অনেক যন্ত্রণার পর ২০২২ সালে স্ত্রী’র সঙ্গে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন হয় এবং এক নতুন জীবন ফিরে পান।
বর্তমানে Provision Technologies-এর ক্লায়েন্ট বা কাস্টমার রয়েছে ভারত ছাড়াও পাকিস্তান, ইরাক, আফগানিস্তান, ভুটান, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, চায়না, ভিয়েতনাম, উগান্ডা, ক্যামেরুন, স্পেন, পেরু, ভেনেজুয়েলা প্রভৃতি নানা দেশে। জীবনে অনেক বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে লক্ষ্য স্থির রেখে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও যে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো যায়, ভুবন জয় করা সম্ভব, তার জ্বলন্ত উদাহরণ চন্দন মুন্সী।








