আসামের একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রী আনোয়ারা তৈমুর
মুদাসসির নিয়াজ
নতুন পয়গাম, ১৬ সেপ্টেম্বর:
অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সৈয়দা আনোয়ারা তৈমুর ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী। ১৯৩৬ সালের ২৪ নভেম্বর তাঁর জন্ম অসমের জোরহাট এলাকায়। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ ইউসূফ আলি এবং মাতা ছিলেন জুবেদা খান। ১৯৮০ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ৩০ জুন ১৯৮১ পর্যন্ত তিনি অসমের মুখ্যমন্ত্রী পদে ছিলেন। ২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁর জীবনাবসান হয়। এখনও পর্যন্ত তিনি রাজ্যের একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শেষ জীবনে বছর চারেক অস্ট্রেলিয়ায় ছেলের কাছে ছিলেন আনোয়ারা তৈমুর। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। অবশেষে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ছেলের বিদেশের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তিনি তখন অসম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য। ২০১১ সালে কংগ্রেস তাঁকে টিকিট দিতে অস্বীকার করায়, দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বদরুদ্দিন আজমলের নেতৃত্বাধীন এআইইউডিএফ দলে যোগ দেন।
অসমে যোগেন্দ্রনাথ হাজারিকা সরকারের পতনের পর ১৯৭৯ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে চালু হয় রাষ্ট্রপতি শাসন। কয়েক মাস রাষ্ট্রপতি শাসনের পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইন্দিরা কংগ্রেস দলের নেত্রী সৈয়দা আনোয়ারা তৈমুরকে অসমের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। মাত্র ৭ মাসের মাথায় ১৯৮১-র ৩০ জুন তিনি মুখ্যমন্ত্রী পদে ইস্তফা দেন। তিনি আসামের কংগ্রেস দলের একজন নেতা এবং সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির (AICC) সদস্য ছিলেন।
অসম থেকে চার বার ভোটে জিতে (১৯৭২, ১৯৭৮, ১৯৮৩ ও ১৯৯১) বিধায়ক হয়েছিলেন আনোয়ারা তৈমুর। এর মধ্যে দু-বার মন্ত্রীও হন তিনি। এ ছাড়া ১৯৮৮ ও ২০০৪ সালে রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছেন। আনোয়ারা সে সময় রাজ্য সরকারের বেশ কয়েক’টি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। পূর্ত দফতর ও শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে মুখ্যমন্ত্রী শরৎচন্দ্র সিনহা ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারে অসম রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন আনোয়ারা তৈমুর। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত অসমের পূর্ত (পিডব্লিউডি) মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৮৯-৯১ পর্যন্ত সেন্ট্রাল হজ কমিটির চেয়ারপার্সন হিসেবে সর্বভারতীয় স্তরে কাজ করেছেন। ১৯৯১-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রী হীতেশ্বর শইকিয়ার আমলে সংখ্যালঘু উন্নয়ন, হজ এবং ওয়াকফ বিষয়ক মন্ত্রী পদের দায়িত্বেও ছিলেন।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন আনোয়ারা তৈমুর। তাঁর প্রয়াণে ট্যুইট বার্তায় অসমের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী আনোয়ারা তৈমুরের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, ‘অসমের উন্নয়নে সৈয়দা আনোয়ারা তৈমুরের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।’ অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এক শোকবার্তায় বর্ষীয়ান জননেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সৈয়দা আনোয়ারা তৈমুরকে আসামের একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে বর্ণনা করেন।
উল্লেখ্য, আসামে এনআরসি হলে ২০১৮ সালে যে সংশোধিত নাগরিক তালিকা প্রকাশিত হয়, সেখানে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সৈয়দা আনোয়ার তৈমুরের নাম না থাকায় তিনি ভীষণ দুঃখ পান।
স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলে পড়াশোনা করেন। জোড়হাট গার্লস হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর জে.বি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি উত্তরপ্রদেশের আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে সসম্মানে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রি হাসিল করেন। তারপর আসামে ফিরে এসে ১৯৫৬ সালে দেবীচরণ বড়ুয়া গার্লস কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন।
আসামের ইতিহাসে তিনি রাজ্যের একমাত্র মহিলা এবং একমাত্র মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তার আগে-পরে ওই রাজ্যে আর কোনও মহিলা বা মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী হননি। শুধু আসামই নয়; দেশের আর কোনও রাজ্যে কখনও কোনও মুসলিম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হননি। সেই নিরিখে আনোয়ারা তৈমুর সারা ভারতে এক অনবদ্য রেকর্ড স্থাপন করেছেন।
চার বারের বিধায়ক, দু’বারের সাংসদ এবং রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতরের ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পাশাপাশি অসমের মুখ্যমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি আরো যেসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন সেগুলো হল: সদস্য – নগর উন্নয়ন কমিটি (২০০৪-১০), সদস্য – নারীর ক্ষমতায়ন কমিটি (২০০৪-১০), সদস্য – স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক কমিটি (২০০৪-১০), ভাইস প্রেসিডেন্ট – ভারত-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ (২০০৫-১০), সদস্য – সংখ্যালঘু বিভাগের জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি (২০০৬-১০)।
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় থেকেই তিনি আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়েপড়া বা অনগ্রসর মানুষদের উন্নয়নে ভাবনাচিন্তা শুরু করেন। এজন্য তিনি সমাজসেবার দিকটা বেছে নেন। বিশেষ করে নারী এবং শিশুদের উন্নয়নে তিনি প্রয়াসী হন। একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে তিনি এই মহান কাজে ব্রতী হন। নারীদের ক্ষমতায়নে গড়ে তোলেন এক অভিনব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। যেখান থেকে নারীদের বিভিন্ন রকম বৃত্তিমূলক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। তৈরি করেন মহিলা কো-অপারেটিভ স্টোর। আসামের বরপেটা জেলা মহিলা সমিতি, আসাম মহিলা প্রতিরক্ষা সমিতি, আসাম মহিলা রিলিফ সোসাইটি প্রভৃতি সমাজসেবামূলক বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি।
১৯৬৯ সালে যুগোস্লোভিয়ার রাজধানী শহর বেলগ্রেডে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে তিনি ভারতের প্রতিনিধি দলে অংশ নিয়েছিলেন। সেটা ছিল আন্তর্জাতিক মহিলা কনফারেন্স। যার আলোচ্য বিষয় ছিল মূলত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রস্তাব গ্রহণ এবং সেই মোতাবেক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।








