পিছিয়েপড়া, নাকি পিছিয়ে রাখা হয়েছে?
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
পশ্চিমবঙ্গ: সংখ্যালঘুরা নিজেদের চাপে বা বৈষম্যে পিছিয়ে, নাকি সমাজ-রাজনীতির স্ট্রাকচারে তাঁদের পিছিয়ে রাখা হয়েছে? এই সহজ অথচ গভীর প্রশ্ন আমাদের রাজ্য ও সমাজকে মুখোমুখি করে আজ। সংখ্যালঘু বলতে আমরা সাধারণত মুসলিম, নির্দিষ্ট ওবিসি-সহ অন্যান্য জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে বুঝি। তাদের অবস্থান, শিক্ষা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, প্রতিরোধ ক্ষমতা — এসব প্রশ্ন আমাদের রাজ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাস, রাজনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক দক্ষতা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
প্রথমেই বলতে হয় বর্তমান রাজ্যে সংখ্যালঘুরা নাকি পিছিয়ে আছে, তা স্বীকার করতে এক-দুইটা সংখ্যা যথেষ্ট নয়। তবে আমাদের কাছে কিছু ব্যবহারযোগ্য তথ্য আছে। সম্প্রতি রাজ্যে ১৪০টি ওবিসি উপগোষ্ঠী চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে মুসলিম উপগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশ বড় ওবিসি-এ বিভাগে ৮১টি, ওবিসি-বি ক্যাটিগোরিতে ৯৯টি, মোট মুসলিম উপগোষ্ঠী যথাক্রমে ৫৬ ও ৪১টি। মুসলিম উপগোষ্ঠীর অনুপাত মোট তালিকায় যথাক্রমে ৭৩.৪% ও ৪৮.৩%। অর্থাৎ মোটের অধিকাংশ। এ তথ্য স্পষ্ট বলে, সংঘাতপূর্ণ সিদ্ধান্ত তুলে ধরা হয়েছে, তবে বিচার্য যে, এত আর্থ-সামাজিক প্রতিবন্ধকতায় নির্ভরকরণ শুধু ধর্মের ওপর, না কি প্রামাণ্য আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণে — তা নিয়েও রাজনীতি চলছে। মুখ্যমন্ত্রী তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, Religion নয়, Backwardness-ই একমাত্র মাপকাঠি।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এভাবে সরকারি ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হলে কি সংখ্যালঘু ঠিকই পেছনে পড়ে, নাকি তাঁদের পিছিয়ে রাখা হচ্ছে? পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা প্রামাণ্যভাবে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করতে পারে।
নদিয়ায় এক পরিবার তাঁর মেয়েকে ‘মৃত’ ঘোষণা করেছে। কারণ, সে মুসলিম ছেলের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে এবং তাঁকে ‘শ্রাদ্ধ’ দেওয়া হয়েছে। এটিই প্রতীকী, যেখানে বৈবাহিক স্বাধীনতা থেকেও সংখ্যালঘুদের বঞ্চনা স্পষ্ট হয়। এছাড়া, পূর্ব বর্ধমানের এক সরকারি স্কুলে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে মধ্যাহ্নভোজন উভয় সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েদের জন্য পৃথকভাবে পরিবেশন হত ধর্মীয় ভিত্তিতে institutionalized segregation। এই দুই ঘটনা দেখায়, সামাজিক কাঠামোয় সংখ্যালঘুকে পিছনে ফেলা কিংবা বণ্টন একেবারে বিদ্যমান, প্রথাগত না হলেও এখনও বাস্তব।
যেখানে তাঁরা রাজনীতির দাহ-মুক্ত স্ট্যাটাস পেতে পারেন, আর্থ-সামাজিক প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত হতে পারেন না। বাস্তব জীবনে গেট পেতে হয় শ্রেণি, সমাজ, প্রশাসন, ভাষা, ধর্ম — একে একে। পূর্ব বর্ধমানের গিধাগ্রামে ৫৫০ জন দলিত ঢুকলেন প্রথমবার স্থানীয় মন্দিরে। বিগত ৩০০ বছরেও প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। এই ঘটনা দেখায় ‘বেঙ্গলে কাস্ট নেই’ — এই ধারণা যতটা সামাজিক বিষয়তত্ত্বে উপস্থাপিত হয়, বাস্তবতায় তেমন নয়।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও সমস্যা: মুসলিম মহিলারা কলেজ-উচ্চশিক্ষায় ইসলামী পোশাক পরায় বৈষম্যের শিকার হন। হিজাব বা বোরকা পরায় শিক্ষক বা সহপাঠীরা Oppressed বা Backward হিসেবে মানসিকভাবে টেনে তোলেন, তাঁদের শারীরিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এতে শিক্ষার্থীর আত্মমর্যাদা ও একাডেমিক কর্মক্ষমতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।
ওবিসি কোটা নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে রাজ্যে স্নাতকোত্তরে ভর্তিতে বিলম্ব হয়েছে। যার মূল কারণ, ওবিসি কোটা সংক্রান্ত আদালতীয় দ্বন্দ্ব। হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট — মাঝে ফাঁকফোকর। ফলস্বরূপ ৩ লাখ প্রার্থী ঠিক সময়ে ভর্তি হতে পারেনি। এতে তো বিশেষত সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়েপড়া গোষ্ঠীর স্বপ্ন ঝরেছে।
এর বাইরে, সম্প্রতি বাংলা ভাষীদের বিরুদ্ধে linguistic terrorism বা ভাষিক আগ্রাসনের অভিযোগে মুখ্যমন্ত্রী দ্বিতীয় ভাষা আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। যদিও এই জাতীয় আন্দোলন মূলত linguistic cultural assertion. এটি ইঙ্গিত দেয় ভাষা ও সংখ্যালঘুর স্বীকৃতি-অধিকার স্পর্শকাতর এবং রাজ্য যখন এগুলো নিয়ে তৎপর হয়, তখন সেটি বোঝা যায়।
সামগ্রিকভাবে প্রমাণ আছে, সংখ্যালঘুরা ‘পিছনে’ পড়েছেন শিক্ষা, সামাজিক গ্রহণ, সম্পত্তি, নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় ও ভাষাগত স্বাধীনতা — অনেক ক্ষেত্রেই। তবে প্রশ্ন হল, এটা তাঁদের ‘নিজে পিছিয়ে পড়া’ নাকি সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার দ্বারা পিছিয়ে রাখা? প্রমাণ ও যুক্তি বলছে — দুটোই সত্য। অর্থাৎ, সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামো, বৈষম্যমূলক আচরণ (যেমন segregation, সম্মানহানি, সীমিত সুযোগ), এখনো সংখ্যালঘুদের পিছনে ফেলে রেখেছে। আর সেই প্রেক্ষাপটে যদি আর্থ-সামাজিক ভিত্তিতে (যেমন backwardness) যেতে হয়ত কিছু সমাধান হয়েছে, তবে সেটাও রাজনৈতিক কারণে অনেক সময় বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত হয়। যেমন, ওবিসি কোটা বিলম্বে সেটিও নিজেরা পেছনে নয়, পিছিয়ে রাখা হয়েছে অনেক দরকারি ভর্তিতে।
অতএব বলতে দ্বিধা নেই, পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘুরা কেবল ‘পিছিয়ে’ই নেই — তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো এবং কর্মকর্তাদের আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই ‘পিছিয়ে রাখতে’ চেয়েছে। তবে সমসাময়িক রাজ্য সরকার, কিছু উদ্যোগ (যেমন ওবিসি নতুন তালিকা, ভাষা ও সংস্কৃতি-সংক্রান্ত আর্টিকুলেশন) আছে — তারা দেখাচ্ছে একটা পরিবর্তনের সম্ভাবনা। কিন্তু সংস্কার এবং বাস্তব সমতার পথে এগিয়ে যেতে হলে আরও গভীর বন্ধন ও উদার মনোভাব দরকার; শুধু নীতিতে নয়, মননের স্তরে।
আমাদের লেখকের দৃষ্টি এখানে রাজ্য-শিক্ষা-সাংস্কৃতির গতিপথকে নিয়ে একাধারে করুণ। ভবিষ্যতে যদি সাংস্কৃতিক সংহতি, আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আরও স্বচ্ছতা আনতে হয়, তাহলে এই ‘বঞ্চিত’ গোষ্ঠীগুলো নিশ্চিতভাবে পিছনে পড়া থেকে সামগ্রিক সমান অধিকার অর্জনে যেতে পারবে।








