বর্ণপরিচয় থেকে বিশ্বপরিচয়
লেখক- মুহাম্মাদ শামসুদ্দোহা কাসেমী
ছোটবেলায় যখন ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখা বই ‘বর্ণপরিচয়’ পড়েছিলাম, তখন বুঝতে পারিনি ‘পরিচয়’ শব্দের অর্থ কী। তখন শুধু এতটুকুই জানতাম যে, এটি একটি বইয়ের নাম। এরপর ধীরে ধীরে যত বয়স বাড়ল, তত বহুবিধ জিনিসের সঙ্গে পরিচয় হতে লাগল। দেখলাম, জীবন নামক গাড়ির চলার জন্য শুধু বর্ণপরিচয় যথেষ্ট নয়। বর্ণপরিচয়ের পাশাপাশি আরো অনেক কিছুর সঙ্গে পরিচয় হওয়া প্রয়োজন।
বর্ণপরিচয়ের পথ ধরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন নিত্যনতুন বইয়ের সঙ্গে পরিচয় হল। তার মধ্যে কিছু বই সিলেবাসভুক্ত, আর কিছু বই সিলেবাস বহির্ভূত। কিছু বই অক্ষর দিয়ে লেখা, আবার কিছু বই অক্ষর ছাড়াই লেখা।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্কুলও পরিবর্তন হল। নতুন নতুন বন্ধুদের সাথে পরিচয় হল। সেই সাথে নতুন পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় হল। এক পর্যায়ে এশিয়ার বিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের সাথে পরিচয় হল। সেখানে পরিচয় হল বিশ্ব পরিবারের সাথে। জ্ঞানের যে একটা সুবিশাল সাগর আছে, তার সাথে এখানে এসে পরিচয় হল। এরপর যেদিন বাইতুল্লাহ দেখলাম, সোনার মদীনা দেখলাম, সেদিন মনে হল সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে দেখলাম। নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান। বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।
পরিচয়ের পরিধি দিন দিন বাড়তে লাগল। বইয়ের মাধ্যমে লেখকদের সাথে পরিচয় হল। আর লেখালিখির মাধ্যমে বহু পাঠক পাঠিকার সাথে পরিচয় হল। নেট জগতের সাথে যখন পরিচয় হল, তখন বুঝলাম পৃথিবীটা এখন হাতের মুঠোয়। এর নাম গ্লোবাল ভিলেজ বা ভুবন-গ্রাম।
ছোটবেলায় যখন বাসে চড়তাম, তখন প্রায়ই দেখতাম একটি বাক্য লেখা আছে — ”আপনার ব্যবহারই আপনার পরিচয়।” তখন এ কথার মানে অতটা বুঝতাম না। এখন বেশ বুঝি মানুষের আসল পরিচয় প্রকাশ পায় তার ব্যবহারে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, বিদ্যা সহজ, শিক্ষা কঠিন। বিদ্যা থাকে আবরণে আর শিক্ষা থাকে আচরণে। প্রবাদে আছে, মানুষের কথার দ্বারা তার জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়, কর্মের দ্বারা তার দক্ষতা-যোগ্যতার পরিচয় পাওয়া যায়, আর ব্যবহার দ্বারা তার বংশের পরিচয় পাওয়া যায়।
ইমাম গাজ্জালী (রহ.)-এর লেখনীর সাথে যারা পরিচিত, তারা জানেন তিনি চারটি জিনিসের সাথে পরিচিত হওয়ার কথা বলেছেন। এই চারটি জিনিসকে তিনি চারটি শব্দে ব্যক্ত করেছেন। আত্মদর্শন, তত্ত্বদর্শন, সংসার দর্শন ও পরকাল দর্শন। তার মানে হল, তিনি নিজেকে চিনতে বলেছেন, মহান প্রভুকে চিনতে বলেছেন, বিশ্ব জগতকে চিনতে বলেছেন, আর মৃত্যুর পরবর্তী জগতকে চিনতে বলেছেন। এই চারের মধ্যে তিনি সবকিছুকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ইসলাম সর্বদা অজানাকে জানতে বলেছে, আর অচেনাকে চিনতে বলেছে। এভাবে জ্ঞানের পরিধিকে বাড়াতে বলেছে। মানুষের জানার পরিধি যত বাড়বে, পরিচয়ের পরিধিও তত বাড়বে।
যতগুলো সাবজেক্ট বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়, তার মূল কেন্দ্রবিন্দু হল সেই বিষয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীর পরিচয় ঘটানো। ইতিহাস আমাদেরকে অতীতের সঙ্গে পরিচয় ঘটায়। ভূগোল আমাদেরকে বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় ঘটায়। বিজ্ঞান আমাদেরকে বিভিন্ন সৃষ্টি জগতের সঙ্গে পরিচয় ঘটায়। গণিত আমাদেরকে হিসাব শাস্ত্রের সঙ্গে পরিচয় ঘটায়। এইভাবে ভাষা আমাদেরকে মনের ভাব আদান-প্রদানের সঙ্গে পরিচয় ঘটায়। আর পবিত্র জীবনবিধান কুরআন মাজীদ সব জ্ঞানের সঙ্গে পরিচয় ঘটায়। সৃষ্টি জগতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে পরিচয় ঘটায়। সর্বোপরি মহান আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর বিপুল সৃষ্টি জগতের সঙ্গে পরিচয় ঘটান। মানুষ তখন বুঝতে পারে, এ জগতে তাকে কেন পাঠানো হয়েছে। তার দায়িত্ব কী। তার জীবনের গন্তব্যস্থল কী।
সরকার নানা রকম পরিচয়পত্র দেওয়া শুরু করেছে। এপিক কার্ড, আইডেন্টিটি কার্ড, আধার কার্ড, স্বাস্থ্য সাথী কার্ড, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড, পাসপোর্ট ইত্যাদি। না জানি এ ধরনের আরো কত পরিচয়পত্র আছে ও পরবর্তীতে আরো কত তৈরি হবে। বেশ কিছুদিন আগে এক জায়গায় দেখলাম লেখা আছে, ”আপনার বাড়িই আপনার পরিচয়।” মানে বাড়ি দেখে বোঝা যাবে আপনার অর্থনৈতিক অবস্থা।
এক শ্রেণির মানুষ পোশাক দেখে মানুষের পরিচয় নির্ণয় করে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিভিন্ন অফিসে পোশাকের জন্য তাদের আলাদা করে চেক করা হয়। ধর্মীয় পরিচয়ের কোন চিহ্ন তারা সহ্য করতে পারে না। আমার চেতনার বাতি মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরী (রহ.) বলেছিলেন, মানুষের বড় হওয়ার পরিচয় হল সূক্ষ্ম চিন্তা। যে মানুষ চিন্তায় যত বড়, সে মানুষ আসলে তত বড়।
বাইকে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে সামনে বাম্পার দেখে আমার ছেলে-মেয়েদের জিজ্ঞাসা করি, বলো তো ওটা কী? উত্তরে তারা বলে ওটা হল জীবন পথের বাধা। গাড়ির পিছনে অনেক ভাল ভাল কথা লেখা থাকে। তার মধ্যে একটি কথা হলো ‘মানুষ চিনতে পুঁজি শেষ’। জীবনের মধ্য গগনে এসে দেখছি, কত পরিচিত মানুষ ধীরে ধীরে অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে, আবার কত অপরিচিত মানুষ ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে। কত আপন পর হচ্ছে, আর কত পর আপন হচ্ছে। পরিচয় ও অপরিচয়ের ধারণা পাল্টে যাচ্ছে।
আগে দেখতাম, ট্রেনের সিটে বসে মানুষ সহযাত্রীদের সঙ্গে গল্পগুজব করত। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হত। কিন্তু এখন দেখছি, কেউ কারো সঙ্গে সচরাচর কথা বলে না। সবাই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। ছোট্ট এই যন্ত্রটি যেন বিশ্বপরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।
আমি আবার একটু উল্টো কথা বলা মানুষ। জাগ্রত বিবেক সম্পন্ন প্রাণীকে বলি মানুষ। মানুষ গড়ার কারিগরকে বলি শিক্ষক। মানুষ গড়ার কারখানাকে বলি বিদ্যালয়। বইকে বলি নীরব শিক্ষক। শিক্ষককে বলি সরব বই। প্রকৃতিকে বলি নীরব পাঠশালা। আমার আদর্শ সাহিত্যিক আবু তাহের মেসবাহ সাহেব বলেন, আমরা যত পিছব, ততই এগোব; আর যত এগোব, তত পিছব।
এ কথার মানে হল, আমরা যত স্বর্ণযুগের কাছাকাছি পৌঁছব, তত উন্নতি লাভ করব; আর যত স্বর্ণযুগ থেকে দূরে সরে যাব, তত পিছিয়ে পড়ব। সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনদের যুগকে ইসলামী পরিভাষায় ‘খয়রুল কুরুন’ বলা হয়। যার বাংলা অর্থ স্বর্ণযুগ। স্বর্ণযুগের মানুষদের উপরে মহান আল্লাহ তা’আলা সর্বদা বর্ষণ করুন তাঁর সীমাহীন করুণার দৃষ্টি ও বৃষ্টি। আমীন।
আমার মরহুম আব্বাজানকে আমার আদর্শ শিক্ষক হযরত মাওলানা সাইফুদ্দীন সাহেব একবার বলেছিলেন, ছেলেকে পরিচয় দিতে বলুন। যেসব ছেলে ক্লাসে আমাকে প্রশ্ন করে জ্বালাতন করে, আমি শুধুমাত্র তাদেরকেই চিনি। অন্যদের চিনি না। যাহোক, কথা অনেক লম্বা হয়ে যাচ্ছে, বর্ণপরিচয় দিয়ে সেই যে অক্ষর পরিচয় শুরু হল, এখনো সেই পরিচয় শেষ হল না। বিশ্বপরিচয়ের পরে একদিন পরিচয় হবে মৃত্যুর ফেরেশতার সাথে। তারপর কবরের সাথে। সেই সাথে হাশরের ময়দানের সাথে। সবশেষে জান্নাত কিংবা জাহান্নামের সাথে। মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে জাহান্নামের আগুন থেকে হেফাযত করুন। জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। সেই সাথে আমাদের সকলকে তাঁর অসীম, মহাপরাক্রম, নিরঙ্কুশ ও সার্বভৌম ক্ষমতার সাথে পরিচিত হওয়ার তাওফীক দিন। তাঁর সুপরিচিত বান্দা-বান্দীদের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটিয়ে দিন। যে পরিচয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি খুশি হন, সেই পরিচয়ে আমাদেরকে পরিচিত হওয়ার তাওফীক দান করুন। ঘরে ও বাইরে। দেশে ও বিদেশে। মাটির উপরে ও নীচে। একেবারে জান্নাত পর্যন্ত। যেখানে পরিচয় হবে সকল অপরিচিত মানুষের সাথে। সকল অপরিচিত জিনিসের সাথে। আর সবশেষে পরিচয় হবে মহান রব্বুল আলামীনের সাথে, ইনশাআল্লাহ। আমীন।








